শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬ ।। ২৭ চৈত্র ১৪৩২ ।। ২৩ শাওয়াল ১৪৪৭

শিরোনাম :
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় বাংলাদেশি নারী নিহত ১১ এপ্রিল ২০২৬-এর নামাজের সময়সূচি গণরায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবি ইসলামী আন্দোলনের ‘গণভোটের রায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে’  ৪০ দিনের যুদ্ধে ইরানের ক্ষয়ক্ষতি প্রায় ১৮ লক্ষ কোটি টাকা মার্কিন কংগ্রেসে জোরালো হচ্ছে ট্রাম্পকে অপসারণের দাবি দৌলতদিয়ায় বাসডুবিতে নিহত ২৬ জনের স্মরণে দোয়া অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় দ্রুত কার্যকর না হলে রাজপথে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে: মাওলানা জালালুদ্দীন আহমাদ বর্তমান সরকার জুলাই বিপ্লবের চেতনার বহিঃপ্রকাশ: অ্যাটর্নি জেনারেল প্রণয় ভার্মাকে বেলজিয়াম ও ইইউ’র ভারতের রাষ্ট্রদূত নিয়োগ

ভয়ংকর ‘জুজুৎসু’ কৌশলের শিকার কওমিভিত্তিক দলগুলো!

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| মুফতি এনায়েতুল্লাহ ||

জুজুৎসু মূলত জাপানের ঐতিহ্যবাহী মার্শাল আর্ট বা লড়াইয়ের কৌশল। জুজুৎসুতে, নিজের গায়ের জোর ব্যবহার না করে; বরং প্রতিপক্ষের শক্তি ও গতিকেই সুকৌশলে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করে তাকে পরাস্ত করা হয়।

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশের ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর গতিপ্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে, বিশেষ করে কওমি মাদরাসাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলগুলো চরমভাবে জুজুৎসু কৌশলের শিকার। এর ফলে ক্ষমতাসীন দল এমনকি বড় দলগুলোকে খবু কষ্ট করে এসব দলকে বাগে আনতে হচ্ছে না। তারা নিজেরা নিজেরাই যেভাবে পরস্পরের সঙ্গে লড়ছে, তাতে তারা সংঘঠিত হওয়ার বদলে পরম প্রতিপক্ষ হিসেবে একে অপরকে মোকাবিলা করছে। এটা রাজনীতির জন্য চরম বাজে দৃষ্টান্ত।

নির্বাচনে জোট-সমঝোতা করে কয়েকটি ইসলামি দল ভালো ফলাফল পেয়েছে। কোনো কোনো দল কাঙ্ক্ষিত ফলাফল করতে পারেনি। কেউ আবার মুখরক্ষা করতে পেরেছে। ঘটনা যাই হোক, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ইসলামি দলগুলোর জেরবার অবস্থা কাটছেই না। উল্টো একদল আরেকদলের পেছনে লেগে আছে। কে কাকে কোনভাবে ছোট করতে পারে, সমালোচনা করতে পারে, এটা নিয়ে ব্যস্ত। আবার দুই-একটি দলের মধ্যে ভয়াবহ রকমের গ্রুপিং চলছে। সবমিলিয়ে অবস্থা খুব খারাপ। 

নির্বাচন শেষ, কিন্তু ইসলামি দলগুলোর স্থবিরতা কেন কাটছে না- এই প্রশ্নের অনেক উত্তর রয়েছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, রাজনীতিতে অনভিজ্ঞতা বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ি। নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবে, সেটাকে দ্রুত হজম করতে হয়, কিন্তু না। আমরা দেখছি, কয়েকটি দল এবং কয়েকটি দলের একাধিক প্রার্থী পরাজয়ের ট্রমা থেকে এখনও বের হতে পারেননি। তারা নিয়মিত নিজ নিজ দলের এমনকি অন্যদলের সমালোচনা করে যাচ্ছেন। সেই সমালোচনার সূত্র ধরে পাল্টা সমালোচনা চলছে, এই ফাঁক-ফোকরে কথার লড়াই চলছে দেদার। আর পরিস্থিতি হচ্ছে খারাপ।

আমাদের হাতেগোনা কয়েকটি ইসলামি দল। যারা কওমি অঙ্গনকে প্রতিনিধিত্ব করেন। দেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ তাদের মান্য করেন। দল ভিন্ন ভিন্ন হলেও তারা দেশের ইসলাম-মুসলমানের অভিভাবক গোত্রীয়। তাদের এমন পরিস্থিতি দেখা খুবই কষ্টকর বিষয়।

হ্যাঁ, নির্বাচনের পর দলগুলো এখনও তাদের পুরোমাত্রার রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেনি। তবে সবাই বসে নেই, কয়েকটি দল তো স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীতাও ঘোষণা করে দিয়েছে। জায়গায় জায়গায় কমিটি করছে, কিন্তু ইসলামি দলগুলোতেই চলছে শুধু স্থবিরতা। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

আমাদের দেশের রাজনীতির একটি বিশেষ ধরন হলো, কোনো রাজনৈতিক দল সরকারে গেলে এর পৃথক সত্তা আর অবশিষ্ট থাকে না। আর দেশে যেহেতু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে, অন্যদিকে সরকারে আছে বিএনপি। এই পরিস্থিতিতে ইসলামি দলগুলো তাদের কার্যক্রম বাড়াতে পারত। সরকারের কাজের সমালোচনার পাশাপাশি নতুন নতুন প্রস্তাব পেশ করে জনগণের কাছে নিজেদের উপস্থাপন করতে পারত। স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজেদের প্রমাণের সুযোগ ছিল। স্থানীয় নির্বাচনে জোট কিংবা একক লড়াই যেটাই হোক- এটা একটা দারুণ সুযোগ রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য। কিন্তু ইসলামি দলগুলো এদিকে এখনও মনোযোগ দেয়নি।

এর বাইরে আরেকটি বিষয় আমাদের ভাবিয়ে তুলছে, নির্বাচনের আগে দলগুলো জোট গঠন ও সমঝোতাকে কেন্দ্র করে এক ধরনের জটিলতা দেখা গেছে, আস্থার সংকট থেকে সৃষ্ট নানা ঘটনায় দোষারোপের ঘটনাও আমরা দেখেছি, নির্বাচনের পরও সেটা বিদ্যমান। শুধু বিদ্যমান নয়, নিজ নিজ দলের নেতাকর্মীরা নিজেদের অবস্থানকে সঠিক প্রমাণ করতে গিয়ে অন্যদের উলঙ্গ করতেও পিছপা হচ্ছে না।

রাজনৈতিক সমালোচনা খারাপ কিছু নয়, কিন্তু সমালোচনার নামে ব্যক্তি বিদ্বেষ, মিথ্যাচার এবং গুজব প্রচার করা মন্দ কাজ। এক রাজনৈতিক দল অন্য দলের নীতি বা কর্মপন্থার ভুলত্রুটি নিয়ে সমালোচনা করতে পারে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সমালোচনার ক্ষেত্রেও ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে। না হলে, তা শত্রুতায় রূপ নেবে।

রাজনীতিতে নৈতিকতা ও জবাবদিহিমূলক মনোভাব থাকা জরুরি। এরই আলোকে বলতে হয়, রাজনীতিবিদদের পরস্পরে ‘সে ওই জোটের’, ‘তারা ওই দলের’, ‘সে ওই মতের’, ‘তাকে সেখানে বা ওখানে দেখা গেছে’- এই ধরনের ‘ওরা’, ‘আমরা’ বিভাজনের ভাষা ও ট্যাগ পরিহার করতে হবে। অবিশ্বাসের দেয়াল ভেদ করতে হবে। রাজনীতি ভিন্ন হলেও সামাজিক সম্পর্কের জায়গা ঠিক রাখতে হবে। আর ধর্মীয় বিষয়ে তো কথাই নেই।

কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, নির্বাচনের পর থেকে আমাদের ইসলামি দলগুলোর নেতারা সাধারণ ‘সৌজন্যতা’ ভুলে গেছেন। নানাবিধ সন্দেহ করে দেওয়া বক্তব্য-মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। ফলে কেউ কারও ছায়া মাড়াতে রাজি নন, পরস্পরের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। রাজনীতির এই দমবদ্ধ পরিস্থিতি আমরা চাইনি।

আশা করি, নেতৃবৃন্দ এমন অবস্থা থেকে আমাদের মুক্ত করবেন, সৌহার্দ্যের রাজনীতিতে এগিয়ে আসবেন।

লেখার শুরুতে বলেছি ‘জুজুৎসু’ কৌশলের কথা। এই উদাহরণ দেওয়ার অর্থ হলো, ক্ষমতাসীন দল কিংবা বড় দলগুলো যেখানে চাপে থাকার কথা নানা কারণে, সেই চাপ থেকে উত্তরণের লক্ষে তারা নিজেদের পক্ষ ভারী করতে ছোট দলের দ্বারস্থ হবে, ছোট দলুগুলোকে নিজেদের পাশে চাইবে- এমন পরিস্থিতিতে তাদের কোনো কৌশল অবলম্বন না করেই প্রতিপক্ষকে তাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারছে অনায়েসে।

ইসলামি দলগুলোর অসংগঠিত থাকা মানে- মানুষের কাছে তাদের ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়া। ভোটে ভাগ বসানো। জোট হলেও ভাগে কম দেওয়ার সুযোগ খোঁজা। রাজনীতিতে এমন মওকা কাঙ্ক্ষিত বিষয়। বিষয়টি আমাদের নেতৃবৃন্দ কী অনুধাবন করবেন?

লেখক: সিনিয়র আলেম সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ