|| যাকারিয়া মাহমুদ ||
দেশজুড়ে বিস্তৃত হাজার হাজার কওমি মাদরাসার শিক্ষা কার্যক্রমের মান বজায় রাখা, পাঠদান পদ্ধতির উন্নয়ন এবং কুরআন-সুন্নাহর আদর্শে যোগ্য আলেম গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিয়মিত পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করছে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ। তবে বিশাল এই কর্মযজ্ঞে বোর্ডটির নির্ভরতা মাত্র ৪০ জন পরিদর্শকের ওপর। সীমিত এই জনবল নিয়েই দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মাদরাসাগুলোর তদারকি করছে বেফাক।
বোর্ডের অর্থ সম্পাদক এবং রাজধানীর বাইতুন নূর মাদরাসার মুহতামিম ও শাইখুল হাদিস মাওলানা মনিরুজ্জান আওয়ার ইসলামকে জানান, যোগ্য, বিচক্ষণ ও সচেতন আলেমরাই পরিদর্শক হতে পারেন। একজন পরিদর্শক নিয়োগের বেলায় বেফাক সর্বোচ্চ সতর্কনীতি অবলম্বন করে থাকে।
আওয়ার ইসলামের সঙ্গে ফোনালাপে বেফাকের অর্থ সম্পাদক বলেন, ‘একজন পরিদর্শকদের মূল কাজ হলো, বেফাকের তালিকাভুক্ত বিভিন্ন মাদরাসায় গিয়ে, সেখানকার তালিমি তথা শিক্ষাগত অবস্থা যাচাই করা। এছাড়া, মাদরাসা শিক্ষাকাঠামো পরিচালনা-পরিবেশ ও নিয়মনীতির পরিমার্জন-পরিশোধনের প্রয়োজন হলেও তারা এ ব্যাপারে মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দিয়ে থাকেন।’
মাওলানা মনিরুজ্জামান বলেন, ‘পরিদর্শকরা কোনো মাদরাসায় যাওয়ার আগে কবে-কোন তারিখে যাবেন—সে ব্যাপারে জানিয়ে দেন ফোন করে। মাদরাসায় গিয়ে তারা প্রথমেই যে কাজ করেন, তারা মাদরাসার জামাতে জামাতে ঘোরে, ছাত্রদের সঙ্গে বসে, কিতাব ও ফন (শাস্ত্র)-ভিত্তিক আলোচনা করে এবং পাঠ্যসূচির ভেতর থেকে প্রশ্ন করে মাদরাসার শিক্ষামান যাচাই করেন। এছাড়া মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনা দেন। মাদরাসার হাল-অবস্থা জানার চেষ্টা করেন। তাদের পরিচালনা কেমন, বেফাকের নিয়মমাফিক চলছে কি না, বোর্ড-প্রণিত বইগুলো পড়ানো হচ্ছে কি না ইত্যাদি জানার চেষ্টা করেন। এসব যাচাইয়ের পর পরিদর্শকরা এর ওপর একটি রিপোর্ট তৈরি করে বেফাকে জমা দেন।’
বেফাকের অর্থসম্পাদক আরও বলেন, ‘পরিদর্শক ছাড়াও আরেকটা টিম আছে বেফাক বোর্ডের, যাদের ‘দাঈ’ বলা হয়। এই টিমের কাজ যদিও পরিদর্শকদের কাছাকাছি, তবে কাজের ধরনে কিছুটা ভিন্নতা আছে। দাঈদের মূল কাজ হলো, তারা সারাদেশে সফর করে যেসব মাদরাসা বেফাকের বাইরে আছে বা নতুন হয়েছে—সে মাদরাসাগুলোকে বেফাকের তালিকাভুক্ত করা। তাছাড়া এমন মাদরাসাও আছে অনেক, যারা একসময় বেফাকে ছিল, কিন্তু এখন নানা কারণে পিছিয়ে গেছে, হতে পারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে শিক্ষার্থী নেই বা শিক্ষার্থী থাকলেও কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় বসতে চায় না—যেকোনো কারণেই হোক—তাদেরকেও বেফাকে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা এই দাঈ টিমের কাজ। অবশ্য পরিদর্শকরাও এ কাজ করে থাকেন। তবে এটা মূলত, দাঈদের কাজ।’
বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের অধীনে প্রায় ৪০ হাজার মাদরাসা থাকলেও পরিদর্শক মাত্র ৪০ জন। এই সংকটের কারণ সম্পর্কে আওয়ার ইসলামকে মাওলানা মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সমস্যা হলো বেফাকের যে পরিমাণ পরিদর্শকের চাহিদা সে পরিমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ এই নয় যে, দেশে যোগ্য আলেমের অভাব; বরং যোগ্য অনেকেই পরিদর্শক হতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। তারা মনে করেন, পরিদর্শনের কাজ করলে দরস-তাদরিসে ঘাটতি হবে। আসলে তাদের এই ধারণাটা পুরোপুরি সত্য না। আমাদের অনেক পরিদর্শক এমনও আছেন, যারা পরিদর্শনের পাশাপাশি দরস-তাদরিসেও ভালো করছেন। তাছাড়া কর্মের তাগিদে ব্যাপক পড়াশোনা ও মুতালাআর সুযোগ পান পরিদর্শকরা।’
তিনি যুক্ত করেন, ‘বেফাক আরও পরিদর্শক নিয়োগ দেবে, সে প্রক্রিয়া চলমান।’
সূত্রে জানা যায়, মাদরাসা পরিদর্শনের জন্য বেফাক বোর্ডে ৪০ জন পুরুষ পরিদর্শক থাকলেও নারী পরিদর্শক নেই একজনও। অথচ পরিসংখ্যান বলছে, বেফাকের তালিকাভুক্ত অধিকাংশই মহিলা মাদরাসা। বেফাক কর্তৃপক্ষের দাবি, সম্পূর্ণ পর্দা-পুশিদা বজায় ও শরয়ি বিধান মেনেই পুরুষ পরিদর্শক মহিলা মাদরাসা পরিদর্শন করে থাকেন।
এতে কখনো কোনো সমস্যার সম্মুখিন হতে হয় কি না, জিজ্ঞেস করা হলে বরেণ্য আলেমে দীন ও দেশের শীর্ষ মহিলা মাদরাসা ফাতেমাতুজ জাহরার মুহাদ্দিস ও মুহতামিম মাওলানা মাহমুদ জাকির বেফাকের কথা সমর্থন করে আওয়ার ইসলামকে বলেন, ‘এতে আমাদের কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয় না। পরিদর্শকরা আসেন, আমরা থাকি তাদের সাথে। সম্পূর্ণ পর্দার আড়ালে মেয়েদের ডাকা হয়, প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করে তাদের বিদায় দেওয়া হয়। এখানে কোনো সমস্যা হচ্ছে বলে আমি মনে করি না।’
মহিলা পরিদর্শক হলেই বরং সমস্যা বেশি হতো—উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একজন নারী চাইলেই তারা মাহরাম ছাড়া যেখানে-সেখানে যেতে পারে না, শরিয়ত তাদের সে অনুমতি দেয় না এবং তাদের জন্য এটা নিরাপদও নয়। অধিকাংশ অভিভাবকও রাজি নন এতে। মাদরাসা পরিদর্শনের কাজে এখানে-সেখানে যেতে নানামুখী বিড়ম্বনায় পড়া বিচিত্র কিছু না।’
পরিদর্শকের যোগ্যতা আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘একজন পরিদর্শক অবশ্যই ভালো পরামর্শদাতা হওয়া চাই। মাদরাসা শিক্ষা কাঠামো থেকে নিয়ে পরিচালনা সবকিছুতেই হওয়া চাই ভালো দিকনির্দেশক। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা হতাশ। আলহাদুলিল্লাহ, আমাদের মাদরাসার বেশ সুনাম ও সুখ্যাতি আছে দেশজুড়ে। আমরা চাই আমাদেরকে আরও ভালো ও সুন্দর পরামর্শ দিয়ে বেফাক আমাদের পাশে থাকুক, কিন্তু আমাদের চাহিদা মতো যোগ্য পরিদর্শক আমরা পাচ্ছি না।’
সম্প্রতি মহিলা মাদরাসায় ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কথা উল্লেখ করে মাওলানা মাহমুদ জাকির বলেন, ‘একজন পরিদর্শকের এক্ষেত্রেও সূক্ষ্ম দৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া চাই। একটা মহিলা মাদরাসা পরিদর্শনের সময় পরিদর্শকের উচিত মহিলা মাদরাসার পরিবেশ-পরিস্থিতি ঠিক আছে কি না যাচাই করা। বোর্ড কর্তৃপক্ষেরও উচিত এ ব্যাপারে আরও সচেতন ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা ও সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন করা এবং নীতিমালায় কঠোর হওয়া। যারা নীতিমালা লঙ্ঘন করবে, তাদের প্রয়োজনে বোর্ড তালিকা থেকে নাম কেটে দেওয়ার ধমকিও দেওয়া যেতে পারে। এমন হলে আশা করি, যেসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা আমাদের চারপাশে ঘটছে, তা থেকে মুক্ত হওয়া যাবে।’
আইও