সমাজসেবা ও যুব উন্নয়নে নিরলস অবদান রাখা এক যুব সংগঠকের নাম সাদী। পুরো নাম মো. আমিনুল হক সাদী। সমাজ কল্যাণে ও যুব উন্নয়নে নিবেদিত এক দীপ্ত যুবক। তিনি কিশোরগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার মহিনন্দ ইউনিয়নের গোয়ালাপাড়া গ্রামের একজন সফল যুব সংগঠক, সমাজকর্মী ও প্রশিক্ষক। যিনি স্থানীয় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নয়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বেকার যুবক-যুবতীদের দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন।
২০০৪ সালে কিশোরগঞ্জ যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে গবাদি পশু পালন, হাঁস-মুরগি, ডেইরি ফার্মিং, কৃষি ও প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে তিন মাসের আবাসিক প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মজীবনে যাত্রা শুরু করেন।
২০১০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘যুব উন্নয়ন পরিষদ’ যা ২০২০ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিবন্ধন লাভ করে। তার নেতৃত্বে সংগঠনটি জেলার ১৩টি উপজেলায় কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে, যার মাধ্যমে ৫০০-এর বেশি সদস্য সক্রিয়ভাবে সমাজসেবায় নিয়োজিত।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের সময় আমিনুল হক সাদী নিজ এলাকার যুবকদের একত্রিত করে সাহসী ভূমিকা রাখেন। পুলিশের গুলিতে আহত শিক্ষার্থী জুনায়েদ এবং গুলিবিদ্ধ সমাজকর্মী যুবদল নেতা মাসুম বিল্লাহ, আহত জুলাই যোদ্ধা শফিকুল ইসলাম নাঈমসহ সরকারী বেসরকারী কর্মকর্তা ও বিভিন্ন সামাজিক কাজে স্বীকৃতিস্বরূপ ১০০ জন গুণী ব্যক্তিকে সংগঠনটির উদ্যোগে সম্মাননা ক্রেস্টও প্রদান করেছেন। সেই সঙ্গে সংগঠনের পক্ষ থেকে আহতদের সম্মাননা প্রদান করেন।
তার প্রচেষ্টায় ৩ হাজার বেকার যুবক-যুবতী প্রশিক্ষণের আওতায় এসেছে, যার মধ্যে ৩০০ জন স্বাবলম্বী হয়েছেন। সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছেন ১০ জন, বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে আরও ১০ জনের। তার ‘সাদী সমন্বিত কৃষি খামার’-এর মাধ্যমে নিজস্ব উদ্যোগে পুকুরে মাছ চাষ, সামাজিক বনায়ন এবং পারিবারিক পুষ্টি বাগান চালু করেছেন, যা এখন কর্মসংস্থানের একটি মডেল।
করোনা মহামারির সময় ১ হাজার মানুষকে বিনামূল্যে টিকার রেজিস্ট্রেশন, ১০ হাজার মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ, শতাধিক দরিদ্রকে ত্রাণ সহায়তা, প্রতিবন্ধীদের হুইলচেয়ার এবং নারীদের সেলাই মেশিন প্রদান করেছেন। পাশাপাশি ১০ হাজার শীতার্তকে শীতবস্ত্র ও কয়েক হাজার গাছের চারা বিতরণ করেন। সাম্প্রতিককালে ৫ শতাধিক শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে টাইফয়েড টিকাদানের নিবন্ধন করে দিয়েছেন। গ্রামে গ্রামে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করে স্বাস্থ্যসেবাও রেখেছেন অনন্য অবদান। কয়েক শতাধিক দরিদ্র ও ৫জন প্রতিবন্ধীদেরকে হুইল চেয়ার প্রদান, ১০জন নারীকে সেলাই মেশিন প্রদানসহ দরিদ্রদের মধ্যে কয়েক লক্ষাধিক নগদ অর্থ বিতরণ করেছেন। দুটি গণশিক্ষা কেন্দ্রে কোমলমতি শিশুদেরকে দক্ষ শিক্ষকের মাধ্যমে বিনামূল্যে পাঠদান করে গ্রামীন পর্যায়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। বেকার যুবকদের জন্য যুব প্রশিক্ষণ সেন্টার, বয়স্কদের জন্য বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রমও পরিচালনা করেন। ব্যক্তি উদ্যোগে একটি পাঠাগারও প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ পাঠাগারে ৫ হাজার বইয়ের মাধ্যমে উপকার পাচ্ছে গ্রামীণ সমাজ। অবসর সময়ে শিশু থেকে কিশোর বয়স্কসহ সকল শ্রেণি পেশার পাঠকরা বই পড়ে জ্ঞানের আলো বিকিরণ করছেন। তাঁর সংগঠনের ব্যানারে নানা বিষয়ে বেকার যুব সম্প্রদায়কে প্রশিক্ষণ প্রদান করে দক্ষ জনবল হিসেবে গড়ে তোলেছেন। সংগঠনটি যুব নেতৃত্ব বিকাশে রয়েছেন সক্রিয়।
সাদী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু প্রশিক্ষণ, সেমিনার, ওয়ার্কশপে অংশ নিয়ে শতাধিক সনদ অর্জন করেছেন। আন্তর্জাতিক যুব সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ সামিট’-এর বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে খেলাধুলা, বিতর্ক, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় শতাধিক পুরস্কার অর্জন করেছেন।
যুব সংগঠক আমিনুল হক সাদী বলেন, আমি প্রথমে মাদরাসা পর্যায়ে কওমি পরে আলিয়া নেসাবে সর্বোচ্চ স্তর পড়াশোনা সম্পন্ন করি। মাদরাসার পড়াশোনা সম্পন্ন হলে কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ গুরুদয়াল সরকারী কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে ২০১৯ সালে মাস্টার্স পাস করি। সর্বোচ্চ পড়াশোনা করলেও সরকারী চাকুরীর দিকে না থাকিয়ে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিস থেকে প্রথম দফায় ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ‘সাদী সমন্বিত কৃষি খামার’ গড়ে তুলি। এরপর আমার পিছনে ফিরে থাকাতে হয়নি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পুকুরে মৎস্য চাষ, নিজস্ব জমিতে সামাজিক বনায়ন ও কৃষি জমিতে ধান উৎপাদন করি এবং বাড়ির আঙ্গিনায় পতিত জমিতে পারিবারিক পুষ্টি বাগান দিয়ে প্রচুর শাক শবজি উৎপাদন করে আমিষের ঘাটতি পুরণ ও আর্থিকভাবে লাভবান হই। বর্তমানে আমার প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের ৫ শতাধিক সদস্যের একটি বিশাল টিম সমাজকর্মে কাজ করে যাচ্ছেন। সংগঠনটি জেলার তেরটি উপজেলায় শাখা কমিটি গঠন করে সমাজকল্যাণে ও যুব নেতৃত্বে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষকদলের যুগ্ন আহবায়ক জাতীয় যুব পদক ২০১৩ প্রাপ্ত নুরুল আরেফিন লিংকন বলেন, যুব সংগঠক আমিনুল হক সাদী আমার ফার্ম নিয়ে অনেক প্রতিবেদন তৈরী করে এলাকার বেকার যুবদের মধ্যে পোল্ট্রি শিল্পের প্রসারে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত যুব সংগঠনের প্রশিক্ষিত সদস্যরা আমার ফার্মে এসে হাতে কলমে শিক্ষা নিয়ে তারা নিজেরা স্বাবলম্বী হয়েছেন। দক্ষ যুব সংগঠক আমিনুল হক সাদীকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি প্রদান করা এখন সময়ের দাবি।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম মিয়া বলেন, আমিনুল হক সাদীর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘যুব উন্নয়ন পরিষদ’ যুব সমাজের জন্য রোল মডেল। তার কর্মপরিকল্পনা, পাঠাগার নির্মাণ এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বেকারদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
কিশোরগঞ্জ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম শামীম বলেন, যুব সংগঠক আমিনুল হক সাদীর প্রতিষ্ঠিত যুব উন্নয়ন পরিষদ নামের সংগঠনে একাধিকবার পরিদর্শনে গিয়েছি। তাঁর কার্যক্রম দেখে খুব ভালো লেগেছে। স্থানীয়ভাবে যুব কার্যক্রম বাস্তবায়নে ও সামাজিক উন্নয়ন সচেতনতামূলক কাজে এ সংগঠনটির উদ্যোগ প্রশংসনীয়। জেলায় যুব কার্যক্রমে অবদান রাখায় তাকে শ্রেষ্ঠ সংগঠক হিসেবে সনদ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া সংগঠন কর্তৃক একটি পাঠাগার পরিচালিত হয় যা স্থানীয় পর্যায়ে বেশ জনপ্রিয়। আমি এই যুব সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আমিনুল হক সাদীসহ সংগঠনের সার্বিক কল্যাণ কামনা করি।
আমিনুল হক সাদীর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘যুব উন্নয়ন পরিষদ’ যুব সমাজের জন্য রোল মডেল। তার কর্মপরিকল্পনা, পাঠাগার নির্মাণ এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বেকারদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। কিশোরগঞ্জের সচেতন মহল মনে করেন, আমিনুল হক সাদী 'জাতীয় যুব পদক ২০২৬'-এর যোগ্য দাবিদার।
আইএইচ/