রবিবার, ২১ জুন ২০২৬ ।। ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ৬ মহর্‌রম ১৪৪৮

শিরোনাম :
দুপুরের মধ্যে ব্যাপক ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা, নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্কসংকেত গুলশান থানা জমিয়তের কাউন্সিল, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত ৮ মাসে হাফেজ হওয়া ১০ বছরের আল-আমীনকে সংবর্ধনা ইরাকে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু, ২৬ দিন পর দেশে ফিরলো দুই প্রবাসীর লাশ লেবাননে হামলা বন্ধ করতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিলেন নেতানিয়াহু মাদারীপুরে ট্রেনের ধাক্কায় বৃদ্ধার মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে সুইজারল্যান্ডে যাচ্ছে ইরানের প্রতিনিধি দল ইসলামপন্থিদের শক্তিশালী মিডিয়া কাঠামো গড়ে তুলতে হবে: আমিরে মজলিস ৪০ দিন জামাতে নামাজ পড়ে সাইকেল পুরস্কার পেল ৯ কিশোর বাবাকে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ’ বলাটা সঠিক হয়নি: জামায়াত এমপি

আল্লামা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ রহ.; একজন বিমূর্ত মালির প্রতিচ্ছবি

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

আবুল ফাতাহ কাসেমী।।

অসহ্য যন্ত্রনায় মানুষের বাস। তবে এ মেকি যন্ত্রনা কখনো কখনো। এ সময়ে আমরা যা নির্মাণ করি তা এ যন্ত্রনারই এপিঠ ওপিঠ। কোরআনে বর্ণিত এ ভাব -‘আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি কষ্ট ক্লেশ আর যন্ত্রনাবস্থায়’— এ দিকটাতেই ইঙ্গিত করে। মানুষের মৃত্যুও যে এ অসহ্য যন্ত্রনার অনুষঙ্গ তা আমরা ক’জন উপলব্ধি করি। অন্তত আকাবির বিয়োগের এ কালটায়।

যুগে যুগে সাদামাটা যিন্দেগীর অনেক আকাবির আমাদের থেকে বিদায় নিয়েছেন। অনেককেই আমরা দেখেনি কিন্তু তাঁদের প্রকৃত উত্তরসূরীদের দেখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়েছি। আমাদের মত অপাঙক্তেয়দের জন্য এটা কত বড় খোশনসীব।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে ক’জন আকাবির আমাদের ছেড়ে লাব্বাইক বলেছেন নিঃসন্দেহ উস্তাদুল মুহতারাম, উস্তাদুল আসাতিযা আল্লামা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ রহ. তাঁদের অন্যতম। মৃত্যুর বছর হযরত যখন একদম মাযুর হয়ে পড়লেন তখন হযরতের ভক্তদের মধ্যে আহত পাখির মত আঘাত লাগলো। আমাদের দাওরা হাদীসের বছর। তাই আমরাও ভয়ে ছিলাম। হায়! হযরতের দরসে বসার সৌভাগ্য বুঝি আর হবে না। আল্লাহ আমাদের উপর মেহেরবানী করেছেন। আমাদের মতো নগন্য ছাত্রদেরও হযরতের আকাশসম ছাত্রদের জুতার সারিতে পা রাখার তৌফিক হয়। হযরতের হাদীসের মসনদে কপাল ঠেকিয়ে নাজাতের উসিলা খোঁজার নেয়ামত পাই।

ব্যক্তিত্বের ব্যপ্ততা, চিন্তার গভীরতা, জ্ঞান ও বৈশ্বাসিক দৃঢ়তা, আপন চিন্তা রসে পারঙ্গমতা ইত্যাদি গুনাবলী ছিল হযরতের মনুষ্য চেতনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষ করে মেধা গড়ার অসীম দক্ষতার এ কারে নবুওয়াতকে আমরা কালের আয়নায় দেখে উচ্চস্বরে বলি- ‘যার নযির পৃথিবীতে থাকলেও আমাদের বাংলাদেশে অতটা নেই’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দুনিয়া বিমুখতার এ উপমা প্রায় শুণ্যের ঘরে। যেমনটি ছিলেন তাঁর উস্তাদ ও মুরশিদ কুতুবুল আলম শাইখুল ইসলাম হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.। আমি কাজি সাহেব হুজুর রহ. এর জীবনের তিনটি পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করতে চাই।

উস্তাদ শাগরিদ সর্ম্পক
আমরা আকাবিরের যিন্দেগীতে উস্তাদ-শাগরিদের সম্পর্কের কথা পড়েছি। হুজ্জাতুল ইসলাম আর শাইখুল হিন্দের সম্পর্কের কথা শুনেছি। শাইখুল হিন্দ আর শাইখুল ইসলামের মাল্টার কাহিনী পড়েছি। হযরত কাশ্মিরী এবং বানুরী রহ. এর সম্পর্কের কথা উস্তাদদের মুখে শুনেছি। সম্পর্কের এ ফিরিস্তি গড়ার। বাঁচা এবং মরার। গাঁথুনিটা যদিও তৈরি হয় আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারকের বাণী-‘আল কাওয়ায়ীম’ (ইসনাদ) এর উপর। শেষটা হয় শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবি রহ. এর বিদায় বাণীর উপর। যা তিনি আপন উস্তাদ আবু তাহের মাদানী শাফেয়ী রহ. এর বিয়োগ ব্যথায় বলেছেনÑ ‘নাসীতু কুল্লা তারিকিন কুনতু আ’রিফুহু/ ইল্লা তারিকান ইউয়াদ্দিনী ইলা রাবইকুম’।

বিদায়ের এ দিনে চেনা অচেনা সবই ভুল
তোমার ঘরই এখন আমার নতুন কূল।

মুলত উস্তাদ শাগরিদের এক উপমার দিকেই আমার প্রয়াশ। উস্তাদ শাইখুল ইসলাম আর ছাত্র মুহাদ্দিসে বাঙ্গাল (কাজি সাহেব রহ.)। উস্তাদ শাগরেদের এ সম্পর্কের উপরই মুহাদ্দিসে বাঙ্গালের হাত ধরে এ বাংলায় উঠে আসে অসংখ্য ইলমি সম্পর্কের ধারা।

এবার বলি আসল কথা, আমাদের বাংলাদেশের অন্যান্য আকাবির থেকে কাজী সাহেব হুজুরের স্বাতন্ত্রের এ-ও একটা ধারা যে তাঁর হাতের অধিকাংশ ছাত্রই দেশব্যাপী কাজের মানুষ। সবাই দেশের বিদগ্ধ লেখক সাহিত্যিক, শাইখুল হাদীস, মুহাদ্দিস, আর ইসলামিক স্কলার। আর শেষ বয়সেও গড়েছেন আপন চিন্তা রসে উজ্জেবিত তারুণ্যের আরেক কাফেলা। প্রদীপ্ত যৌবনে যাদেরকে গড়েছেন তারাও আজ আমাদের আকাবিরদের আরেক কাফেলা। ফিকরে নবুওয়াত, কারে নবুওয়াত ও মানসাবে নবুওয়াত এর যৌথ সমন্বয়ে আপন আকাবিরের ওরাসাতের সবটুকু যেন দিয়ে গেছেন তার সুযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে। যশোরের লাউড়ি থেকে যাত্রাবাড়ী, ফরিদাবাদ, মালিবাগ ও জামিআ ইকরাসহ দেশের অনেকগুলো মাদরাসার হাদিসের মসনদে তিনি দিয়ে গেছেন তার চিন্তার সবটুকু। লাজনাতুত তলাবার মাধ্যমে ঝাঁকে ঝাঁকে মেধা শিকার করে এ উম্মাহকে উপহার দিয়েছেন এক দীঘল কাফেলা। এমন নির্মাতাদের জন্যই পৃথিবী কাঁদে।

ছাত্রদের প্রতি মমতা
ছাত্রদের প্রতি মমতা, এ গুন ছিল হুজুরের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। ছাত্রদের তিনি আপন সন্তানের মত জানতেন। ছাত্রদের প্রতি মমতার একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। জামিআ ইকরাতে আমাদের জালালাইনের বছর হুজুর ইকরাতে বুখারী পড়াতেন। প্রতিদিন সকালে একটি গাড়ি দিয়ে হুজুরকে আনা হতো। একদিন আমাদের এক সাথী বরকতের জন্য তার গাড়ি দিয়ে হুজুরকে মালিবাগ পৌঁছাতে ইচ্ছা করলো। দাওরার রুম থেকে হুজুর মাত্র দরস শেষ করে বের হলেন। এমন সময় সে ছাত্র গাড়ি ব্যাক করতে গিয়ে ভুলে হুজুরকে ফেলে দিল। আমাদের ছাত্র উস্তাদ সবাই দৌড়ে গেল। হুজুরকে উঠালো। এদিকে ঐ ছাত্র কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কাঁদতে কাঁদতে হুজুরের পা জড়িয়ে ধরলো। আর্শ্চযের বিষয় হলো হুজুর তাকে রাগ করলেন না। রাগের কোন ছাপও চেহারায় ফুটে উঠলো না। বরং তাকে কাছে ডেকে বুকে জড়ালেন। সেদিন ছাত্রদের প্রতি তার এ মমতা দেখে সবাই অবাক হয়েছিল। এ ছিল ছাত্রদের প্রতি হুজুরের শাফকত।

ফিকরে নববী ও কাজী সাহেব
যদি প্রশ্ন করা হয় কাজী সাহেব হুজুরের চিন্তা চেতনা কী? যা তিনি বলতেন। কাবার দিক থেকে উত্তর আসবে- শাইখ ও মুরশিদ হযরত মাদানীর চিন্তা। আর মাদানী চিন্তা বলতে আকাবিরে দেওবন্দের চিন্তা। দেওবন্দ বলতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত। আর এখান থেকেই ফিকরে নববী।

পাঠক, ফিকরে নববীর এ মানুষটিকে আপনি কোন অভিধায় ডাকবেন? মানুষ গড়ার প্রকৃত কারিগর? শাইখুল হাদীস? বিদগ্ধ মুহতামিম? একজন দুনিয়া বিমুখ নিভৃতচারী? উস্তাদুল আসাতিযা? আকাবিরে দেওবন্দ? আশিকে দেওবন্দ? মাদানী মসনদ? আকাবিরদের মাহবুব? বুযুর্গদের নুর? সমসাময়ীকদের শ্রেষ্ঠজন? উলামাদের রফিক? ইমাম বুখারীর শাগরিদ? ইমাম আবু হানিফা রহ. এর উত্তরসূরী? হযরত মাদানির চিন্তা নায়ক? হযরত থানবির আকিদাহ? দাওয়াত-তাবলিগের ঢাল? সবই তো তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অসহ্য যন্ত্রণার এ ক্ষণে এসে আমাদের নাকারাদের আশা-‘হে বিচার তুমি এসব পুর্বসূরীদের সাথে আমাদের হাশর করো। আমিন। আমিন। ইয়া রব। আমিন।

লেখক: তরুণ লেখক, অনুবাদক ও উস্তাদ, জামিয়া কারিমিয়া রামপুরা, ঢাকা।

-এএ


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ