বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬ ।। ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ২ সফর ১৪৪৮


অপ্রয়োজনীয় সিজার কে না বলি

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| ফিয়াদ নওশাদ ইয়ামিন ||

একটি দৃশ্য কল্পনা করুন। একটি মা, যিনি সম্পূর্ণ সুস্থ, তার শরীর প্রস্তুত, শিশুর অবস্থান স্বাভাবিক, গর্ভাবস্থার পুরো রিপোর্ট স্বাভাবিক। পরিবার অপেক্ষায় আছে একটি স্বাভাবিক প্রসবের। কিন্তু প্রসব কক্ষে কিছু সময় পর্যবেক্ষণের পর জানানো হলো, স্বাভাবিক প্রসব ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তাই অপারেশনই সবচেয়ে নিরাপদ পথ। মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত, ভয়, এবং চাপ একসাথে মিশে যায়। সিদ্ধান্তটা একসময় ছিল স্বাভাবিক চিকিৎসা আলোচনার অংশ, তা মুহূর্তেই পরিণত হয় জরুরি মানসিক চাপের সিদ্ধান্তে।

এই প্রশ্ন এখানেই শেষ হয় না। এটা কি শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনা, নাকি ধীরে ধীরে একটি বড় সামাজিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, যেখানে স্বাভাবিক জন্মের জায়গা দখল করছে অস্ত্রোপচার?

একটি সমাজকে বোঝার জন্য তার মাতৃত্ব ব্যবস্থাকে বোঝা জরুরি। কারণ মাতৃত্ব কেবল একটি চিকিৎসা বিষয় নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ, একটি প্রজন্মের সূচনা। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা বলছে, সেই সূচনাই ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক পথ থেকে সরে গিয়ে একটি অস্ত্রোপচারনির্ভর ব্যবস্থায় রূপ নিচ্ছে।

মানবদেহ কোনো এলোমেলো কাঠামো নয়। বিশেষ করে নারীর শরীর গর্ভধারণ থেকে প্রসব পর্যন্ত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাকৃতিক সিস্টেম অনুসরণ করে। শিশুকে পৃথিবীতে আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। এই প্রক্রিয়ায় শরীর নিজেই সংকোচন তৈরি করে, যা ধাপে ধাপে প্রসবকে এগিয়ে নেয়। এখানে মা ও শিশুর শরীর একটি সমন্বিত জৈবিক ছন্দে কাজ করে। এই কারণেই স্বাভাবিক প্রসবকে মানবদেহের মূল বায়োলজিক্যাল পদ্ধতি হিসেবে ধরা হয়।

স্বাভাবিক প্রসবের সময় শিশুর শরীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ঘটে। জন্মের সময় সে মায়ের শরীরের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসে, যা তার ইমিউন সিস্টেম গঠনে ভূমিকা রাখে। একই সাথে ফুসফুসে থাকা তরল বের হয়ে গিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়। গবেষণায় দেখা যায়, এই প্রাকৃতিক জন্মপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি এবং কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকে।

প্রসব ব্যথাকে অনেক সময় শুধুই কষ্ট হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এটি একটি কার্যকর জৈবিক সিগন্যাল। এই সময় শরীরে অক্সিটোসিন ও এন্ডরফিন নিঃসৃত হয়, যা জরায়ুকে কার্যকরভাবে কাজ করতে সাহায্য করে এবং ব্যথাকে সহনীয় করে তোলে। একই সাথে এটি মা ও শিশুর মধ্যে গভীর আবেগীয় সংযোগ তৈরি করে, যা জন্মের পরবর্তী সম্পর্ককে শক্তিশালী করে।

একটি দেশে সিজারের স্বাভাবিক হার হওয়া উচিত প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কিছু অঞ্চলে এই হার ৮০ শতাংশেরও বেশি ছড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে শহরকেন্দ্রিক হাসপাতাল ব্যবস্থার কারণে গত দশকে সিজারের হার প্রায় ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি শুধু চিকিৎসা পরিবর্তন নয়, বরং একটি সামাজিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সংখ্যা নয়, এটি শরীর ও ভবিষ্যৎ মাতৃত্বের সাথে সম্পর্কিত। অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় সিজার অনেক ক্ষেত্রে মায়ের স্বাভাবিক শারীরিক সক্ষমতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে শরীরের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে মাথাব্যথা বা দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অস্বস্তির মতো সমস্যা দেখা দেওয়ার কথা চিকিৎসা আলোচনায় উঠে আসে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভবিষ্যৎ মাতৃত্ব। একাধিক সিজারের ফলে জরায়ুতে দাগ তৈরি হয়, যা পরবর্তী গর্ভধারণে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। সাবফার্টিলিটি এবং মিসক্যারেজের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে জরায়ু অপসারণের মতো বড় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনও দেখা দিতে পারে, যা একটি গুরুতর চিকিৎসা বাস্তবতা।শিশুর ক্ষেত্রেও এর প্রভাব রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে,কিছু ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি এবং ইমিউন সিস্টেম সম্পর্কিত সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। 

এই বাস্তবতার বিপরীতে আরেকটি চিত্রও রয়েছে। অনেক গাইনি বিশেষজ্ঞ আজও অপ্রয়োজনীয় সিজারের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছেন। তবে একইসাথে কিছু প্রাইভেট হাসপাতালের কাঠামো এবং বাণিজ্যিক চাপ এই প্রবণতাকে আরও জটিল করে তুলছে। রোগী এবং পরিবারের উপর ভয়, সময় সংকট এবং সিদ্ধান্তহীনতা কাজ করে, যা শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের দিকে ঠেলে দেয়।

অন্যদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা কিংবা কিছু কম চিকিৎসা-নির্ভর সমাজে সিজারের হার তুলনামূলকভাবে কম। সেখানে অধিকাংশ প্রসব স্বাভাবিকভাবেই সম্পন্ন হয় এবং মা ও শিশু উভয়েই সুস্থ থাকে। এই বৈপরীত্য দেখিয়ে দেয় যে পরিবেশ, জীবনযাপন এবং চিকিৎসা কাঠামো এখানে বড় ভূমিকা রাখে।

স্বাভাবিক প্রসবের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী। মানবদেহ নিজেই এই প্রক্রিয়ার জন্য তৈরি। জরায়ু সংকোচন, হরমোন নিঃসরণ এবং শরীরের সমন্বিত প্রতিক্রিয়া একটি স্বাভাবিক জন্ম প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে। এই সময় অক্সিটোসিন ও এন্ডরফিন নিঃসৃত হয়, যা শরীরকে স্বাভাবিকভাবে প্রসব সম্পন্ন করতে সাহায্য করে এবং মা ও শিশুর মধ্যে আবেগীয় বন্ধন তৈরি করে।

ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকেও মাতৃত্ব একটি স্বাভাবিক ও সম্মানিত প্রক্রিয়া। এখানে কষ্টকে অর্থহীন নয়, বরং একটি অর্থবহ ও ধৈর্যপূর্ণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হয়, যেখানে জীবনের সূচনা স্বাভাবিক নিয়মেই সম্পন্ন হওয়া উচিত।

স্বাভাবিক প্রসব মানবদেহের মা ও শিশুর জন্য প্রাকৃতিকভাবে উপকারী। সিজার কোনো শত্রু নয়, এটি একটি জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পদ্ধতি। যখন সত্যিকারের ঝুঁকি থাকে, তখন এটি অপরিহার্য। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এটি প্রয়োজনের বাইরে গিয়ে একটি সাধারণ প্রবণতায় পরিণত হয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত ভয় থেকে নয়, তথ্য ও সচেতনতা থেকে। তাই সচেতনতা, সঠিক তথ্য এবং অপ্রয়োজনীয় ভয়মুক্ত সিদ্ধান্তই মাতৃত্বকে তার প্রকৃত স্বাভাবিকতায় ফিরিয়ে আনতে।


লেখক: শিক্ষার্থী, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ 

এসএইচ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ