|| মুফতী মুহাম্মাদ আলী কাসেমী ||
কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন, শুধু বেঁচে থাকার জন্য নয়; তাঁরা আসেন মানুষ গড়তে, হৃদয় জাগাতে, ইলমের প্রদীপ জ্বালাতে। মালিবাগ মাদরাসার সাবেক মুহতামিম ও শাইখুল হাদীস, উস্তাযুল আসাতিযা, মুহাদ্দিসে আযীম আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ. ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব।
১৯৩৩ সালের ১৫ জুন যশোর জেলার কালীগঞ্জে তাঁর জন্ম। দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা অর্জন করে তিনি বাংলাদেশে ইলমে দ্বীনের এমন এক খেদমত রেখে গেছেন, যার সুবাস আজও ছড়িয়ে আছে অসংখ্য আলেম, তালিবে ইলম ও দ্বীনদার মানুষের হৃদয়ে। ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই তিনি ইন্তিকাল করেন। প্রায় চার দশকেরও অধিক সময় মালিবাগ জামিয়ার মুহতামিম ও শাইখুল হাদীস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইলমের ময়দানে অবিচল ছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন আল্লাহওয়ালা, নিভৃতচারী ইবাদতগুজার, সত্যবাদী, আমানতদার, দায়িত্বশীল ও নিরহঙ্কার এক মানুষ। তাঁর চরিত্রে ছিল মিষ্টভাষিতা, পরোপকার, ছাত্রস্নেহ, অতিথিপরায়ণতা এবং সমাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা। তাঁকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা জানেন, তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না; ছিলেন এক চলমান আদর্শ।
প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে তিনি বুখারী শরীফের দরস দিয়েছেন। বুখারী তো অনেকেই পড়ান, কিন্তু বুখারীকে জীবন্ত করে তুলতে পারেন কজন? তাঁর দরসে হাদীসের শব্দগুলো যেন প্রাণ পেত, ইতিহাস যেন চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়ে উঠত, আর আকাবিরদের ঘটনা যেন শ্রোতাদের সামনে মূর্ত হয়ে দাঁড়াত।
তাঁর তাকরীর ছিল অপূর্ব শ্রুতিমধুর। ক্লাসে বসে কেউ অমনোযোগী হওয়ার সুযোগ পেত না। জটিলতম আলোচনাও তাঁর সাবলীল উপস্থাপনায় সহজ হয়ে যেত। মনে হতো, তিনি শুধু পাঠ দিচ্ছেন না, বরং শ্রোতাদের নিয়ে ইতিহাসের ভেতরে হেঁটে বেড়াচ্ছেন।
আকাবিরদের কোনো ঘটনা যখন তিনি বর্ণনা করতেন, তখন মনে হতো তিনি যেন নিজেই সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইতিহাসের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিবরণ বলে যেতে পারতেন। আর আবেগের মুহূর্তে যখন তাঁর প্রিয় যশোরের আঞ্চলিক ভাষা এসে মিশে যেত, তখন পুরো মজলিস এক অনন্য রসে ভরে উঠত।
একদিন বুখারী শরীফের দরসে তিনি হযরত মূসা আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করছিলেন। তূর পাহাড়ে গমন, চল্লিশ দিনের অপেক্ষা, তাওরাত প্রাপ্তি, তারপর স্বজাতির কাছে ফিরে এসে বাছুরপূজার ভয়াবহ দৃশ্য দেখা।
ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি নিজের স্বভাবসুলভ যশোরের ভাষায় বললেন, "হযরত মূসা আ. এসে রাগ হয়ে হযরত হারুন আ.-কে বইল্লেন, এগেরে তো আপনার দায়িত্বে দিয়ে গিলাম। তা আপনি গেইলেন কোনে? এরা যে মূর্তি পূজোয় যুক্তো হলো? হারুন আলাইহিস সালাম বইল্লেন, এগেরে আমি বারবার বলিছি, বহু বুঝোয়েছি, এরা আমার কথা শুনিনি। তা আমি কি করবানে..!"
ক্লাসের এক দুষ্টু ছাত্র সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
"হুজুর! হযরত মূসা আ. আর হযরত হারুন আ.-এর বাড়ি মনে হয় যশোরেই ছিল!"
হুজুর একটুও বিরক্ত হলেন না। নির্মল হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করে বললেন,
"না হয় হলোই বা, আপনার হিংসে হছছে কেন?"
মুহূর্তেই পুরো শ্রেণিকক্ষে হাসির বন্যা বয়ে গেল।
আজ যখন এ ঘটনা পড়ি, তখন শুধু হাসিই আসে না; বুকের ভেতর কোথায় যেন হাহাকার জাগে। কী নির্মল ছিল তাঁদের অন্তর! কী সহজ ছিল তাঁদের আচরণ! কী অসাধারণ ছিল তাঁদের ছাত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক!
আজ যদি কোনো দরসে এমন কথা হতো, হয়তো পরিবেশ অন্যরকম হয়ে যেত। অথচ তাঁরা ছিলেন এতটাই উদার, এতটাই স্বচ্ছ হৃদয়ের মানুষ যে, ছাত্রের রসিকতাতেও স্নেহ খুঁজে পেতেন, অসম্মান নয়।
এমন মানুষদের চলে যাওয়া আসলে একটি যুগের অবসান। তাঁদের ইন্তিকাল শুধু একটি ব্যক্তির মৃত্যু নয়; ইলম, আখলাক, আদব, মমতা ও সরলতার এক একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি।
আল্লাহ তাআলা এই মহান বুযুর্গকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন। তাঁর ইলম, ইখলাস ও খেদমতের সওয়াব কিয়ামত পর্যন্ত জারি রাখুন।
রহিমাহুল্লাহি রাহমাতান ওয়াসিয়াহ।
রহিমাহুল্লাহু তা'আলা ওয়া আসকানাহু ফাসীহা জান্নাতিহি।
লেখক: মুহাদ্দিস ও লেখক-অনুবাদক
