মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ ।। ২ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ১ মহর্‌রম ১৪৪৮


আলেমের পদস্খলন: একটি সূক্ষ্ম অধ্যায়

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| আলী আহমদ কাসেমী ||

মানুষ বলতেই ভুল। আলেম ও গায়রে আলেম সবারই পক্ষে ভুল সংঘটিত হওয়া সম্ভব। কারণ মানুষ নিষ্পাপ নয়; তাই তাদের থেকে ভুল ও পদস্খলন ঘটতে পারে। তাদের ভুলের অনুসরণ করা যাবে না। বিশেষ করে আলেমদের ভুল-ত্রুটির অনুসরণ থেকে সতর্ক করা এবং তাদের বিচ্ছিন্ন ভুল মতামত অনুসরণ ও সেই অনুযায়ী আমল করা দ্বীনের বন্ধন শিথিল করে দেয় এবং মানুষকে ইসলাম থেকে বিচ্যুতির দিকে নিয়ে যায়।

হযরত আমর ইবনে মুযানী রাযি. বলেন—আমি নবী করীম ﷺ কে বলতে শুনেছি,

قال رسول الله ﷺ: أخاف عليهم من زلة العالم، ومن حكم جائر، ومن هوى متبع.

“আমি আমার উম্মতের ব্যাপারে তিনটি বিষয়ের আশঙ্কা করি: আলেমের পদস্খলন, জালিম শাসকের ফয়সালা এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ।” (মুসনাদুল বাযযার, হাদীস: ৩৩৮৪)

হযরত ইবনে উমর রাযি. বলেন—

ثلاث يهدمن الدين: زلة العالم، وجدال منافق بالقرآن، وأئمة مضلون.

“তিনটি জিনিস দ্বীনকে ধ্বংস করে দেয়: আলেমের পদস্খলন, কুরআন নিয়ে মুনাফিকের বিতর্ক এবং পথভ্রষ্ট নেতৃবর্গ।” (সুনানে দারিমী ১/৭১; আল-মুওয়াফাকাত ৫/১৩৩)

হযরত মুআয ইবনে জাবাল রাযি. তাঁর খুতবায় প্রায়ই বলতেন—

وإياكم وزيغة الحكيم، فإن الشيطان قد يتكلم على لسان الحكيم بكلمة الضلالة، وقد يقول المنافق الحق، فتلقوا الحق عمن جاء به، فإن على الحق نورا. قالوا: وكيف زيغة الحكيم؟ قال: هي كلمة تروعكم وتنكرونها، وتقولون: ما هذه؟ فاحذروا زيغته، ولا يصدنكم عنه، فإنه يوشك أن يفيء وأن يراجع الحق.

“তোমরা জ্ঞানী ব্যক্তির বিচ্যুতি থেকে সতর্ক থাকো। কারণ কখনও কখনও শয়তান জ্ঞানীর মুখ দিয়ে ভ্রান্তি কথা বলিয়ে দেয়। আবার মুনাফিকও কখনও সত্য কথা বলতে পারে। অতএব যে-ই সত্য কথা নিয়ে আসুক, তা গ্রহণ করো; কেননা সত্যের সঙ্গে নূর রয়েছে। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, জ্ঞানীর বিচ্যুতি কীভাবে চিনব? তিনি বললেন, এটি এমন একটি কথা, যা তোমাদেরকে বিচলিত করবে এবং তোমরা তা অস্বাভাবিক মনে করবে। তোমরা বলবে, ‘এটা কেমন কথা!’ সুতরাং তার সেই বিচ্যুতি থেকে সাবধান থাকবে। তবে এর কারণে তার থেকে সম্পূর্ণ মুখ ফিরিয়ে নিও না। কারণ অচিরেই সে সত্যের দিকে ফিরে আসতে পারে এবং নিজের ভুল সংশোধন করতে পারে।” (সুনানে আবু দাঊদ, হাদীস: ৪৬১১; জামিউল মাসানিদ ওয়াস সুনান, হাদীস: ৯৭১০; আল-মুওয়াফাকাত ৫/১৩৩)

হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন—

وعن ابن عباس: ويل للأتباع من عثرات العالم. قيل: كيف ذلك؟ قال: يقول العالم شيئا برأيه، ثم يجد من هو أعلم برسول الله صلى الله عليه وسلم منه، فيترك قوله ثم يمضي الأتباع.

“আলেমের পদস্খলনের কারণে অনুসারীদের জন্য ধ্বংস। জিজ্ঞেস করা হলো, এটা কীভাবে? তিনি বললেন, একজন আলেম নিজের মতামতের ভিত্তিতে কোনো কথা বলেন। পরে তিনি এমন একজনকে পান, যিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাহ সম্পর্কে তার চেয়ে অধিক জ্ঞানী। তখন তিনি নিজের পূর্ববর্তী মত ত্যাগ করে দেন। কিন্তু তার অনুসারীরা সেই পুরোনো মতের ওপরই চলতে থাকে।” (জামিউ বয়ানিল ইলম ওয়া ফাযলিহ ২/৯৮৪)

ইমাম শাতবী রহ. ‘আল-মুওয়াফাকাত’ গ্রন্থে (زلات العلماء) আলেমদের বিচ্যুতি ও ভুল সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন এবং অত্যন্ত সুন্দর ও উপকারী বক্তব্য পেশ করেছেন। হযরত সুলাইমান তাইমী রহ. বলেন—

إن أخذت برخصة كل عالم اجتمع فيك الشر كله، قال ابن عبد البر: هذا إجماع لا أعلم فيه خلافا.

‘তুমি যদি প্রত্যেক আলেমের রুখসত গ্রহণ কর, তবে তোমার মধ্যে সমস্ত অনিষ্ট একত্রিত হয়ে যাবে। এরপর ইমাম ইবনে আব্দিল বার রহ. বলেন, এ বিষয়ে ইজমা (ঐকমত্য) রয়েছে; আমি এতে কোনো মতভেদ দেখি না।’ (আল-মুওয়াফাকাত ৫/১৩৪)

ইমাম বায়হাকী রহ. তাঁর ‘আসসুনানুল কুবরা’ গ্রন্থে ইমাম আওযাঈ রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন—

من أخذ بنوادر العلماء خرج عن الإسلام.

‘যে ব্যক্তি আলেমদের বিরল ও ব্যতিক্রমধর্মী মতগুলো গ্রহণ করতে থাকে, সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায়।’ (আসসুনানুল কুবরা ১০/৩৫৬; সিয়ারু আলামিন নুবালা ৭/১২৫)

কাজেই কোনো আলেমের ভুলকে নির্ভরযোগ্য বলে গ্রহণ করা বৈধ নয় এবং তার তাকলিদ করে তা অনুসরণ করাও সঠিক নয়। যদি তা গ্রহণযোগ্য হতো, তবে তাকে ভুল বলা হতো না এবং তার প্রতি বিচ্যুতির আরোপ করা হতো না। একই সঙ্গে তার এ ভুলের কারণে তাকে দোষারোপ করা, তার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো, তার মর্যাদা হ্রাস করা অথবা এ ধারণা করা যে, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে শরিয়তের বিরোধিতা করেছেন—এসবও উচিত নয়।

লেখক: মুহাদ্দিস, লেখক-অনুবাদক ও চিন্তক

আইও


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ