সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬ ।। ১৭ ফাল্গুন ১৪৩২ ।। ১৩ রমজান ১৪৪৭

শিরোনাম :
খামেনিকে হত্যা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন: শেহবাজ শরিফ ইরানের নতুন নেতারা কথা বলতে চায় বলে দাবি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে চলমান হামলা সামনের দিনগুলোতে আরও তীব্র হবে: নেতানিয়াহু ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় কঠোর হমলা চলবে: ইরানের প্রেসিডেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সৌদি আরব বাড়ল ওয়াসার এটিএম বুথের পানির দাম যুদ্ধ বন্ধে অবিলম্বে কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জমিয়তের প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন খামেনি হত্যার কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিলো হিজবুল্লাহ ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানীর নামে প্রতারণা, সাবধান করল ইফা

একজন আলেমে রব্বানীর প্রতিকৃতি: মাওলানা আবু সাবের আব্দুল্লাহ

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

প্রতিটি দেশের একটি সীমানা থাকে, সীমান্ত প্রহরী থাকে। ইসলামেরও একটি সীমানা আছে। কর্মগত,চিন্তাগত সকল বিধি-বিধানের আছে সুস্পষ্ট চৌহদ্দি, সুনির্দিষ্ট অবকাঠামাে। এর ভিতর যা পড়ে তা ইসলাম, যা পড়ে না তা অনিসলাম।

ইসলামী বিধি-বিধানের এই সীমান্ত যারা প্রহরা দেন, যারা ইসলামকে স্বরূপে উপস্থাপন করেন, তারা হলেন আহলে ইসলামের জামাত, উলামায়ে কেরামের জামাত। আল্লাহ তাঁর মনােনীত এই দীন সংরক্ষণের জন্য যুগে যুগে উলামায়ে কেরামের এমন জামাত সৃষ্টি করে থাকেন, যারা সকল লােভ-লালসা, ভয়ভীতি এবং চরম প্রতিকূলতা উজিয়ে দীন রক্ষার মিশনে নিজেদের উৎসর্গ করেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, প্রত্যেক প্রজন্মের নির্ভরযােগ্য নেক্কার উত্তরসূরীরা (পূর্বসূরীদের কাছ থেকে) এই দীনী ইলম ধারণ করবে। আর গুলুকারীদের (বাড়াবাড়ি) বিকৃতি, ইসলামবিরােধী বাতিলপন্থীদের মিথ্যাচার এবং মূর্খদের অপব্যাখ্যা বিদূরিত করবে (এবং দীনের স্বরূপ সংক্ষরণ করবে)। -শরহু মুশকিলিল আছার, হাদীস নং: ৩৮৮৪।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : এই উম্মতের একটি দল সর্বদা হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তাদের বিরুদ্ধাচরণকারীরা তাদের দীনের কোনাে ক্ষতি করতে পারবে না; যে যাবৎ না কিয়ামতের নির্ধারিত আলামত প্রকাশ পায়। -সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৯২০

ইসলাম সংক্ষরণের দায়িত্ব নিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা। ফলে কোন যামানা আহলে ইলম থেকে শূন্য হয় না। ইসলাম ধর্মে বিকৃতি সাধন করে কেউ কখনাে পার পায়নি। আগের, পরের কিংবা সমকালের অধিকাংশ আহলে ইলম ঐ বিকৃতি নস্যাৎ করে দেন। ইসলাম-অনিসলামের পার্থক্য দিন-রাতের মতই পরিষ্কার করে দেন। দীন সংক্ষরণের ‘মিন জানিবীল্লাহ নিবেদিতপ্রাণ সেই আল্লাহ প্রেমিক নিঃস্বার্থ আহলে ইমামগণের ধারাবাহিকতায় কালের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেন আমাদের উস্তাদ ও মুরুব্বি হযরত মাওলানা কাজী মু'তাসিম বিল্লাহ রহ. (জন্ম: ১৩৫২ হি. মৃত্যু: ১৪৩৪ হি.)।

কাজী সাহেব হুজুর রহ. ছিলেন একজন আলেমে রব্বানী। আজীবন তিনি নিজের আলেমানা দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিষয়ে সচেতন ছিলেন। নিজের আলেম পরিচয়ের মাঝে তিনি জীবনের যাবতীয় মাহাত্ম ও বৈভব খুঁজে পেতেন। যে সমস্ত আলেমানা গুণ হুজুরের ব্যক্তিতে পরিদৃশ্যমান ছিল, হুজুরের জীবন যে বৈশিষ্ট্যগুলাে কেন্দ্র করে আবর্তিত ছিল, তার মাত্র কয়েকটি নিলেও আমাদের সামনে ভেসে উঠবে একজন আলেমে রব্বানীর প্রতিচ্ছবি, সালাফে সালেহীনের জীবন্ত নমুনা।

ইনাবাত ইলাল্লাহ ছিল হুজুরের বড় গুণ। সকল অবস্থায় আল্লাহমুখিতা এবং আখেরাতমুখিতা প্রতিভাত ছিল হুজুরের প্রতিটি আচরণে। আর এতে কোনাে কৃত্রিমতা ছিল না। আল্লাহর সাথে হুজুরের সম্পর্কটা ছিল সরল শিশুর মতাে। পিতা-মাতার প্রতি একটি শিশু যেমন স্বভাব-সঞ্জাত আকর্ষণে সমর্পিত হয়, কাজী সাহেবও শিশুর সারল্যে আল্লাহর প্রতি সমর্পিত থাকতেন। সুখের সময় তাঁর সর্বাঙ্গ থেকে শােকর যেন ঝরে ঝরে পড়ত। আর দুঃখের দিনে আল্লাহর প্রতি সমর্পণ ও সবর তাঁকে মহিমান্বিত করত। একবার হাসপাতালে হুজুর আমাকে স্মরণ করলেন। খবর পেয়ে ছুটে গেলাম।

দোয়া পড়লাম - لا بأس طهور إن شاء الله “দুঃখের কিছু নেই। আল্লাহ চাহেন তাে এই রােগ-যন্ত্রণা গুনাহখাতা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিবেন।” -সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৩৬১৬

أسأل الله العظيم رب العرش العظيم أن يشفيك “মহান আরশের মালিক মহামহিম আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন আপনাকে। রােগমুক্ত করেন।”-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ৩১০৬

হুজুর ‘আমীন আমীন’ বললেন। ব্যাকুল হয়ে আমাকে কাছে টেনে বললেন, মাওলানা! আখেরাতের ঘাঁটিগুলাে কীভাবে পার হব? আরজ করলাম, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে যাকে মহব্বত করে সে তার সঙ্গে থাকবে। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬১৬৮) আপনি ইনশাআল্লাহ আপনার মাহবুব আকাবির ও সালাফে সালেহীনের সঙ্গে থাকবেন। হুজর শিশুর মতাে কাদলেন, আর আকাশের দিকে দুহাত তুলে বলতে লাগলেন, ‘কবুল কর আল্লাহ! কবুল কর!'

সাহাবায়ে কেরাম ইলমে দীন গ্রহণ করেছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছ থেকে। তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন তাবেঈনে কেরাম। তাবেঈনের কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন তাদের পরবর্তীগণ। এভাবে প্রজন্ম-পরম্পরায় এক অবিচ্ছিন্ন স্রোতধারায় আমাদের পর্যন্ত দীন ও দীনী ইলম পৌঁছেছে। সাহাবা-তাবেঈনের যামানায় সূত্রবিচ্ছিন্ন কোনাে ব্যক্তি দীনের সংরক্ষক আহলে ইলমের কাতারে আসতে পারেনি। পরবর্তীকালেও বিচ্ছিন্নসূত্র থেকে বিদ্যা অর্জন করে কেউ কখনও আহলে ইলম ও আহলে হক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারেনি। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তােমরা ইলম অর্জন কর তা বিদায় নেয়ার আগে। সাহাবীগণ আরজ করলেন, ইলম কীভাবে বিদায় নেবে-হে আল্লাহর নবী! আমাদের মাঝে তাে আল্লাহর কিতাব বিদ্যমান? বর্ণনাকারী বলেন, এ কথায় নবীজি রুষ্ট হলেন। অতঃপর বললেন, তােমাদের মরণ হােক! বনী ইসরাইলের মাঝে কি তাওরাত-ইঞ্জিল ছিল না? কিন্তু (ইলম অর্জন ও দীন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে) শুধু কিতাব তাদের কোনাে কাজে আসেনি। আরে! ইলম বিদায় নেওয়ার অর্থ আহলে ইলম-এর (থেকে ইলম শিখে নেওয়ার আগেই তার) মৃত্যু হওয়া, ইলম বিদায় নেওয়ার অর্থ আহলে ইলম বিদায় নেওয়া।” -সুনানে দারেমী, হাদীস নং: ২৪৬

প্রখ্যাত তাবেঈ মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (মৃত: ১১০ হি.) রহ. বলতেন, “এই ইলম হল দীন। সুতরাং তােমরা লক্ষ রাখ, তােমাদের দীন কার কাছ থেকে গ্রহণ করছ।”- মুকাদ্দিমায়ে সহীহ মুসলিম।

সুতরাং ইলম অর্জন করতে হবে আহলে ইলম থেকে। যার সূত্র নেই, যে নেককার নয়, তার কাছ থেকে ইলম গ্রহণ করা যায় না। ইলমে দীন গ্রহণ করতে হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রবাহিত নেককার উস্তাদ-শাগরেদগণের অবিচ্ছিন্ন স্রোতধারা। হযরত কাজী সাহেব রহ. এমনই এক স্বীকৃত আহলে ইলমের স্রোতধারা থেকে ইলম অর্জন করেছেন। আর এ ধারার মহান আকাবির ও পূর্বপুরুষগণের প্রতি প্রেম ও ভালােবাসা তাঁর রক্ত-মাংশে মিশে গিয়েছিল। নিকটতম আকাবির হযরত মাদানী রহ. থেকে উপরের দিকে শাহ ওয়ালি উল্লাহ রহ. পর্যন্ত সাত স্তরের সালাফে সালেহীনের প্রতি কাজী সাহেব হুজুরের আস্থা ও শ্রদ্ধা ছিল এক কথায় অপরিসীম। এঁদের দীনদারি, তাকওয়া-পরহেজগারি, উলূম ও মাআরিফ এবং দীনী খেদমতের আলােচনা-কল্পনাই ছিল তাঁর এশকের নিরালা জগৎ। বিশেষত তাঁর শায়খ ও মুরশিদ শায়খুল ইসলাম হযরত মাদানী রহ.-এর প্রতি তাঁর ভক্তি ও ভালােবাসা তাে প্রবাদতুল্য। মূলত তিনি সালাফে সালেহীনের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালােবাসার বিরাট দৌলত লাভ করেছিলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে দোয়া শিখিয়েছেন, “হে আল্লাহ! আমাকে দাও তােমার ভালােবাসা, যে তােমাকে ভালােবাসে তার প্রতি ভালােবাসা এবং এমন কাজের তাওফীক, যা আমাকে তােমার ভালােবাসায় উত্তীর্ণ করবে।” -সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ৩৪৯০

কুরআন মাজীদে আল্লাহ পাক বলেন: “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও এবং আমাদের ভ্রাতৃবৃন্দকেও, যারা আমাদের আগে ঈমান এনে গত হয়েছেন। আর ঈমানদারগণের বিষয়ে আমাদের অন্তরে কোনাে দ্বেষ বাকী রেখ না। আমাদের মালিক! তুমি বড় স্নেহময়, বড় দয়ালু।” -সূরা হাশর, আয়াত নং: ১০

সবার জন্যই তাকওয়া-তাহারাত, যুহদ-কানাআত, ইখলাস-ইস্তেগনা ইত্যাদি শরীয়তের অত্যন্ত মাতলুব বিষয়। আর এগুলাে অর্থাৎ দুনিয়াবিমুখতা, অল্পেতুষ্টি, নিলোভতা, প্রচারবিমুখতা, খােদাভীতি ও যাহেরী-বাতেনী পবিত্রতা ইত্যাদি হল একজন আলেমে রব্বানীর অপরিহার্য গুণ, আহলে ইলমের কাতারে শামিল হওয়ার পূর্বশর্ত। হযরত কাজী সাহেব হুজুর ছিলেন এ সকল গুণাবলীর বাস্তব নমুনা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মরহুম আব্দুর রশীদ তর্কবাগিশ কাজী সাহেব হুজুরের নামে বায়তুল মুকাররমের দুটি দোকান বরাদ্দ নিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু হুজুর নিতে অস্বীকার করেন। মাদরাসার এক ছেলেকে হুজুর ফোনে কথা বলার জন্য পাঠালেন। সে অল্প টাকায় দীর্ঘসময় কথা বলে ফিরে এল। খােঁজ নিয়ে জানা গেল, ওটা চোরাই লাইনের ফোন। হুজুর হিসাব করে পূর্ণ টাকার ডাক টিকেট কিনে ছিঁড়ে ফেললেন এবং বললেন, রাষ্ট্রের টাকা রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দিলাম। উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় কাজী সাহেব হুজুর ইরাকের পক্ষে ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উপস্থিতির বিরুদ্ধে ছিলেন। ইরাক সরকার তার পক্ষে জনমত গঠনের জন্য বিরাট ফান্ড সরবরাহ করেছিল। কাজী সাহেব হুজুর এ ফান্ড সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করেন।

আল্লাহকে অনুভব করার বিষয়টি মানুষের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত। এজন্য পৃথিবীর প্রায় সকল মানুষ স্রষ্টায় বিশ্বাস। এই সৃষ্টিগত সুপ্ত বৈশিষ্ট্যকে যে যত বিকশিত করতে পারে, সে তত সফল। হযরত কাজী সাহেব রহ. এক্ষেত্রে বিরল সফলতার অধিকারী ছিলেন। যখন নামাযে দাঁড়াতেন, মনে হত আল্লাহর সাথে কানাকানি করছেন। পৃথিবীর সব ভার ফেলে দিয়ে শান্ত-সমাহিত চিত্তে দীর্ঘ নামাযে নিমগ্ন হয়ে যেতেন। সেজদায় গেলে মনে হত, শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, রক্তবিন্দু এমনকি পােশাক-আশাকসহ যেন একযােগে লুটিয়ে পড়েছে আল্লাহ তা'আলার কুদরতি পায়ে। দোয়ার জন্য হাত তুললে মনে হত, আহা! আমাদের আল্লাহ আমাদের কত কাছে! আমাদের স্রষ্টা আমাদের কত নিকটে!

হুজুর আজীবন নিজের ইবাদত-বন্দেগী, যিকির-আযকার লােকচক্ষুর অন্তরালে রেখেছেন। তিনি যে একজন বড় মাপের ব্যক্তি, কাউকে তা ঘুণাক্ষরেও জানতে দিতেন না, বরং তা যেন নিজেই বেমালুম ভুলে থাকতেন। তবে তিনি আত্মমর্যাদা-সচেতন ছিলেন। কখনও আহলে ইলমের মর্যাদা ক্ষুন্ন হতে দিতেন না। এমন কোনাে কাজ করতেন না, যার ফলে ইলমের মর্যাদাহানি হয়।

বিনয়-নম্রতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মার্জিত কথাবার্তা, শৃঙ্খলা-সুরুচি, ভদ্রতা ও সৌজন্যবােধ ইত্যাদির ক্ষেত্রে সচরাচর হুজুরের জুড়ি মেলা কঠিন। হুজুর কখনও অরুচিকর কোন শব্দ মুখে আনতেন না। কারাে ওপর দৃষ্টিকটু কঠোরতা করতেন না। অথচ তিনি যে পদে কাজ করতেন, সেখানে কঠোরতা ব্যতীত শৃঙ্খলা রক্ষা করা বেশ কঠিন। কিন্তু হুজুর নিজের গাম্ভীর্য, ভদ্রজনােচিত শাসন-পদ্ধতি, উপদেশ-নসীহত ইত্যাদির মাধ্যমে কাজ উদ্ধার করতেন। কথা বলতেন বিশুদ্ধ ভাষায়, ভরাট গলায়। হুজুরের কাছে মানুষমাত্রই ছিল শ্রদ্ধার পাত্র। তার বিনয়-নম্রতা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত।

হুজুরের সাধারণ কথাবার্তাও ছিল সাহিত্যরসপূর্ণ এবং প্রসাদগুণসম্পন্ন। মালিবাগ জামিয়ার সেক্রেটারি আলহাজ্ব হারুন-অর-রশীদ সাহেব একবার হুজুরকে হাসপাতালে দেখতে এলেন। আলেম-উলামার অনেক উপস্থিতি দেখে বললেন, আমি নগণ্য মানুষ পরে আসি। হুজুর পাশের একজনকে বললেন, "সেক্রেটারি সাহেবকে একটু গণ্য করে নাও, আর তার জন্য গণ্যমান্যজনোচিত পংক্তির ব্যবস্থা করাে!” অসুস্থ হুজুরের রসিকতায় সবাই হেসে কুটিকুটি হলো।

ইলম অর্জন ও সংরক্ষণ আহলে ইলমের প্রধান শােগল, মূল ব্যস্ততা। এর পিছনেরই বরাদ্ধ থাকবে তার সিংহভাগ সময়। কাজী সাহেব হুজুর সবসময় তার শিষ্য-শাগরেদদেরকে এ বিষয়ে জোর তাগিদ দিতেন। অন্য কাজে হুজুরের সময় কেটে যেত বলে যারপরনাই আফসােস করতেন। যা তিনি সুস্পষ্ট জানতেন কেবল তা বলতেন। অন্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টজনের নিকট রুজু করতেন। যে মজলিসে যে বিষয়ে বয়ান করতেন, কুরআন-সুন্নাহ স্বীকৃত বক্তব্যগুলাে তুলে ধরার চেষ্টা করতেন। সতর্কতার সাথে দুর্বল-অসমর্থিত কথা গলত-মশহুর এড়িয়ে যেতেন।

দরসে হুজুর প্রথাগত তাকরীর করতেন না। যে বিষয়গুলাে ছাত্রদের নিজেদের ও উচিত এবং বুঝা উচিত, সেগুলাে বলে ছাত্রদের আরামপ্রিয় বানানাের মােটেই পক্ষ ছিলেন না। হুজুর তার তাকরীরের মাধ্যমে মূলত সে বিষয়গুলাে ছাত্রদের মাঝে স্থানান্তরিত করার চেষ্টা করতেন, যার জন্য ব্যক্তিগত অধ্যয়ন যথেষ্ট নয়; বরং বিশেষজ্ঞ আলেমের শিষ্যত্ব গ্রহণ জরুরি। যেমন, ইসলামের রূহ, শরীয়তের মেজাজ, তাফাক্কুহ ফিদ্ দীন ইত্যাদি।। আল্লাহ পাক বলেন, “এমন কেন হয় না যে, প্রত্যেক বড় দল থেকে একটি ছােট দল বের হয়ে যাবে দীনের বুঝ-সমঝ ও তাফাক্কুহ হাসিলের জন্য।” -সূরা তাওবা, আয়াত নং: ১২২

হুজুর হাদীসের নান্দনিক তরজমা, সরল ফিকহী আলােচনা, হাদীসের রূহ ও সারনির্যাস উদ্ধার করে করে সরসভাবে উপস্থাপন করতেন এবং এর স্বাদে নিজে বিভাের হতেন, ছাত্রদের অভিভূত করতেন। ছাত্রদের নিয়ে যেতেন নবীজির যামানায়। দীন ও হামেলে দানের আজমত ও মহব্বতে ভরে দিতেন তাদের হৃদয়। খেদমতে দীনের দুরপনেয় জযবা প্রােথিত করে দিতেন তাদের অন্তরে। আধুনিক রীতি-নীতি ও পশ্চিমা দর্শনের অসারতা খুলে বর্ণনা করতেন। তদস্থলে ইসলামের যথার্থতা ও স্বাভাবিকতা দিবালােকের ন্যায় স্পষ্ট দিতেন। বাতিল ফেরকাগুলাের মধ্যে মওদূদীবাদ খণ্ডনে বিশেষ দিলচছপি রাখতেন।

শিক্ষাঙ্গন ছিল কাজী সাহেব হুজুরের মূল কর্মক্ষেত্র। তার সময়ে তিনি একজন সফল শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা-সংস্কারক ছিলেন। বাংলাভাষায় পাঠদান এবং ভাষাচর্চায় উলামায়ে কেরামের দৃষ্টি আকর্ষণের ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। প্রচলিত নেসাবে তালীমের মাঝে প্রয়ােজনীয় সংস্কার সাধনের কাজও তিনি ত্বরান্বিত করেন। দীনী শিক্ষার মূল ভিত্তি কুরআন, হাদীস ও ফিকহ। এ তিন বিষয়ে মুতাকাদ্দিমীনের শ্রেয় এবং অপরিহার্য। হুজুর মুতাকাদ্দিমীনের আরও কিতাব পাঠ্যসূচির অর্ন্তভূক্ত করা এবং  হাদিসের কিতাবসমূহ আরও বেশি সময় নিয়ে পাঠ দান করার স্বপ্ন দেখতেন। আরবি ভাষা নাহু-সরফ, উর্দু-ফার্সি ইত্যাদি উলূমে আলিয়া আধুনিকতম নেসাবে স্বল্প সময়ে পাঠ দান করার পক্ষপাতী ছিলেন। বাংলা, অংক, ইংরেজি, ভূগােল-বিজ্ঞান, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ের প্রয়োজনীয় এবং সুচিন্তিত সংযােজন-বিয়ােজন সমর্থন করতেন। এসকল বিষয় পাঠদানের জন্য দীনদার শিক্ষক এবং দীনী মেজাজ তৈরির ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র পাঠ্যপুস্তক অত্যন্ত জরুরি মনে করতেন। হুজুর বলতেন, আমাদের আকাবির সময়ের প্রয়োজনে মান্তেক ফালসাফাকে দীনী নেসাবের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অতএব দীনী শিক্ষার মেজাজ, রুচি ও বৈশিষ্ট্য বহাল রেখে দীনী দায়িত্ব পালনে সহায়ক পরিমাণ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান নেসাবের অন্তর্ভুক্ত করা আকাবিরের চিন্তা-চেতনার সাথে খুবই সঙ্গতিপূর্ণ।

হুজুর কওমী মাদরাসা সনদের সরকারী স্বীকৃতির প্রয়ােজনীয়তা অস্বীকার করতেন। তবে বিরাট সংখ্যক উলামায়ে কেরাম স্বীকৃতির পক্ষে কাজ করছেন বলে প্রকাশ্যে বিরােধিতাও করতেন না। যারা এর পক্ষে কাজ করছেন তাদের প্রতি হুজুরের পরামর্শ থাকত, কূটনৈতিকভাবে স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করুন, মাঠে-ময়দানে আন্দোলন করে নয়। আমাদের মতাে করে যদি সরকার সাগ্রহে স্বীকৃতি দেয় তাহলে নির্লিপ্তভাবে গ্রহণ করতে পারেন।

হুজুরের নিকট তা'লীম-তরবিয়ত ছিল হেফাজতে দীনের মূল মাধ্যম। এই মাধ্যম থেকে দীনের অন্যান্য বিভাগ জিন্দা হয়। এই জন্য যার দ্বারা তা'লীমী কাজের ওপর আঘাত আসে, হুজুর এমন কাজের ঘাের বিরােধী ছিলেন। ছাত্রদের সক্রিয় রাজনীতি, দীনী ইস্যুতে আন্দোলন, জিহাদী কার্যক্রম ইত্যাদি বিষয়ে পরিমিতি ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া চিন্তা করার প্রতি হুজুর অত্যন্ত জোর আরােপ করতেন।

হুজুর বলতেন, মাদরাসার তালীমী মান উন্নত করার জন্য তিনটি কাজ জরুরি: যােগ্য উস্তাদ নির্বাচন, মেধাবী ছাত্র চয়ন এবং সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতকরণ। মালিবাগ জামিয়ায় হুজুর চিন্তাধারা প্রয়ােগ করেছিলেন এবং আমরা তার সুফল পেয়েছি। এই জামিয়া আমাদের কাছে রেখে যাওয়া আমানত। আল্লাহ তা'আলা একে হেফাজত করুন। উত্তরোত্তর এর শ্রীবৃদ্ধি করুন। দেশের সকল মাদারিস, মাসাজিদ ও দীনী মারাকিকে আল্লাহ। কবুল করুন। আমীন। (সংক্ষিপ্ত)

(২০১৭ সালে জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ কর্তৃক প্রকাশিত ‘শায়খুল হাদীস আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ. স্মারক গ্রন্থ’ থেকে নেয়া।)

লেখক: শাইখুল হাদীস, জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ।

-এএ


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ