নিজস্ব প্রতিবেদক:
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) জেরে যেসব ভোটার বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছেন, তাদের ৭০ শতাংশের বেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সবর ইনস্টিটিউট-এর সম্প্রতি প্রকাশিত এক সমীক্ষার প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি বাঙালি হওয়ায় বাদ পড়া ভোটারের অধিকাংশই বাঙালি মুসলিম।
সবর ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসআইআরে বাদ যাওয়া ও পশ্চিমবঙ্গের ‘বিচারাধীন’ তালিকায় থাকা ২৭ লাখের বেশি ভোটারের মধ্যে: মুসলিম ভোটার: ৭০.১৭ শতাংশ। নারী ভোটার: মোট ৫১ শতাংশ। তাদের অধিকাংশকেই তথাকথিত ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ বা ‘যৌক্তিক অসংগতি’র কারণে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই যৌক্তিক অসংগতির জেরে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বহু মানুষ ভোটদানে বঞ্চিত হন।
এই ২৭ লাখ মানুষ ছাড়াও অতিরিক্ত বা ‘সাপ্লিমেন্টারি’ তালিকা থেকে স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত, মৃত বা দ্বৈত (ডুপ্লিকেট) ভোটার দেখিয়ে আরও প্রায় ৬৪ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে মোট প্রায় ৯১ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে গেছে, যা গত বিধানসভার মোট ভোটারের ৮.০৯ শতাংশ।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত মুসলিম সমাজের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বলা হয়েছে, ২৭ লাখের বেশি মানুষকে অত্যন্ত আপত্তিকর ও অযৌক্তিক কারণ দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সবর ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে এমন কিছু অদ্ভুত কারণের তথ্য উঠে এসেছে: কোনো দম্পতির ছয়জন বা এর বেশি সন্তান থাকলে তাঁদের নাম সাধারণভাবে বাদ পড়েছে। মা–বাবার নামের বানানে সামান্য অমিল থাকা। মা–বাবার সঙ্গে সন্তানের বয়সের ব্যবধান ১৫ বছরের কম হওয়ার মতো কারণ দেখিয়ে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন দাবি করেছিল, মূলত মৃত, স্থানান্তরিত বা যাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, তাদের নামই বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকৃত চিত্র ভিন্ন হওয়ায় তীব্র উত্তেজনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ও হাইকোর্টের তত্ত্বাবধানে এসআইআর ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয় এবং বাতিল হওয়া ভোটারদের প্রায় ৩৪ লাখ আবেদন সেখানে জমা পড়ে। তবে এই ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ার গতি অত্যন্ত ধীর হওয়ায় বিশালসংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।
নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর তৃণমূল কংগ্রেস জোর দিয়ে বলেছে, ভোটার তালিকা থেকে পরিকল্পিতভাবে বিশেষত মুসলিম সমাজের মানুষের নাম বাদ দিয়েই তাদের হারানো হয়েছে। অন্যদিকে, বিজেপির দাবি—তৃণমূল কংগ্রেস অতীতে ভুয়া ভোটার ঢুকিয়ে জিতেছিল, যা এবার এসআইআরের কারণে সম্ভব না হওয়ায় তারা হেরে গেছে।
গোটা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে সবর ইনস্টিটিউট একটি উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার বা ‘ওপেন ডেটাবেজ’ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি এই ডেটাবেজে ধর্ম ও লিঙ্গ অনুযায়ী সব তথ্য সাজানো থাকবে, যার মাধ্যমে গবেষক ও সাধারণ নাগরিকেরা সহজেই বুঝতে পারবেন ভোটার তালিকা থেকে নাম বাতিলের ফলে নির্দিষ্ট সম্প্রদায় কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আওয়ার ইসলাম/জেডএম
