রফিকুল ইসলাম জসিম ।। বাংলাদেশের বুকেই যে একটি গ্রাম রয়েছে, যার নাম শুকুর উল্লার গাঁও। বাংলাদেশের একমাত্র মুসলমান ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী মণিপুরি মুসলিম সম্প্রদায়ের এই গ্রামটি৷ ভারতের মণিপুর রাজ্যে তাদের আদিনিবাস বলে জানা যায়।
কমলগঞ্জে ধলাই নদীর তীরে অবস্থিত গ্রামটি মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্নেহ ছায়ায় পরিপূর্ণ। তিনর্দিকে ধলাই নদী পানি দিয়ে বেষ্টিত মনোরম এই গ্রামটির পেছনে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। এসব ফসলি জমির ফলেছে বিভিন্ন রকমের শাকসবজি। এই সবুজ-শ্যামলে গ্রামটিকে ছবির মতো স্বপ্নিল করে তুলেছে।
স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের জন্য মানুষ গুলো জীবনযাত্রার দেখে বাংলাদেশে বসবাসরত সকল প্রায় গ্রাম গুলোকে আলাদা তাই এই গ্রাম 'মণিপুর' হিসেবে অভিহিত করা যায়।
শুকুর উল্লার গাঁও,মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানার অন্তর্গত মাধবপুর ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের একটি প্রাচীন গ্রাম। ১৯২২ সালে মৌলভীবাজার মহকুমার হতে কমলগঞ্জ থানার মর্যাদা পাবার পর ১৯৮৩ সালে এটিকে উপজেলায় রুপান্তরিত করা হয়। থানা গঠনের পর থেকে শুকুর উল্লার গাঁও গ্রামটি কমলগঞ্জ থানার অন্তর্গত হয়।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, মণিপুর-মায়ানমার যুদ্ধের সময় (১৮১৯-১৮২৫)। মায়ানমার বা বর্মি দখলদার শক্তি প্রায় সাত বছর মণিপুরে রাজত্ব করে। ওই সময় কিছু সংখ্যক মণিপুরিরা সিলেটে পালিয়ে এসে শরণার্থী শিবিরে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করেন।
এমন খবর পেয়ে কুলাউড়ার পৃত্থিমপাশার জমিদার মোহাম্মদ আলী খান সাহেব তাদেরকে লংলার থাকার ব্যবস্থা করেন৷ পরবর্তীতে পৃত্থিমপাশার লংলার থেকে এসে ভানুাগাছের কাছে লংগুছড়ার বড় পুকুর পাড়ে এসে মণিপুরি মুসলিমের কয়েকটি পরিবার বসবাস শুরু করেন। পরে বর্তমান মাধবপুরে লতিলকলা একাডেমির উত্তরে জমিদার আমলে কাছাড়ি ঘর এলাকায় আশপাশে মণিপুরি মুসলিমদের কয়েকটি বাড়ী বসবাস করেছিলেন বলে জানা যায়৷

শুকুর উল্লার গাঁও এ গ্রামটির যাত্রা কবে থেকে শুরু হয়েছে তার সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও গ্রামটির নামকরণ নিয়ে এলাকাবাসির মধ্যে একটি তথ্য প্রচলিত আছে দ্বীর্ঘ দিন হতে তা হলো-এ জায়গায় বিশাল জঙ্গল ছিল এবং এখানে ছিল নানা প্রজাতির প্রাণীর অভয় আশ্রম, সে সময় ওখানে (জমিদার আমলে কাছাড়ি ঘর) এলাকায় বসবাসকারী আজ প্রায় দেড়শত বছর আগে মণিপুরি মুসলিম সম্প্রদায়ের ওখান থেকে একজন শুকুর উল্লা নামে এক লোক বসতি স্থাপন করে বলে গ্রামটির নামকরণ করা হয়েছে শুকুর উল্লার গাঁও।
জানা যায়, শুকুর উল্লা নামে ঐ লোকটি তার পিতা শেখ বানাম। মাতা নাম ছিল চান্দনু৷ শুক্রবারে জন্ম গ্রহণ করার করণে তার মা -বাবা শুকুর উল্লা নাম রাখেন৷ শুকুর উল্লা সাথে তার আপন ছোট ভাই আব্দুল হামিদ, সাথে প্রতিবেশি নবাব আলী এই গ্রামে নতুন বসবাস করেন। ধলাই নদীর ধারে খাদ্যের সহজ পাপ্রতার কারনে আশে পাশে গ্রাম গুলো থেকে লোকজন বসবাসের জন্য এখানে পাড়ি জমায়। ক্রমানয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে, গ্রামের আয়তনের সাথে লোক সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়।
বর্তমানে ১১০ পরিবার জনসংখ্যা প্রায় ৭/৮ শত জন। এই গ্রামের ঠিক মাঝে (আদমপুর -মাধবপুর) সড়ক বিদ্যমান। ঐ সড়কের ধলাই নদী উপর নির্মিত হয়েছে ধলাই সেতু৷ এ গ্রামের মধ্যখানে এলাকাবাসী নিত্য ব্যবহার্য্য বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র ক্রয় বিক্রয় জন্য ৪/৫ টি দোকানপাঠ গড়ে উঠে মিনি মার্কেট রুপ নিয়েছে। তার পাশে একটি মসজিদ সহ গ্রামে মোট ২টি মসজিদ, ১টি মাদ্রাসা, ঈদগাহ ও ১টি প্রাইমারী স্কুল রয়েছে। ফলশ্রুতিতে শুকুর উল্লার গাঁও গ্রামটি একটি আদর্শ এবং ঐতিহ্যবাহী গ্রামে পরিগনিত হয়।
১৯ শতকের শুরুর দিকে তৎকালীন সময়ে এই গ্রামে কয়েকজন মুনশি ও মওলানারা বসবাস করতেন এবং তাদের প্রচেষ্টায় গ্রামের সাধারণ মুসলমানগন ধর্মের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন, শুধু তাই নয়, ক্রমান্বয়ে মানুষ যখন ধর্মের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন এমনি এক শুভক্ষণে শুকুর উল্লার তার নিজের ভূমি থেকে মসজিদে জায়গা ২২শতক দান করে মানুষের প্রয়োজনের তাগিদে সবার সম্মতি ক্রমে এই গ্রামের উত্তর -পাড়ায় একটি জামে মসজিদ স্থাপন করা হয়, যার নাম দেওয়া হয় শুকুর উল্লার গাঁও জামে মসজিদ। সেই জায়গায় এখনো রয়েছে একটি মাদ্রাসা ও ঈদগাহ।
এ গ্রামে অসংখ্য গুণী ব্যক্তিবর্গের জন্ম হয়েছে। এ পর্যন্ত যে সব গুণীব্যক্তিবর্গ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন তন্মধ্যে অন্যতম যারা শিক্ষা বিস্তারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সনে শুকুর উল্লার গাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই এলাকাসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামের ছেলে মেয়েরা ঐ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা বিস্তারে অগ্রনী ভুমিকা পালন করছে।
শুকুর উল্লার গাঁও ছোট হলেও তার পরিধি বিশাল,এই গ্রামে শিক্ষা প্রতিষ্টান থেকে শত শত ছাত্র-দেশী-বিদেশে উচ্চ পদে চাকুরীরত। এ গ্রামে কৃতি ছাত্র মেডিক্যাল পড়ে ডাক্তার, ইঞ্জিয়ার হয়েছে। এ গ্রামের মানুষ বেশ কর্মঠ। পুরুষেরা খেতখামার আর নারীরা গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত। নারীদের স্বাবলম্বী করতে প্রতিটি পরিবারে ১ তাঁত রয়েছে এছাড়াও মণিপুরি সমাজের মাঝে খেলাধুলায় সক্রিয় অংশ গ্রহনের মাধ্যমে এ গ্রাম সুনাম অর্জন করছে। এ গ্রামে সকল মানুষগুলো বেঁচে থাকুক তার আপন মহিমায়। অতুলনীয় সৌন্দর্য, বৈচিত্র আর ঐতিহ্যগুলোও টিকে থাকুক প্রজন্মের অহংকার হয়ে।
বাংলাদেশ মণিপুরি সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। একটা মাত্র লেখার মাধ্যমে শত শত বছরের পুরোনো ও ঐতিহ্যমণ্ডিত এই সংস্কৃতির বর্ণনা দেওয়া কঠিন। আর আমার মতো সাধারণ মানুষের তো অনেক সীমাবদ্ধতা থাকে। মনে মনে ভয়ে ভয়ে থাকতে হয় যে লেখাটা আদৌ প্রকাশ হবে কি না। আর লেখাটা বেশি বড় হলে তো আরও ভয় থাকে যে পুরোটা প্রকাশ হবে নাকি কাটছাঁট হয়ে প্রকাশিত হবে। কিন্তু এত বড় একটা বিষয় নিয়ে আরও বিস্তৃত পরিসরে আলোচনা হওয়া দরকার।
এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জীবনধারা আর তাঁদের সংস্কৃতি নিয়ে, তাঁদের সমস্যা ও সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও গবেষণা হওয়া দরকার। সময় ও সুযোগ পেলে আমার এ বিষয়ে আরও লেখার ইচ্ছা রয়েছে। বাংলাদেশ বসবারত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পরিচয়ের পাশাপাশি ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি কালচার, উৎসব সম্পর্কে জীবন্ত ও প্রাণবন্তরুপে তুলে ধরবো ইনশাআল্লাহ।
লেখক: মণিপুরি মুসলিম সম্প্রদায়ের সংবাদকর্মী।
-এটি