শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশ, নৈতিকতা গঠন ও আধুনিক জ্ঞানচর্চার সমন্বয়ে এগিয়ে যাচ্ছে মারকাযুল ফুরকান শিক্ষা পরিবার। ২০১৯ শিক্ষাবর্ষে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর পর বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ছয়টি ক্যাম্পাসে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, গবেষণা, ইসলামী সংস্কৃতি ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৮ শিক্ষাবর্ষে আটটি বিভাগীয় শহরে কার্যক্রম শুরু এবং ২০৩২ সালের মধ্যে দেশের ৬৪ জেলায় শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত হয় মারকাযুল ফুরকান শিক্ষা পরিবারের বিশেষ সম্মেলন ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। এতে শিক্ষার্থীদের মেধাভিত্তিক প্রদর্শনী, কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা, অভিভাবকদের মূল্যায়ন এবং শিক্ষকদের সম্মাননা দেওয়া হয়। পাশাপাশি চারজন শিক্ষককে উপহার দেওয়া হয় পবিত্র ওমরাহ পালনের প্যাকেজ।
অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আওয়ার ইসলামের সঙ্গে কথা বলেছেন মারকাযুল ফুরকান শিক্ষা পরিবারের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন মাহমুদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানবিরুল হক আবিদ।
আওয়ার ইসলাম: আজকের এই আয়োজনের মাধ্যমে জাতিকে কী বার্তা দিতে চেয়েছেন?
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন মাহমুদ: আলহামদুলিল্লাহ, আজকের আয়োজন অত্যন্ত সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মারকাযুল ফুরকান শিক্ষা পরিবারের শিক্ষার্থীদের বার্ষিক ফলাফল প্রকাশ ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে আমাদের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হয়। আজকের আয়োজন ছিল মুগদা ক্যাম্পাসের।
এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা একটি বিষয় তুলে ধরতে চেয়েছি—সাধারণত মানুষের মধ্যে ধারণা রয়েছে, স্কুলে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের মেধা ও যোগ্যতা বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায়ও যে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশ, সৃজনশীলতা ও যোগ্যতা প্রকাশের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে, আমাদের আজকের আয়োজন সেই ধারণাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে।
আমরা চাই, মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও তাদের মেধা, চিন্তা ও উদ্ভাবনী দক্ষতা দিয়ে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করুক।
আওয়ার ইসলাম: দিনব্যাপী আয়োজনে কী কী কর্মসূচি ছিল?
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন মাহমুদ: আমাদের শিক্ষার্থীরা সারা বছর যে মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে, তার মূল্যায়ন করাই ছিল এই আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মেধাবী শিক্ষার্থীদের নগদ অর্থ বৃত্তি দেওয়া হয়েছে।
অভিভাবকদেরও মূল্যায়ন করা হয়েছে। শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁদের বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড ও সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে চারজন শিক্ষককে প্রণোদনা হিসেবে পবিত্র ওমরাহ পালনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবক ও শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়নও শিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আওয়ার ইসলাম: শিক্ষার্থীদের প্রদর্শনীতে কী কী বিষয় তুলে ধরা হয়েছে?
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন মাহমুদ: শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম ও প্রদর্শনী ছিল। এর মধ্যে সামাজিক নানা বিষয়, শিক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও স্থান পেয়েছে। শিক্ষার্থীরা তাদের অর্জিত জ্ঞান ও চিন্তাভাবনা কীভাবে কাজে লাগাচ্ছে, তা প্রদর্শনীর মাধ্যমে সবার সামনে উপস্থাপন করেছে।
আমরা চেয়েছি, শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব জীবনের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানুক, চিন্তা করুক এবং নিজেদের উপলব্ধি সবার সামনে তুলে ধরতে শিখুক।
আওয়ার ইসলাম: মারকাযুল ফুরকান শিক্ষা পরিবারের অগ্রগতি কেমন দেখছেন? ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন মাহমুদ: মারকাযুল ফুরকান শিক্ষা পরিবার ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৮ সালের শেষ দিকে, অর্থাৎ ২০১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে। এরপর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের ছয়টি ক্যাম্পাস চালু হয়েছে। প্রতিটি ক্যাম্পাসেই আমাদের একাধিক ভবন রয়েছে।
অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের আগ্রহ এবং ব্যাপক সাড়া পাওয়ায় আমরা কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছি। ইনশাআল্লাহ, ২০২৮ শিক্ষাবর্ষে দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে নতুন কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে ২০৩২ সালের মধ্যে দেশের ৬৪টি জেলাতেই আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে চাই।
আমাদের লক্ষ্য শুধু ক্যাম্পাসের সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা এবং নৈতিক বিকাশ নিশ্চিত করে একটি আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা।
আওয়ার ইসলাম: বর্তমানে আপনাদের প্রতিষ্ঠানে কতজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক রয়েছেন?
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন মাহমুদ: বর্তমানে আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা প্রায় ৩৫০। আগামী ডিসেম্বর থেকে শিক্ষকসংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছি।
এ ছাড়া নতুন শিক্ষাবর্ষে ভর্তির জন্য আমাদের আসনসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ বছর পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ তৈরি হবে, ইনশাআল্লাহ।
আওয়ার ইসলাম: অভিভাবকদের কাছ থেকে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন মাহমুদ: আলহামদুলিল্লাহ, অভিভাবকদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। এ বছর মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে নতুন ক্যাম্পাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। সেখানে ডিসেম্বর থেকে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রতিটি নতুন ক্যাম্পাসে প্রাথমিকভাবে ৩৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ এরই মধ্যে প্রতিটি ক্যাম্পাসে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০টি আবেদন জমা পড়েছে। এটি আমাদের জন্য আনন্দের এবং একই সঙ্গে বড় দায়িত্বের বিষয়।
অভিভাবকদের এই আস্থা ধরে রাখতে শিক্ষার মান, পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশের দিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
আওয়ার ইসলাম: শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রদর্শনী ও প্রজেক্ট দেখে আপনার অনুভূতি কেমন? অভিভাবক ও অতিথিদের সাড়া কেমন ছিল?
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন মাহমুদ: আলহামদুলিল্লাহ, বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের যেসব বিষয় শেখাচ্ছেন, আজকের প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তার বাস্তব প্রয়োগ ও উপলব্ধি তুলে ধরেছে।
প্রদর্শনীর বিষয়গুলো চূড়ান্ত করার পর প্রস্তুতির জন্য শিক্ষার্থীরা খুব বেশি সময় পায়নি। মাত্র দুই-তিন দিনের প্রস্তুতিতে তারা যেভাবে নিজেদের কাজ উপস্থাপন করেছে, তা সত্যিই মুগ্ধ হওয়ার মতো।
আমাদের সম্মানিত অতিথি ও অভিভাবকেরা শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা দেখে অত্যন্ত খুশি হয়েছেন। তাঁদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আমাদের আরও উৎসাহিত করেছে। আমরা চাই, ভবিষ্যতেও শিক্ষার্থীরা নতুন নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করুক এবং নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাক।
আওয়ার ইসলাম: পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য কী কী সহশিক্ষা কার্যক্রম রয়েছে?
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন মাহমুদ: আমাদের প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের সহশিক্ষা কার্যক্রম রয়েছে। এর মধ্যে হামদ-নাত, ইসলামী সংগীত, উপস্থাপনা, আবৃত্তি ও ইসলামী সংস্কৃতিচর্চা উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কারাতে প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণামূলক কার্যক্রমের সুযোগ রয়েছে।
আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা যেন শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জন না করে; বরং তাদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণ, আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা ও বাস্তবমুখী দক্ষতাও তৈরি হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীর যেসব যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন, সেগুলো বিকাশেরও চেষ্টা করছি।
আওয়ার ইসলাম: আপনাদের প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে কত শতাংশ শিক্ষার্থী মাদরাসা শিক্ষায় এবং কত শতাংশ সাধারণ শিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে?
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন মাহমুদ: আমাদের শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করি, যাতে তারা ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও তাদের মাদরাসার শিক্ষাগত ভিত্তি অটুট থাকে। আমরা চাই, তারা দ্বীনি শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলুক।
আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের প্রতিষ্ঠানের তিন শতাধিক সাবেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে। তাদের অনেকে হাইআতুল উলইয়া থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেছে, কেউ গত বছর করেছে, আবার কেউ এ বছর বা আগামী সময়ে সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কত শতাংশ শিক্ষার্থী শুধু মাদরাসা শিক্ষায় কিংবা শুধু সাধারণ শিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে, তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এই মুহূর্তে আমার কাছে নেই। তবে আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, অধিকাংশ শিক্ষার্থীই মাদরাসা শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষাও চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা এই সমন্বিত শিক্ষাধারাকে উৎসাহিত করি।
আওয়ার ইসলাম: আওয়ার ইসলামকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন মাহমুদ: আপনাদেরও আন্তরিক ধন্যবাদ। আওয়ার ইসলাম২৪-কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষার্থীসহ সব শিক্ষার্থী এবং যেসব শিক্ষক আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন, তাঁদের সবাইকে আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই।
আমি প্রত্যাশা করি, শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ ধরনের আয়োজন করবে। নতুন নতুন প্রজেক্ট ও উদ্ভাবনী কার্যক্রম বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করবে। এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ পাবে এবং দেশের শিক্ষা অঙ্গন আরও সমৃদ্ধ হবে, ইনশাআল্লাহ।
এসএইচ/