শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬ ।। ২৭ চৈত্র ১৪৩২ ।। ২৩ শাওয়াল ১৪৪৭

শিরোনাম :
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় বাংলাদেশি নারী নিহত ১১ এপ্রিল ২০২৬-এর নামাজের সময়সূচি গণরায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবি ইসলামী আন্দোলনের ‘গণভোটের রায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে’  ৪০ দিনের যুদ্ধে ইরানের ক্ষয়ক্ষতি প্রায় ১৮ লক্ষ কোটি টাকা মার্কিন কংগ্রেসে জোরালো হচ্ছে ট্রাম্পকে অপসারণের দাবি দৌলতদিয়ায় বাসডুবিতে নিহত ২৬ জনের স্মরণে দোয়া অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় দ্রুত কার্যকর না হলে রাজপথে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে: মাওলানা জালালুদ্দীন আহমাদ বর্তমান সরকার জুলাই বিপ্লবের চেতনার বহিঃপ্রকাশ: অ্যাটর্নি জেনারেল প্রণয় ভার্মাকে বেলজিয়াম ও ইইউ’র ভারতের রাষ্ট্রদূত নিয়োগ

মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় যথেচ্ছাচার, লাগাম টানবে কে?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: আওয়ার ইসলাম

|| জহির উদ্দিন বাবর ||

যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের স্থান। সে হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোথায় হবে, কতটুকু স্ট্যান্ডার্ড মেনে হবে, এর জন্য ন্যূনতম কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে-এসবের একটা নীতিমালা থাকা চাই। সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে পুরোপুরি না হলেও সেগুলোর কিছুটা হলেও মানা হয়। কিন্তু কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এমন কোনো নিয়ম-নীতি আছে বলে আমাদের জানা নেই। যে কেউ, যখন যেখানে খুশি কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। এর একটি ইতিবাচক দিক তো অবশ্যই আছে। এদেশে জনসংখ্যার তুলনায় এখনো মাদরাসার পরিমাণ কম। সংখ্যা যত বেশি হবে পড়ুয়ার সংখ্যা তত বাড়বে। কিন্তু এই ভাবনার একটি উল্টো দিকও আছে। যেখান যার যখন খুশি মাদরাসা খুলে বসলে ন্যূনতম যে মান রক্ষা করার কথা সেটা কিন্তু সম্ভব হবে না। আর এর বদনাম পড়বে গোটা কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। এজন্য মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের একটি ছাড়পত্র থাকা এবং খবরদারি করার মতো কর্তৃপক্ষ থাকা জরুরি।

মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নৈরাজ্য চোখে পড়ে রাজধানী ঢাকায়। এখানে এক বিল্ডিংয়ে একাধিক মাদরাসাও রয়েছে। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী থেকে চিটাগাং রোড পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার জায়গায় শত শত মাদরাসা চোখে পড়ে। এসবের কতটি ন্যূনতম মান রক্ষা করে হয়েছে? জনগণের দীনি শিক্ষার চাহিদা মেটানোর জন্য নির্মিত মাদরাসার সংখ্যা কয়টি? এই এলাকাটিতে বড় বড় বেশ কয়েকটি মাদরাসা রয়েছে, যা সারাদেশেই শুধু নয়; আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত। জনসাধারণের দীনি চাহিদা পূরণের জন্য সেই মাদরাসাগুলোই যথেষ্ট। এই এলাকায় গড়ে ওঠা শত শত মাদরাসা যদি রাজধানীর বাকি এলাকাগুলোতে আনুপাতিক হারে গড়ে উঠত তাহলে কতই না ভালো হতো! কিন্তু ঢাকার এমন অনেক এলাকা আছে মাইলের পর মাইল ঘুরেও একটা মাদরাসার দেখা মিলে না।

প্রাইভেটভাবে গড়ে ওঠা বেশির ভাগ মাদরাসার ভেতরের অবস্থা করুণ। ঘিঞ্জি পরিবেশ, কয়েক কামরা নিয়ে একটি মাদরাসা। অল্পসংখ্যক ছাত্র নিয়ে কোনো মতে চলে। খরচ ওঠাতেই হিমশিম খেতে হয়। ফলে মাদরাসার শিক্ষার মানের দিকে কর্তৃপক্ষ তেমন নজর দিতে পারেন না। এভাবে মানহীন ও নিয়ন্ত্রণহীন মাদরাসা পুরো অঙ্গনের বদনাম ডেকে আনছে। তাছাড়া শুধু পড়াশোনাই নয়, ছাত্রদের মানসিক বিকাশের মতো উপযুক্ত পরিবেশও এসব মাদরাসায় নেই। এটা সুদূরপ্রসারী ক্ষতি করবে।

এভাবে যারা হুটহাট মাদরাসা যারা খুলে বসছেন তারা আসলে কারা? কেউ যোগ্য হলে অবশ্যই তার জন্য মাদরাসা খোলা ঠিক আছে। কিন্তু মাদরাসার শেষ বেঞ্চের ছেলেটি যখন অন্য কোথাও নিজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পেরে নিজেই মাদরাসা খুলে বসেন তখন আপত্তির কারণ তো অবশ্যই থেকে যায়। যারা এভাবে মাদরাসা খুলছেন সবাই যে ব্যক্তিগত স্বার্থে করছেন এমনটা নয়। কিন্তু একটা বড় অংশ ব্যক্তিস্বার্থেই খুলে বসছেন মাদরাসা। অবাধে এসব মাদরাসা প্রতিষ্ঠা বিপদ ডেকে আনবে গোটা অঙ্গনের জন্যই।

মাদরাসা প্রতিষ্ঠা নিয়ে সম্প্রতি ভারতের বিখ্যাত আলেম ও অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের সভাপতি মুফতি খালেদ সাইফুল্লাহ রাহমানীর একটি বক্তব্য বেশ আলোচিত হচ্ছে। সেখানে তিনি বলেছেন, উদ্দেশ্যহীন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা দীনের কোনো খেদমত নয়, বরং তা দীনের জন্য ক্ষতিকর। তিনি বলেন, এসবের কারণে দীনী শিক্ষার প্রতি, উলামায়ে কেরাম ও মাদরাসার ওপর মানুষের আস্থা-ভক্তি দিনদিন হ্রাস পাচ্ছে। লোকেরা একে মৌলভীদের ব্যবসা-ধান্দা মনে করে। এমন দৃষ্টান্তও দুর্লভ নয়, কেউ ব্যবসা বা দোকান খুলে সফল না হওয়ায় এখন ‘মাদরাসা-ব্যবসা’ শুরু করে দিয়েছে। চিন্তা করে বলুন- মাদরাসা কি শিক্ষাদীক্ষার জন্যে, নাকি জীবিকা উপার্জনের জন্যে? এসব নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে।

সরকার বিভিন্ন সময় কওমি মাদরাসাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে টানা প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকার নানা ফন্দি-ফিকির করেছে। যদিও শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। কোনো সরকারই কওমি মাদরাসার ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ না করুক এটা সবার চাওয়া। কিন্তু ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ বলে একটা কথা আছে। নিজেরা নিজেদের মান নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আন্তরিক না হলে একটা পর্যায়ে গিয়ে সরকারি হস্তক্ষেপ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়তে পারে। তাছাড়া সব সরকার সমান নয়। ভবিষ্যতে এমন সরকারও ক্ষমতায় আসতে পারে যারা কওমি মাদরাসার বিকাশের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে। এজন্য কওমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ নিজেদেরই এ ব্যাপারে সচেতন হওয়ার দরকার আছে। আরও অনেক মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হোক, কিন্তু সেটা যেন ‍ন্যূনতম একটা স্ট্যান্ডার্ড রক্ষা করে হয়। নিজেদের এমন একটা কর্তৃপক্ষ থাকা চাই, যাদের কাছ থেকে অনুমোদন বা ছাড়পত্র নিয়ে মাদরাসা করতে হবে। 

রাজধানী ঢাকায় কিংবা মফস্বল শহরে কেউ চাইলেই নিজের মতো কোনো ভবন নির্মাণ করতে পারেন না। তাকে রাজউক, সিটি করপোরেশন বা পৌর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়। সাধারণ ধারায় কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করতে হলে তাকে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের ছাড় নিয়েই তা করতে হয়। আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি। কওমি মাদরাসার ক্ষেত্রে এই গুরুদায়িত্বটা বর্তায় আল-হাইয়্যাতুল উলয়া লিলজামিয়াতিল কওমিয়ার ওপর। কারণ এটি কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ অথরিটি। কেউ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতে হলে আল-হাইয়্যার অনুমোদন নিতে হবে- এমন একটা নিয়ম করা যায়। এটার জন্য হাইয়্যার একটি কমিটি থাকবে। যারা সরেজমিনে যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দেবে। এমনটা করা গেলে কওমি মাদরাসা একটা জবাবদিহিতা মধ্যে আসবে। নিজেরা নিজেদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে বাইরের চাপ কম আসবে। তখন আর কেউ অশুভ উদ্দেশে কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে পারবে না।

কওমি মাদরাসা একটা দীর্ঘ সময় তেমন কোনো নিয়ম-কানুন ছাড়াই চলেছে। এমনকি একটা সময় তো নিয়ন্ত্রণকারী কোনো বোর্ড পর্যন্ত ছিল না। ইলহামি এই শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা নিজেদের মতো করে চলেছে। তখনকার মানুষেরাও ছিলেন খাঁটি। তাদের সব কাজের পেছনেই ছিল ইখলাস ও লিল্যাহিয়াত। সেই পরিস্থিতি কিন্তু এখন নেই। ইখলাস ও লিল্যাহিয়াতের পারদ যে নিম্নমুখী সেটা তো কারও পক্ষে অস্বীকার করার জো নেই। সুতরাং অতীতকে একমাত্র মানদণ্ড না ধরে বর্তমান নিয়ে ভাবা উচিত। কওমি মাদরাসা সনদের একটি স্বীকৃতি ঘোষিত হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে সেটা পুরোপুরি কার্যকরও হবে বলে আশা করা যায়। এই অবস্থায় লাগামহীনভাবে, কোনো ধরনের জবাবদিহিতা ছাড়া এই শিক্ষাধারা চললে এর সমূহ বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। সাময়িকভাবে সেই বিপদ আঁচ করা না গেলেও অনাগত ভবিষ্যতে যে তা মহাবিপদ হয়ে আসবে না সেটা হলফ করে বলা যায় না। এজন্য সময় থাকতেই কওমি কর্তৃপক্ষকে সচেতন হতে হবে। মাদরাসা প্রতিষ্ঠা নিয়ে যে যথেচ্ছাচার চলছে তার লাগাম টেনে ধরতে হবে। অন্যরা লাগাম টেনে ধরার আগে সেটা নিজেরাই নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: আলেম লেখক, সাংবাদিক ও সম্পাদক

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ