সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬ ।। ১৭ ফাল্গুন ১৪৩২ ।। ১৩ রমজান ১৪৪৭

শিরোনাম :
৬ মার্চের মধ্যে প্রবাসী হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা-টিকার তথ্য দিতে হবে খামেনিকে হত্যা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন: শেহবাজ শরিফ ইরানের নতুন নেতারা কথা বলতে চায় বলে দাবি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে চলমান হামলা সামনের দিনগুলোতে আরও তীব্র হবে: নেতানিয়াহু ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় কঠোর হমলা চলবে: ইরানের প্রেসিডেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সৌদি আরব বাড়ল ওয়াসার এটিএম বুথের পানির দাম যুদ্ধ বন্ধে অবিলম্বে কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জমিয়তের প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন খামেনি হত্যার কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিলো হিজবুল্লাহ

মাদানী মানিক-রতন: মুফতী নুসরাতুল্লাহ নূর

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

কঁচি বয়সে আমার হৃদয়ে যে কজন বুযুর্গের নাম শুনে অন্য রকম এক ভাললাগা কাজ করত তিনি হযরত কাজী সাহেব হুজুর রহ.। আমি তখনো তাঁর সাক্ষাত পাইনি। কিন্তু আমাদের ঘরে কাজী সাহেব হুজুরের আলোচনা হত। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গে কাজী সাহেব হুজুরের নাম উঠে আসত। আসআদ মাদানী রহ. এর বাংলাদেশ সফরের বিভিন্ন কারগুজারীতে, দেওবন্দি মাসলাক প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন জায়গায় তাঁর কর্মোদ্দিপনা ও জ্ঞানগর্ভ লা-জবাব কর্মকাণ্ড, আপন উস্তাদ ও শায়খ মাদানী রহ. এর চিন্তা চেতনায় উদ্দিপ্ত হয়ে দীনদার মানুষের স্বার্থ রক্ষায় ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, ইলমের খেদমতে অনিঃশেষ অবদান রাখা ইত্যকার আলোচনায় কাজী সাহেব হুজুরের নাম খুবই ভক্তির সাথে উচ্চারিত হত।

এতে আমাদের হৃদয়ে এক আদর্শবান আলেম হিসাবে অঙ্কিত হয়ে যায় কাজী সাহেব হুজুরের নাম। এরপর যখন আরো কিছু বুঝতে শিখেছি তখন আলেমদের কাছে প্রেরীত একটি খোলা চিঠির নীচে পাশাপাশি আব্বাজির নামের পাশে কাজী সাহেব হুজুরের নাম দেখেই তাদের কর্মকাণ্ডের সাথে সর্বপ্রথম পরিচিতি হই। বলা বাহুল্য, সে চিঠিটি ছিল চারদলীয় জোট (কার্যত তিন দলীয়) সরকারের শরীক মওদূদীবাদী জামাতে ইসলামের ইসলামী বিরোধী কার্যকলাপে সত্যবাদী আলেম উলামার অপরিবর্তনীয় সিদ্বান্তের ইয়াদ-দেহানী।

কাজী সাহেব হুজুর রহ. আমার আব্বাজি আল্লামা মুফতী নূরুল্লাহ সাহেব রহ. এর দেওবন্দের সাথী এক মাদানী সহযোদ্ধা। শুধু তাই নয় বরং যদি প্রশ্ন করা হয় কাজী সাহেব হুজুর র. এর সবচেয়ে ঘনিষ্ট সাথী সতীর্থের নাম বলুন। তবে প্রথম দু-একজনের মাঝেই মুফতিয়ে আযম আল্লামা মুফতী নূরুল্লাহ রহ. এর নাম নিতে হয়। দেশে একজনের বাড়ী যশোর আরেকজনের নরসিংদী হওয়ায় স্বাভাবিক ভাবে তাঁদের পরিচিত হওয়ার সুযোগ ছিল না। দেওবন্দেই তাদের প্রথম পরিচয় হয়। সেই পরিচয় থেকেই একই সাথে পথ চলা, ঘনিষ্ঠতা। আপন উস্তাদ শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা সায়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. থেকে প্রাপ্ত ইসলাম ও মুসলমানদের খেদমতে যুথবদ্ধ যাত্রা।

তাঁদের ভিতরে ছিল দীনি মহববত ও ভালবাসা। দেওবন্দ থেকে দেশে ফিরেও সেই ভালবাসায় কখনো চির ধরেনি। দুজনের পথে কখনো ভিন্নতা তৈরি হয়নি। একজন সাথীকে কিভাবে সম্মান দিয়ে ভালবাসতে হয়, একই চিন্তা চেতনার লালন ও প্রসারে কিভাবে সম্মিলিত আত্ননিয়োগ করে সর্বস্ব উজার করে দিতে হয় এর উদাহরণ ছিলেন তাঁরা। পরিস্থিতি প্রতিকুলতা সত্য প্রকাশ ও চর্চায় তাদেরকে নিবৃত্ত করতে পারত না। বরং প্রবল বেগে ধেয়ে আসা ঢেউয়ের সামনে সুদৃঢ় পাহারের মতই অটল অথচ বিনম্র হয়ে বহু মানুষের আশ্রয়ে পরিনত হতেন তাঁরা। আসলে এর পিছনে বড় কারিগর হলেন শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা সায়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.। তিনিই তাঁদেরকে শিক্ষা দিয়েছিলেন ইলমে ওহী ও নববী চিন্তা চেতনা ও কর্মস্পৃহা। তাঁদের বক্ষে প্রোজ্জলিত করেছিলেন ঐশি-দীক্ষার প্রাণ-প্রদীপ। আর তাঁদেরকে গড়ে দিয়েছিলেন বাংলার মাদানী মানিক রতন হিসেবে।

কাজী সাহেব হুজুর র. দারুল উলূম দেওবন্দে হযরত মাদানী রহ. এর সর্বশেষ ‘দাওরা শাগরেদ ব্যাচের’ ছাত্র ছিলেন। এর পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে দু-তিন মাস দারস দেয়ার পরই হযরত মাদানী রহ. ৫ ডিসেম্বর ১৯৫৭ সালে পরপারে পাড়ি জমান। অপরদিকে আমার আব্বাজি দাওরায়ে হাদিস থেকে ফারেগ হওয়ার পরও হযরত মাদানী রহ. তিন বৎসর কয়েক মাস জীবিত ছিলেন। প্রশ্ন হল তাহলে আব্বাজি কিভাবে কাজী সাহেব হুজুরের সাথী হন? আমাদের বড় ভাইছাব রহ. এর জবাব দিয়ে বলেছিলেন, আব্বাজি রহ. দাওরায়ে হাদিস ফারেগ হওয়ার পর দেওবন্দে মাদানী মসজিদে ইমামতি এবং দারুল উলূম দেওবন্দে অন্যান্য বিষয় অধ্যায়ন করলেও হযরত মাদানী রহ. এর দারসের পাবন্দি করতেন। সুললিত কন্ঠের অধিকারী হিসাবে দারসে ইবারত পাঠে প্রায়ই সুযোগ নিতেন। ফলে অন্যান্য ফারেগীনরা যেখানে সাধারণত এক ব্যাচের সাথী সেখানে আব্বাজী ছিলেন কয়েক ব্যাচের সাথী সতীর্থ। তাই আব্বাজি রহ. এর দেওবন্দের সাথীদের ফেহরেস্ত অনেক দীর্ঘ হয়ে পড়েছিল। সেইভাবেই তিনি এবং হযরত কাজী সাহেব হুজুর রহ.ও পরস্পরে সতীর্থ ছাত্রভাই ছিলেন।

কাজি সাহেব হুজুর রহ. কে তাঁর সাথীবর্গ বড়ই সম্মান করতেন। প্রায় সময় সুক্ষ্ম ও তাত্ত্বিক বিভিন্ন বিষয়ের অবতারনা করতেন বলে হযরত মাদানী রহ. তাঁকে চৌদ্দশতকের মুজতাহিদ বলতেন। এতে তিনি উস্তাদ ও ছাত্রদের আকর্ষণ এর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন। তাছাড়া তাঁদের মধ্যকার ব্যাতিক্রম ভালবাসা তাঁদের একে অপরকে আরো কাছাকাছি করে দিয়েছিল। একটি ঘটনা সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য।

দেওবন্দে একদিন কাজী সাহেব হুজুর এসে আব্বাজির কাছে বললেন, ভাই! দারুল উলূম থেকে যে খাবার দেয় তা নিয়ে আমি আপনার সাথে খানা খাব। আব্বাজি বললেন না আপনি আপনার খানা খেয়ে নিবেন। আমি কখন খাই তার কোন ঠিক-ঠিকানা নাই। কাজি সাহেব হুজুর বলেন আপনি যখন খান তখনই খাব আমার কোন আপত্তি নাই। এভাবে একদিকে কাজি সাহেব হুজুরের পীড়াপীড়ি অপরদিকে আব্বাজী একসাথে খানা খেতে অসম্মতি চলছিল। কাহিনী হল ঐ সময় দারুল উলূমের খানা জারী রাখার সুযোগ থাকলেও সরাসরি ছাত্র না বলে আব্বাজী মাদরাসার খাবার গ্রহণ করতেন না। মাদানী মসজিদে ইমামতির সুবাদে মাদানী মেহমানখানাতেও খাবারের অনুমতি ছিল। তবে আব্বাজী র. এর মেহমানদের খাবার গ্রহণ করাও পছন্দ হয়নি। পরহেজগারিতা ও আত্মমর্যাদাবোধের কারণে সেভাবে খাবার গ্রহণ করতে পারেননি। নিজের অল্প পয়সার খুব সাদামাটা খাবারে তিনি ইমামতি করতে লাগলেন।

যাই হোক আব্বাজী রহ. মেহনত মোজাহাদার কথা তাসাওউফের নিয়ম অনুযায়ী গোপন রাখতেন। কেউ কিছু জানত না। কিন্তু  কাজি সাহেব হুজুর রহ. আব্বাজী র. এর অতিসাধারণ জীবন-যাপনের বিষয়টি ঠিকই আঁচ করে ফেলেছিলেন। সাথে সাথে তিনি এও জানতেন যে তাঁর এ সাথী উঁচু বংশীয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। শরাফত ও পরহেজগারীর কারণে যেন তেন খাবার বা যে কারো খাবার তিনি গ্রহণ করবেন না। তাই কৌশলে একসাথে খানার প্রোগ্রাম বানাতে বলছিলেন। আব্বাজী যতই বলেন ‘আপনি অপেক্ষা না করে খানা খেয়ে ফেলবেন, হযরত কাজী সাহেব হুজুর র. এর ততই একসাথে খাওয়ার আগ্রহ ও পীড়াপীড়ি বাড়িয়ে দিলেন। আব্বাজী বলে¬না, ভাই আমি তো রোযা রাখি, আপনার সাথে খাওয়া আমার সম্ভব হবে না। হযরত কাজী সাহেব হুজুরও নাছোড়বান্দা। বলে¬না, আমিও রোযা রাখব, তবে তো সমস্যা হবে না। এ অবস্থায় আব্বাজী বিপাকে পরে গেলেন। নিজের আধ্যাতিক সাধনা ও মেহনত মোজাহাদা প্রকাশিত হয়ে যাবার আশঙ্কায় কিছুটা পেরেশানও হলেন।

এসময়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে নুসরত ও মদদের ফায়সালা হয়ে যায়। করাচীর বিখ্যাত তাজ কোম্পানী লাইব্রেরী থেকে সিহাহ সিত্তার প্রসিদ্ধ ও শ্রেষ্ঠ কিতাব মুসলিম শরিফ ছাপাবার উদ্যোগ নেওয়া হয়। মুসলিম শরীফের তাসহিহ তথা মুদ্রণ সম্পাদনা ও সংস্কারের জন্য দারুল উলূম দেওবন্দের ইমামুল মানকুলাত ওয়াল মা’কুলাত আল্লামা ইব্রাহীম বিলয়াভী রহ. এর নিকট পাঠানো হয়। আল্লামা ইব্রাহীম বিলয়াভী রহ. এই অসামান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে তাঁর শাগরেদ হযরত মুফতি সাহেব হুজুর রহ. কে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এ কাজটিতে পরকালীন লাভের কথা তো স্পষ্ট। এতে আর্থিকভাবেও সম্মানিত হয়েছিলেন আব্বাজী র.। প্রতি পাতা অথবা প্রতিপৃষ্ঠা তাসহিহের বিনিময়ে এক টাকা বরাদ্দ থাকত। তাই হযরত কাজী সাহেব হুজুরের কথা রেখে একসাথে খাবার খেতে আর কোন সমস্যা বা সংকোচ রইল না। এতে উভয়েই খুব খুশি হয়েছিলেন।

দেশে এসেও সেই ধারাবাহিকতা চালু ছিল বৎসর দুই বৎসরের মত। তখন আব্বাজী রহ. এবং তাঁর আরো চার পাঁচ সতীর্থ, মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ., মাওলানা ফয়জুদ্দীন রহ., মাওলানা এহসানুল হক সন্ধিপী রহ. প্রমুখ জামেয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জের মুহাদ্দিস ও মুদাররিস হিসাবে খেদমতে ছিলেন। প্রায় প্রতিদিন একসাথে সকালে নাস্তা খেতেন। নাস্তার বিল দেয়ার সময় এক অভিনব পন্থা অবলম্বন করতেন। যেদিন যে দোস্ত থেকে বিল নেয়ার ইচ্ছা হত তো অন্য সাথীরা তার বিভিন্ন আর্থিক সঙ্গতি ও সম্ভ্রান্ততার বর্ণনা দিয়ে প্রশংসা শুরু করতেন। তাঁর গুণগান করতেন। কোন দিন হয়ত বলতেন, ‘ভাই! আজকে কেউ বিল দিতে যাবেন না। কারণ কাজী সাহেব আগে থেকেই বিল দেয়ার ইচ্ছা করেছেন। সুুতরাং আপনারা বিল দিলে উনি কষ্ট পাবেন’। এ কথায় সবাই একজোট হয়ে যেতেন। আর যার প্রশংসা করা হচ্ছে তিনি প্রশংসার ধরণ দেখেই বুঝে নিতেন সেদিন তার আপ্যায়নের পালা। তাই খানিক উচ্চবাচ্য করলেও বিল অবশেষে তাকেই দিতে হত। দেখা যেত এভাবে একদিন আব্বাজী বিল দিতেন তো আরেকদিন কাজী সাহেব হুজুর রহ.। পরেরদিন সন্দ্বিপী সাহেব র. দিলেন তো অপর একদিন ফয়জুদ্দীন হুজুর র.কে অবশ্যই দিতে হত।

আমাদের পরিবার কাজী সাহেব হুজুরের সতীর্থ এক সহযোদ্ধার পরিবার। তাই তাঁর অন্যান্য পরিচয় যেমন যামানার বে-মিসাল শাইখুল হাদিস, আলেম মুক্তিযোদ্ধা, ভাষা সাহিত্যের পুরোধা, একনিষ্ঠ আল্লাহওয়ালা বুযুর্গ উলামায়ে দেওবন্দের সুযোগ্য উত্তরসূরী ইত্যাদির পাশাপাশি তিনি আমার আব্বার এক অকৃত্তিম সাথীর পরিচয়টি অনেক প্রাসঙ্গিক ছিল। সতীর্থ হিসাবে কাজি সাহেব হুজুর র. এর একটা মূল্যায়ণও আমরা ঘরে পেয়েছি। কাজি সাহেব হুজুর র. বা তাঁর সাথীবৃন্দ যামানার শ্রেষ্ঠ বুযুর্গ ছিলেন সন্দেহ নাই। তবে তাঁদের জীবনেও আনন্দ বেদনা হাসি কান্না ছিল অন্যান্যদের মত। বুযুর্গীর কারণে শুধু গুরুগম্ভীরতা নিয়ে তারা পরে থাকতেন না। বরং এক্ষেত্রেও তাঁরা ছিলেন হযরত মাদানী র. এর মত হাসিখুশি প্রাণবন্ত ও রসিক। জামেয়া ইমদাদিয়াতে থাকাকালে একবার পরীক্ষার কাজে অনেকের সাথে তারাও ছিলেন ব্যস্ত। পরীক্ষার খাতা দেখা বা প্রশ্ন তৈরি করা জাতিয় কাজ চলছিল। হঠাৎ কাগজপত্রের ভেতর থেকে বের হয়ে একটি ইঁদুর কাজি সাহেব হুজরের র. এর পায়ের দিক দিয়ে পাজামায় ঢুকে পরে। কি অবস্থা হতে পারে সকলেই বুঝতে পারছেন! কাজী সাহেব হুজুর র. তখন হালকা পাতলা গড়নের জোয়ান আলেম। ইঁদুরের এই কান্ডে বড় বড় লাফ দিতে থাকেন। সে এক কঠিন অবস্থা! এক সময় ইঁদুর বের হল কিন্তু জন্ম দিয়ে গেল হাস্যরসের মধুর স্মৃতি! পরবর্তী জীবনে যা প্রায়ই রসিকতার আমেজ তৈরি করত।

কাজী সাহেব হুজুরের আব্বা মাওলানা কাজী ছাখাওয়াত হুসাইন সাহেব রহ.ও ছিলেন বড় বুযুর্গ। কাজী সাহেব হুজুর রহ. তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য আমার আব্বাজীকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কাজী সাহেব হুজুরের আব্বা বললেন, মাওলানা আপনি কোরআন পড়ার নিয়ম জানেন? আব্বাজী সবিনয়ে আরজ করেছিলেন, আপনি বলে দিন কিভাবে পড়তে হয়? কাজী সাহেব হুজুরের আব্বা বললেন, ‘শুদ্ধভাবে কিরাত শেখার পর আল্লাহ তায়ালাকে শুনাবার ইচ্ছায় কোরআন পড়তে হয়। এভাবে পড়লে আল্লাহ খুশি হন’। জীবনভর আব্বাজি এই নসীহত ভূলেননি। প্রায়ই ওয়াজ মাহফিলে এই নসীহতের কথা বলতেন।

ইসলাম মুসলমান ও দেশের জন্য সংগ্রাম লড়াই চালানো ছিল কাজী সাহেব হুজুর রহ. এবং তাঁর সাথীবর্গের নেশা ও পেশা। তাই পাকিস্তান আমলে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের জন্য তাঁরা কতই না প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। হাফেজে হাদিস আব্দুল্লাহ দরখাস্তি রহ. প্রাদিশিক মূখ্যমন্ত্রী মুফতি মাহমূদ রহ. জমিয়ত নেতা মাওলানা গোলাম গউস হাজারোভী রহ. প্রমূখের নেতৃত্বে নির্বাচনী প্রচারনায় অংশ নিয়েছিলেন। রাত দিন খেয়ে না খেয়ে সেই অসামান্য খেদমত তাদেরকে আঞ্জাম দিতে হয়েছে। এই জমিয়ত নেতাদের অধীনেই ৭০ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নেতৃত্বাধীন দল সংখ্যাগড়িষ্ঠতা লাভ করার পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না করে হানাদার বাহিনী লেলিয়ে দেওয়ায় পাকিস্তানের মাটিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়েছিল।

স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়ে গেলে কাজী সাহেব হুজুর রহ. তাঁর সাথীবর্গ দেশের খেদমতে মনোনিবেশ করেন। কাজী সাহেব হুজুর রহ. এবং আমার আব্বাজি ছিলেন স্বাধীনতাকামী আলেমে দীন। পাকিস্তানী স্বৈরশাষকদের জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে আপোষহীন সৈনিক। এদেশে যে কজন আলেম স্বাধীনতা সংগামে বিশেষ অবদানের জন্য আজীবন সম্মানের সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তাদের মধ্যে এই দুজন অগ্রগন্য। আপন আপন অবস্থান থেকে দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছেন। একদিকে অস্ত্রহাতে যামানার শাইখুল হাদিস আল্লামা কাজি মুতাসিম বিল্লাহ রহ. হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন তো অপরদিকে কালের মুফতিয়ে আযম আল্লামা মুফতি নূরুল্লাহ রহ. পাক বাহিনীর যুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছেন। ফতোয়া দিয়েছেন। দেশ ও মানুষের সেবায় যথাসম্ভব সর্বপ্রকার ভূমিকা পালন করেছেন। ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে বহু বনী আদমকে বাঁচিয়েছেন। দেশ স্বাধীন হবার পর তাই তাদের খুশির সীমা ছিল না। কাজী সাহেব হুজুর যশোরের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আনন্দ মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবে আবার খুশিতে আত্নহারা হয়ে খেই হাড়িয়ে বসেননি। বরং স্বাধীনতার পর যখন কিছু লোক ইসলামকে স্বাধীনতার প্রতিপক্ষ হিসাবে দাড় করাতে চেয়েছে, মসজিদ মাদাসায় স্থরিরতা এসেছে তখন আবার তাদের ষড়যন্ত্র নস্যাতেও অপরিসীম অবদান রাখতে হয়েছে।

দেখা গেছে- একজন সর্বপ্রথম উলামা সমাবেশ আয়োজন করেছেন তো অপরজন সেখানে জাতিকে জাগ্রত করায় ঘন্টার পর ঘন্টা বয়ান করেছেন। স্বাধীনতার প্রকৃত মর্ম প্রতিষ্ঠা করেছেন। জীবনের পড়ন্ত বেলায় দীর্ঘ সময় দারসে ক্লান্তি এসে গেলে একবার কাজী সাহেব হুজুর সেই কথা স্মরণ করেছিলেন। বলেছিলেন স্বাধীনতার পর মুফতি সাহেবের উদ্যোগে আয়োজিত সম্মেলনে আমি দুঘন্টা বকৃতা করেছিলাম।

এক্ষেত্রেও এক আশ্চর্য অনুসরণ পাওয়া উস্তাদ শাগরেদদের মাঝে। ইংরেজ বিতারণ করে ভারতবর্ষ স্বাধীন করার পরও যেভাবে হযরত মাদানী দুনিয়াবী কোন সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করেননি বরং ভারতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা পদ্ধভোষণও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বিনয়ের সাথে। তাঁর শাগরেদ এই দুই মনীষীকেও তাদের জীবদ্ধশায় সামান্য একটি পদক দিয়েও সম্মাননা জানানো সম্ভব হয়নি। কারণ তারা দুনিয়ার স্বার্থে এই অবদান রাখেননি। দুনিয়ার মালিকের সন্তুষ্টির জন্য এই খেদমত আঞ্জাম দিয়ে গেছেন। অবশ্য তাদের তিরোধানের পর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পদক ও এওয়ার্ড দিয়ে সম্মাননা জানিয়েছে। তাঁদের জীবনীর উপর যে কাজ হওয়া উচিৎ ছিল তার কিয়দাংশও এখনো হয়নি। আওয়ার ইসলাম কিছুটা হলেও ভুমিকা নেয়ায় অবশ্যই প্রশংসার্হ।

স্বাধীনতার পর সরাসরি রাজনীতিতে কাজি সাহেব হুজুর রহ. সম্পৃক্ততা রাখেননি। তাঁর সাথী মুফতিয়ে আযম আল্লামা মুফতি নূরুল্লাহ রহ.ও জড়াননি। একপর্যায়ে আমাদের দেশে গণসম্পৃক্ততাবিহীন মোল্লা রাজনীতির সূচনা হল। তখন দেওবন্দি ঘরানার কেউ কেউ মাদরাসার ছাত্র কার্যক্রমভিত্তিক রাজনীতির সস্তা আবেগ তৈরি করেছিলেন। হযরত কাজি সাহেব হুজুর রহ. এবং সাথিবৃন্দ এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ছিলেন। তাঁরা তাদের উস্তাদ হযরত মাদানী রহ. এর দীক্ষায় জনতার কন্ঠ জনগনের জন্যে ব্যবহারের বা জনসম্পৃক্তার রাজনীতি কামনা করতেন। জনমতহীন ও সম্পৃক্ততা ব্যতীত এমন কার্যকলাপ যে এক সময় ভেস্তে যাবে এবং জনবিরোধী দক্ষিণ মেরুতে অবস্থান নিতে বাধ্য করবে আগেই তাঁরা তা অনুধাবন করেছিলেন। শুধু তাই নয় তখন কওমের খেদমতে নিয়োজিত মাদরাসা কওমের কিছু লোকের ত্রিশুলে পরিনত হবে এবং ষড়যন্ত্রেও শিকার হবে এই আশংকা তারা করতেন।

অপরদিকে রাজনৈতিক চোরাবালিতে মাদরাসা শিক্ষা আটকে গিয়ে ইলমী ময়দানে শুরু হবে যোগ্যতা ও মেধাশূন্যতার প্রতিযোগিতা। এটা রুখতেই কাজী সাহেব হুজুর প্রথমে যাত্রাবাড়ি জামেয়া মাদানিয়া এবং পরে জামেয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ আদর্শ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে তিনি এক অনন্য কীর্তিময় মনীষী হিসাবে স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হন। এখানে তিনি গড়েছেন মেধা ও যোগ্যতার আদর্শ জামাত। যাদের কেউ বেফাকে গিয়েছেন প্রতিষ্ঠান হিসাবে অসামান্য রুপে দাড় করিয়েছেন। কেউ কেউ বিভিন্ন জায়গায় আদর্শিক মাদ্রাসার গোরাপত্তন করেছেন। কেউ আবার বাতেল মোকাবেলায় নেতৃত্বেও আসনে সমাসিন হয়েছেন। আর লেখালেখির ময়দানে রচিত হয়েছে এক সুদীর্ঘ সৌধ! এখানেই কাজী সাহেব হুজুর সফলতা।

ফিরে আসি আগের কথায়। ২০০০ সাল পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর বিপ্লবের জোয়ারে যখন দেওবন্দী চিন্তাধারা হুমকির সম্মুখিন হয়ে পরেছিল তখন সচেতন সজাগ ছিলেন কাজী সাহেব হুজুর রহ. তাঁর সাথী মুফতী নূরুল্লাহ রহ. শায়খ আব্দুল হক শায়খে গাজিনগরী প্রমূখ। তাঁদের যুগে তাঁরা ছিলেন বাতিল বিরোধী সিপাহসালার। যারা এই ময়দানে কাজ করতে তাদের প্রতিনিধি তৈরি করে গিয়েছেন। আমরা দেখি বাতেলের মোকাবেলায় এখনো যারা নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন তারা তাদেরই উত্তরসূরী। বর্তমানে যারা শিক্ষা-দীক্ষায় অবদান রেখে চলেছেন তারা তাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম। আল্লাহ তায়ালা হক ও হক্কানিয়তের এই ধারাবাহিকতাকে কিয়ামত পর্যন্ত কবুল করুন।

মানুষ তৈরির এই কারিগরের কর্মকাণ্ডে সফলতার পিছনে বড় কারণ ছিল তাঁর ইখলাস। একটি মাত্র ঘটনা কেউ হয়তো জানেও না। আমি সেটাতেই তাঁর পূর্ণ পরিচয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মালিবাগ জামেয়ায় আমাদের সতীর্থ ৫ মে শহীদ মাওলানা আনওয়ার রহ. শাহ -এর ছোটভাইকে ভর্তি করাতে তাঁর আব্বা জনাব আবুল হাসানাত সাহেব নিয়ে এসেছিলেন। (আমি নাম নিয়েছি যেহেতু তাঁকে হালের দীনদার শ্রেণী কমবেশী অনেকেই চিনেন জানেন) জ্ঞানপিপাসু মহলে মালিবাগ জামিয়ার সে সময় যে কী আবেদন ছিল বলে বুঝানো যাবে না। কোটা পূরণ না কি কারণে মেধাবী সেই ভাইটি ভর্তির সুযোগ পাচ্ছিলেন না। বাবা হিসাবে জনাব আবুল হাসানাত সাহেব আন্তরিক সম্পর্কের সুবাদে হযরত কাজী সাহেব হুজুরের কাছে ভর্তির আবেদন করেছিলেন। কাজী সাহেব হুজুর বলেছিলেন, এই জায়গায় আমি অপারগ! এক্ষেত্রে আমি আমার মুরশিদ ও শাইখ হযরত মাদানী র. এর কথাও রাখতে পারব না। উসূল ও নিয়মের ভিত্তিতে যে সুযোগ পাবে সেই ভর্তি হবে। সুবহানাল্লাহ! নীতিতে কত দৃঢ়তা ও আদর্শে কত অবিচলতা! অথচ এমন কঠিন অবস্থানেও তাঁর মাঝে ছিল এক অনন্য বিনয়।

আজকে আমাদের সবদিকে যখন অব্যস্থাপনা অদূরদর্শিতা অসামঞ্জস্যতা কোন কোন ক্ষেত্রে অকালপক্কতার পরিবেশে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ যাত্রা দেখি তখন যন্ত্রনাময় গোমরে উঠা কান্নায় শুনতে পাই আর্তচিৎকার! কাজী! তুমি চলে গেলে চিরতরে! তোমার প্রয়োজন তো যায়নি ফুরিয়ে! তুমার দেহের আগমন না হয় নাই পেলাম। রুহু তোমার দাও জ্বেলে। যুগ থেকে যুগান্তরে!

লেখক: মুহাদ্দিস, জামেয়া আরাবিয়া খাদিমুল ইসলাম মিরপুর ১৩, খতিব, কৃষি ল্যাবরেটরী জামে মসজিদ মুনিপুরীপাড়া ফার্মগেট।

-এএ


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ