যুদ্ধক্ষেত্রে ও সংঘাতময় অঞ্চলে যৌন সহিংসতা চালানোর অভিযোগে ইসরায়েলকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করেছে জাতিসংঘ। এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে বেঞ্জামি নেতানিয়াহুর প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন।
কালো তালিকায় ইসরায়েলের নাম যুক্ত করার বিষয়টিকে ‘অযৌক্তিক’ দাবি করে ড্যানন বলেন, ‘আমাদের কালো তালিকাভুক্ত করার এবং যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে যৌন সহিংসতাকে ব্যবহারের অভিযোগ তোলার এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত আপত্তিকর। মহাসচিব এবং তার দল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্রমাগত মিথ্যা ছড়াচ্ছে। আমাদের এবং হামাসকে একই তালিকায় রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই মহাসচিবের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শেষ।’
পৃথকভাবে জাতিসংঘে ইসরায়েলের মিশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘যতদিন আন্তোনিও গুতেরেস এই সংস্থার প্রধান পদে থাকবেন, ততদিন তার কার্যালয়ের সঙ্গে ইসরায়েল কোনো যোগাযোগ রাখবে না।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওরেনে মারমোরস্টাইন এক্সে লিখেছেন, ‘ইসরায়েলি সংস্থাগুলোকে কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার লজ্জাজনক ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্তটি জাতিসংঘের প্রকৃত চরিত্রের আরেকটি প্রমাণ: এটি একটি রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট ও দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থা যা তার নিজের মূল নীতিগুলো ভুলে গেছে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু বানানোই তাদের প্রধান কাজ।’
প্রসঙ্গত, এই কালো তালিকাটি মূলত সংঘাত-সম্পর্কিত যৌন সহিংসতা বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের বার্ষিক প্রতিবেদনের (সিআরএসভি) একটি অংশ। যেখানে সশস্ত্র সংঘাতের সময় নিয়মতান্ত্রিকভাবে ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতার ঘটনায় জড়িত পক্ষগুলোকে চিহ্নিত করা হয়। সাধারণত প্রতি বছর আগস্ট মাসে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয় এবং প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে সেটি পাঠানো হয়। তালিকাভুক্ত দেশগুলোকে অন্তত এক বছর এই তালিকায় রাখা হয়।
জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূলত ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর চালানো নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার জন্য ২০২৬ সালের এই কালো তালিকায় বিশেষভাবে ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষকে (আইপিএস) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্যান্য ইসরায়েলি সংস্থাকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তির জন্য নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
এরআগে গত বছরের আগস্টে জাতিসংঘ জানিয়েছিল, ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর পদ্ধতিগতভাবে যৌন সহিংসতা চালানো হচ্ছে বলে ‘নির্ভরযোগ্য তথ্য’ রয়েছে। কিন্তু তদন্তকারীদের সেসব কারাগারে ঢুকতে দেয়নি ইসরায়েল।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজা থেকে আটক হওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপর তীব্র নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার তথ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা নথিবদ্ধ করেছে। এছাড়া গাজাগামী একটি ত্রাণবাহী জাহাজের আটককৃত কর্মীরা জানিয়েছেন, অন্তত ১৫টি ক্ষেত্রে তাদের ওপর যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে ১৪ জন ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর ধর্ষণের লোমহর্ষক বিবরণ তুলে ধরে। যদিও ইসরায়েল এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে পত্রিকাটির বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছে।
এদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো যুদ্ধাপরাধ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল।
নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত (স্পেশাল র্যাপোর্টার) রিম আলসালেম এই কালো তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, 'এই তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্ত আরও অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল।'
এছাড়াও ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়ার জবাবে জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে মহাসচিবের দরজা সব সময় খোলা রয়েছে।’
সূত্র: আলজাজিরা, মিডল ইষ্ট মনিটর
আইও