জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও সহজ করতে নিবন্ধন ফরমে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফরমে ‘ডাক নাম’ এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার কোনো সম্মানিত ব্যক্তির সুপারিশের জন্য নতুন ঘর যুক্ত করা হবে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, সংসদ নির্বাচনের আগেই ডাক নাম যুক্তসহ নিবন্ধন ফরম সংশোধনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু সংসদ নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় বিষয়টি স্থগিত রাখা হয়। এখন আবার সেই কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এর ফলে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন প্রক্রিয়া যেমন স্বচ্ছ হবে, তেমনি ডাক নাম যুক্ত থাকায় নাম সংশোধনের হারও কমে আসবে।
এ বিষয়ে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর বলেন, নাম সংশোধনসংক্রান্ত জটিলতা কমানোর জন্যই এনআইডিতে ডাক নাম যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে কোনো নাগরিক আর বলতে পারবেন না যে, তিনি ডাক নামে ভোটার হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, নিবন্ধন ফরম-২-এ নতুন একটি ঘর যুক্ত করা হচ্ছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট এলাকার সম্মানিত ব্যক্তির সুপারিশ থাকবে যে, তিনি আবেদনকারীকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন ও জানেন। এর ফলে রোহিঙ্গা কিংবা বিদেশিদের ভোটার হওয়া কঠিন হবে।
তিনি আরও জানান, ১৬ থেকে ১৭ বছর বয়সী নাগরিকদের উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র (স্মার্ট কার্ড) দেওয়া হতো না। তবে এখন থেকে চাহিদার ভিত্তিতে এই বয়সীদের স্মার্ট কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এনআইডির ডিজি বলেন, ‘১৬ ও ১৭ বছর বয়সীদের নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগে ভোটার না হওয়া পর্যন্ত কেউ স্মার্ট কার্ড পেত না। তবে অনেক সময় বিদেশে যেতে হলে স্মার্ট কার্ড প্রয়োজন হয়। তাই এখন থেকে ১৬ থেকে ১৭ বছর বয়সী নাগরিকদের চাহিদার ভিত্তিতে স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে।’
এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর বলেন, নির্বাচন শেষ হলেও কিছু কারণে আমরা সম্পূর্ণভাবে এনআইডি সংশোধনের কার্যক্রম শুরু করতে পারিনি। তবে মাঠ ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইতোমধ্যে বৈঠক করা হয়েছে, যাতে পেন্ডিং আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়। চলতি সপ্তাহ থেকেই পুরোদমে সংশোধন কার্যক্রম শুরু হবে।
এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ সংশোধন আবেদনের মধ্যে ১১ লাখের বেশি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
এনআইডি সেবা সহজ ও তথ্য ফাঁস রোধে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে ডিজি এনআইডি বলেন, এনআইডির সব তথ্য দেওয়ার পরিবর্তে সেবা গ্রহণকারী ১৮৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ১৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ‘ম্যাচড’ ও ‘নট ম্যাচড’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তিপত্র নবায়ন করা হয়েছে, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়।
এই কর্মকর্তা বলেন, কোনো সেবাগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তথ্য ফাঁস হলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের এনআইডি যাচাই লিংক স্থগিত করা হয়। পাশাপাশি লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয় এবং এনআইডি উইং তদন্ত করে। তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিশেষ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অঙ্গীকারনামাও নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, এনআইডি সেবা সহজ করার জন্য দ্বৈত এন্ট্রি ও ম্যাচ ফাউন্ড সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের পেন্ডিং সমস্যার সমাধানে সুস্পষ্ট নির্দেশনাসহ পরিপত্র জারি করা হয়েছে। ধর্ম পরিবর্তনের কারণে এনআইডিতে নিজের নাম বা পিতা-মাতার নাম সংশোধনের জটিলতাও সহজ করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তে মহাপরিচালক, এনআইডি উইংয়ের অনুমোদনে মৃত ভোটারের এনআইডি সংশোধন এবং পেনশন ফিক্সেশনসহ বিশেষ প্রয়োজনে নির্ধারিত সময়ের জন্য মৃত ভোটারের এনআইডি ডাটাবেজে চালু রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এ এস এম হুমায়ুন কবীর বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন সংক্রান্ত বিদ্যমান স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) সময়োপযোগী করে ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে এনআইডি সংশোধন সেবা আরও সহজ হবে।
ডিজি এনআইডি আরও বলেন, এনআইডি সেবা সহজীকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি ও প্রবিধিমালায় থাকা অসংগতিগুলো দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র সেবাকে জনবান্ধব, সময়োপযোগী ও সহজ করতে সুপারিশমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। ঝুলে থাকা আবেদন নিষ্পত্তির জন্য কেন্দ্রীয় কর্মকর্তাদের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এনআইডি উইংয়ে ডি-নথি কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি অনলাইনে যাচাইকৃত এনআইডি তথ্যের ভিত্তিতে আবেদনকারীদের পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই পাসপোর্ট প্রদানের ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতরকে ২৪ ঘণ্টা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
আইএইচ/