১৯৯১ সালের ২৪ অক্টোবর, রাত বোধ হয় ৪টা সাড়ে ৪টা হবে। দিগন্ত পরিবহনের একটি বাসে করে যশোর থেকে ঢাকা আসছিলাম-জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সিঁড়ি আমার আব্বার সাথে। আমি তখন ১৮ বছরের কিশোর। বাসে ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। আব্বার ডাকে ঘুম ভাঙল।
আব্বা বললেন ‘ডানে তাকা’। ঘুম ঘুম চোখে তাকালাম। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহের হালকা কুয়াশার চাঁদরে ঢাকা সাদা নিয়ন আলোয় লেখা সাইনবোর্ড দেখলাম। বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি)।
আব্বা বললেন, তোকে ঢাকা নিয়ে আসলাম, দিয়ে যাব এই ঢাকা শহরেই, নিয়ে যেতে চাই এখান থেকেই। পিএটিসি কি আমি তখন জানতাম না। আব্বা বুঝিয়ে বললেন, বাংলাদেশের বড় অফিসারদের এখানেই প্রশিক্ষণ হয়। এখান থেকে প্রশিক্ষণ শেষে তারা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারি কাজ পরিচালনা করে।
সেই থেকেই স্বপ্নের শুরু। তারপর নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে, নানা বাঁক ঘুরে স্বপ্ন সত্যি হল। ৩০ জুন’৯৮, ১৮ তম বিসিএস পরীক্ষার ফল বেরুলো। দুরুদুরু বক্ষে জনকণ্ঠ পত্রিকার পাতায় নিজের রোল নম্বরটি (৫২২৬৭) খুঁজে পেলাম। যতটা না আমার তার চেয়েও বেশি আব্বার স্বপ্ন সত্যি হল। তখনকার দিনে মোবাইল ফোন ছিলই না বলা চলে। ঢাকাতে প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করলাম। স্কুল শিক্ষকের সন্তান, নানা আর্থিক টানাপোড়েনে বাংলাদেশের আর দশটা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মতই আমার বেড়ে ওঠা। ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার আগেই প্রথম প্রচেষ্টাতেই বিসিএসে কাঙ্ক্ষিত ক্যাডারে চাকরি পাওয়া আমার-আমাদের মত ছেলেদের জন্য আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতই।
ছুটলাম গাবতলীতে, রাতের বাস ধরে পৌঁছলাম যশোরে। আরিচা ঘাটের দীর্ঘ জ্যামের কারণে বাড়ী পৌঁছতে পৌঁছতে সকাল ৮টা সাড়ে আটটা। রাজপথ থেকে নেমে বলতে গেলে ছুটতে লাগলাম বাড়ীর পথে। পথের মাঝেই আব্বার সাথে দেখা। মুখে কিছু বলতে পারলাম না, কদমবুচি করলাম রাস্তার মাঝেই। চোখে বন্যা এল- আনন্দের।
আব্বা বুঝলেন তার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। বললেন, সারাজীবন পরের ছেলেপুলে মানুষ করেছি- স্বপ্ন ছিল আমার ছেলেও একদিন বড় কিছু হবে। আমাকে হাতে ধরে আবার ফিরতি পথে বাড়ী ফিরে এলেন। ততক্ষণে সারাগ্রাম আমাদের টিনের ঘরের সামনে উপচে পড়েছে।
গ্রামের মানুষ বিসিএস, এএসপি এত কিছু বুঝে না। মানুষের মুখে মুখে তখন একই কথা “মাস্টার সাহেবের ছেলে এসপি হয়েছে”।
আমি প্রাণভরে উপভোগ করলাম আমার বাবা মা, আত্মীয় স্বজনদের আনন্দাশ্রু। বাড়ী ভরা লোক, মিষ্টি খাওয়াতে হবে। এদিকে মাসেরও শেষ দিন। আব্বার পকেটে টাকা নেই। তাই এত আনন্দের মাঝেও আব্বার মুখ কাঁচুমাচু। বরাবরের মতই ত্রাতার ভূমিকায় এগিয়ে আসলেন মা। দশ টাকা, পাচঁ টাকা, দু টাকা, এক টাকা, দুয়েকটা একশ টাকার নোট à