সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬ ।। ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ ।। ২০ সফর ১৪৪৮


যে ৭টি গুনাহ আপনার নেকি খেয়ে ফেলছে

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

|| আরশান আমির || 

মানুষ সাধারণত বড় গুনাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা করে। হত্যা, ব্যভিচার, মদ্যপান কিংবা সুদের মতো স্পষ্ট হারাম কাজ থেকে দূরে থাকার বিষয়ে অনেকেই সচেতন। কিন্তু এমন কিছু গুনাহ আছে, যেগুলোকে আমরা তেমন গুরুত্ব দিই না। এগুলো প্রকাশ্যে আলোচিতও হয় না। অথচ এসব গুনাহ ধীরে ধীরে মানুষের নেকি নষ্ট করে, হৃদয়কে পাথরের মতো কঠিন করে তোলে এবং আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এসব গুনাহের ভয়াবহতা মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারে না।

১. গিবত (পরনিন্দা)

সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত গুনাহগুলোর একটি হলো গিবত। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই এর প্রভাব ছড়িয়ে আছে। গিবতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, কিয়ামতের দিন মানুষের নেকি তারই আমলনামায় চলে যাবে, যার বিরুদ্ধে সে গিবত করেছিল।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?” (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২)

২. রিয়া (লোক দেখানো ইবাদত)

ইবাদত যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে তা রিয়া। রিয়া ইবাদতের সৌন্দর্য বিনষ্ট করে এবং আমলের প্রতিদান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “আমি তোমাদের জন্য যে বিষয়টির সবচেয়ে বেশি ভয় করি, তা হলো ছোট শিরক।”

সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “ছোট শিরক হলো রিয়া (লোক দেখানো)।”(মুসনাদ আহমাদ)

৩. মিথ্যা বলা

মিথ্যা সকল গুনাহ ও অনৈতিকতার দরজা খুলে দেয়। অনেকেই এটিকে সাধারণ বিষয় মনে করে। অথচ একজন মুমিন কখনো মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারে না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মিথ্যা পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।” (সহিহ আল-বুখারী; সহিহ মুসলিম)

৪. অহংকার

অহংকার ছিল ইবলিশের অলংকার। এ কারণেই সে আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। মানুষ যখন নিজের জ্ঞান, সম্পদ, বংশ বা ক্ষমতা নিয়ে গর্ব করে, তখন সে আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় হয়ে ওঠে।

বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, “যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহিহ মুসলিম)

৫. হিংসা

হিংসা মানুষের নিজেরই ক্ষতি করে। অন্যের নিয়ামত দেখে কষ্ট পাওয়া ঈমানি চরিত্রের পরিপন্থী।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “হিংসা নেকিকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে, যেমন আগুন কাঠকে পুড়িয়ে ফেলে।” (সুনান আবু দাউদ)

৬. আমানতের খিয়ানত

কর্মস্থল, ব্যবসা, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদ—যেখানেই আমানত, সেখানেই সততা অপরিহার্য। একজন মুমিনের অন্যতম পরিচয় হলো আমানতদার হওয়া। খিয়ানত করা মুনাফিকের অন্যতম আলামত।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত যথাযথভাবে তার হকদারের কাছে পৌঁছে দাও।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৫৮)

৭. মানুষের হক নষ্ট করা

নামাজ, রোজা ও দান-সদকার মতো অনেক আমল থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ মানুষের অধিকার নষ্ট করে, তবে কিয়ামতের দিন সে নিঃস্ব হয়ে যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা নিজের অধিকারের বিষয়ে যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু বান্দার হক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ক্ষমা না করা পর্যন্ত ক্ষমা মিলবে না।

নবীজি (সা.) বলেছেন, প্রকৃত নিঃস্ব ব্যক্তি সে, যে অনেক ইবাদত নিয়ে আসবে; কিন্তু কাউকে গালি দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কারও রক্ত ঝরিয়েছে বা কারও অধিকার নষ্ট করেছে। তখন তার নেকি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। নেকি শেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। (সহিহ মুসলিম)

শয়তান মানুষকে সাধারণত ছোট ছোট গুনাহ দিয়েই পাপাচারের পথে নিয়ে যায়। একসময় মানুষ এসব ছোট ও অবহেলিত গুনাহকে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে পাপের পঙ্কিলতা অন্তরকে কলুষিত করে এবং নেকির ভাণ্ডার শূন্য করে দেয়।

তাই প্রতিদিন নিজের আমলের মুহাসাবা করা, তাওবায়ে নাসুহা করা, মানুষের হক আদায় করা এবং পরনিন্দা, মিথ্যাচার, অহংকার, হিংসা ও রিয়া থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। কারণ, পরকালে নেকির পাল্লায় একটি নেকিও হতে পারে আমাদের মুক্তির জারিয়া। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এসব গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন। 

এসএইচ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ