আবু তালহা মিহরাব
রাত অনেক গভীর। সবাই ঘুমে। বারান্দার লাইট জ্বালানো। হঠাৎ হাঁটার শব্দ শুনা যায়। কোনো একজন হাঁটছে নিশ্চয়। ভৌতিক আওয়াজ। শুনতে কেমন যেনো ভয় লাগে।
মানুষ সাধারণত এভাবে হাঁটে না। শক্ত মাটিতে গরুর হাঁটার মতো শব্দ। এমন ভাবে পা ফেলে, যেনো বারান্দা মাপছে। মাঝে মাঝে থামে, শুরু করে আবার। লোকটার হাঁটা ভূত এবং মানুষের ক্যাটাগরিতে পড়ে না। ভূতের হাঁটা অনেক ভৌতিক, মানুষেরটা আরো স্বাভাবিক।
শান্তভাবে হাঁটলেও পেছন থেকে ধাওয়া করে একটা অচেনা ভয়। আমি ভয়ে কাঁপতে থাকি। গলা শুকিয়ে খটোমটো। ঢুক গিলতে পারছি না। হাটুর উপর থেকে কাঁথা টেনে মাথা ঢেকে নিই।
ডান কাত হয়ে ঘুমুতে মন চায়। খাটের খটমট শব্দের ভয়ে কাত পরির্বতন করিনি। এতক্ষণে ফোঁটা ফোঁটা শিশির বিন্দুর মতো কপালে ঘাম জমে উঠে। বুক ধড়ফড় ধড়ফড় করে।
লোকটা দরোজায় কান পাতে। ভেতরের কিছু শুনতে চায়। আমি খুব আস্তে আস্তে শ্বাস ছাড়ি। অনুভূব করলাম, কাঁথা ধরে কেউ টানছে। হৃৎপি-ে শুরু হয় হাতুড়ি পেটা। ডানহাত চেপে ধরি বুকে। কাঁপা থামে না।
ভয়ংকর সব প্রশ্ন বরফের মতো বুকে জমাট বাঁধে। রুমে ঢুকল কে? আমি কি দরোজা খুলে ঘুমিয়েছিলাম? কেউ তো এলে শব্দ পেতাম। একবার ভাবি, কাঁথার ফাঁক দিয়ে দরোজাটা দেখে নিই।
আমি কাজটা অনায়াসে করতে পারতাম। কিন্তু চোখ মেলে তাকাতে ইচ্ছে করছে না এ মুহূর্তে। কাঁথা টানা বন্ধ হয়। আসলে, কাঁথা কেউ টানেনি; মনের ভুল।
কাচের জানালা দিয়ে লোকটার কালো ছায়া দেখা যায়। এলোমেলো ঝাঁকড়া চুল, নীলাভ দাড়ি, খাড়া খাড়া শক্ত মুঁচ। ধূসর চেহারা। চোখ দুটো বিড়ালের মতো জ্বলজ্বল করে ওঠে। জানালায় পড়ছে লোকটার নিঃশ্বাসের ছাপ।
শীতের কুয়াশা যেনো লেপ্টে আছে কাচে। বুকের উঠানামায় বুঝা যায়, লোকটা শ্বাস ফেলছে খুব দ্রুত। হাত দিয়ে বাষ্পগুলো মুছে দেয়। আঙুল তুলে হঠাৎ আমার দিকে কী যেন ইশারা করে। কিছু বুঝে উঠতে পারিনি।
লোকটার অদ্ভূত আচরণ আমাকে বিস্ময় করে তুলে। তাকাতে পারছি না আর। চোখ বন্ধ করে নিই। আমাকে দৌড়াচ্ছে। বিশাল রাস্তার উপর দিয়ে দ্রুত বেগে ছুটে চলছি। পেছনে পেছনে লোকটা। আমার হাঁটা এগোয় না।
পা যেনো পেছনে দৌড়ে। লোকটা আমার একেবারে কাছে চলে এলো। হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারবে। আলতো করে আমার মাথা ছুঁয়। আমি আধমরা হয়ে যাই ভয়ে। কাঁপতে কাঁপতে ঘাড় ফিরে পেছনে তাকাই।
বাবা! তুমি? কথা বললেন না। শরীর থেকে পারফিউম বেরুয়। কড়া গন্ধ। বাবা বেঁচে থাকতে এরকম তীব্রগন্ধযুক্ত পারফিউম ব্যবহার করতেন। চেহারাটা অনেক বদলে গেছে। সেলাই ছাড়া কুর্তা পরে এলেন।
বাবার ঠোঁট নড়ে ওঠে। শব্দ করে কথা বলতে চেষ্টা করেন। কিন্তু শব্দ হচ্ছে না কোনো ভাবেই। আমার কাছে এখন বাবাকে অতি স্বাভাবিক মানুষ মনে হয়। যদিও তিনি