রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬ ।। ১৫ ফাল্গুন ১৪৩২ ।। ১২ রমজান ১৪৪৭


এবারের নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের অর্জন কী?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

|| বিশেষ প্রতিনিধি ||

গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়ে ইতোমধ্যে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসছে। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এই নির্বাচনে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব কষা হচ্ছে নানা আঙ্গিকে। স্বাভাবিকভাবেই এই নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিষয়টি আলাদাভাবে আলোচিত হচ্ছে। 

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নিঃসন্দেহে ইসলামপন্থীদের ভালো একটি উত্থান ঘটেছে। টানা পনের বছর একটি ফ্যাসিস্ট সরকারের রোষানলে পড়ে ইসলামপন্থীরা ছিল অনেকটা কোণঠাসা। এই অবস্থায় ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মুক্ত পরিবেশে তাদের উত্থান হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। যার ফলে দেশে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ইসলামপন্থীরা ভালো করবে-এমনটাই প্রত্যাশা ছিল সবার। সার্বিক বিচারে এবারের নির্বাচনে ইসলামপন্থীরা অনেক দিক থেকেই ভালো করেছে। তবে অনুকূল পরিবেশে যতটা প্রাপ্তির প্রত্যাশা ছিল ততটা যে পারেনি সেটাও আলোচিত হচ্ছে। 

এবারের নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামি দলগুলোর একটি বৃহৎ ঐক্য গড়ে উঠেছিল। ইসলামপন্থীদের ভোট একবাক্সে আনার টার্গেটও নেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বৃহৎ সেই ঐক্য টেকানো সম্ভব হয়নি। ফলে এবার ইসলামপন্থীদের ভোট মূলত তিন বাক্সে ভাগ হয়ে যায়। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ছিল বিএনপির সঙ্গে। 

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী ঐক্যে ছিল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত আন্দোলনসহ কয়েকটি ছোট দল। আর চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন শেষ মুহূর্তে আসন ভাগাভাগিসহ কিছু ইস্যুতে বিরোধ দেখা দেওয়ায় জামায়াত জোট থেকে বেরিয়ে এককভাবে নির্বাচন করে। 

নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ইসলামপন্থীদের জোট ৭৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। এর মধ্যে জামায়াত এককভাবে ৬৮টি আসনে জয় পেয়েছে। দলটি যেখানে ১৮টির বেশি আসন কখনো পায়নি সেখানে এবার তিন গুণের বেশি আসনে বিজয়ী হয়েছে। নিঃসন্দেহে দলটির জন্য এটি অনেক বড় অর্জন। অন্যদিকে এই জোটের অংশ হিসেবে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি আসনে এবং খেলাফত মজলিস একটি আসনে বিজয়ী হয়েছে। তাছাড়া ইসলামী আন্দোলন এককভাবে একটি আসনে বিজয়ী হয়েছে। জামায়াতের বাইরে কওমি মাদরাসাভিত্তিক দলগুলো সব মিলিয়ে চারটি আসনে জয় পেয়েছে। চারজন আলেম সংসদে যেতে সক্ষম হয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীতেও বেশ কিছু আলেম আছেন।

সবমিলিয়ে এবারের নির্বাচনে কওমি ও আলিয়া মিলিয়ে প্রায় ২৪ জন আলেম বিজয়ী হয়েছেন। স্বাধীনতার পর এর আগে কোনো নির্বাচনে এতো বিপুলসংখ্যক আলেম বিজয়ী হতে পারেননি। সে হিসেবে এবারের নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের অর্জন অভূতপূর্ব। 

এবারের নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক আলেম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কওমি আলেমদের মধ্যেই দুই শতাধিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বিভিন্ন দল থেকে। এর আগে ২০০১ সালে বিএনপি জোটের সঙ্গে মিলে চারজন আলেম সংসদে যেতে সক্ষম হন। সেটাই ছিল কওমি আলেমদের সর্বোচ্চ সফলতা। এবারও সংসদে যাওয়া কওমি আলেমের সংখ্যা চারজন। যদি প্রত্যাশা করা হচ্ছিল ডজনখানে আলেম সংসদে যেতে পারেন। তবে এবারের অর্জনটা অনেক বেশি। অর্ধশতাধিক আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন আলেমরা। তারা বিজয়ী হতে না পারলেও অনেকে লাখের বেশি বা কাছাকাছি ভোট পেয়েছেন।

এককভাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পেয়েছে ২ দশমিক ৭০ শতাংশ ভোট। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পেয়েছে ২ দশমিক ০৯ শতাংশ। খেলাফত মজলিস পেয়েছে ০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ভোট পেয়েছে ০ দশমিক ৪৭ শতাংশ। সব মিলিয়ে কওমি আলেমদের প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণই ছয় শতাংশের ওপরে। আর জামায়াতে ইসলামী এককভাবেই ৩০ শতাংশের ওপরে ভোট পেয়েছে। সে হিসেবে ইসলামপন্থীদের প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণটা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। 

তবে যে প্রত্যাশা করা হচ্ছিল তা থেকে অনেক দূরে রয়ে গেছে ইসলামপন্থীদের অর্জন। এবার জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় চলে যেতে পারে বলেও কারও কারও ধারণা ছিল। না হলেও এই জোট শতাধিক আসন পাবে বলে অনেক প্রত্যাশা করেছিলেন। যদিও নির্বাচন বাহ্যত অবাধ ও সুষ্ঠু হলেও কিছু কারচুপি ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগও আছে। সেটা না হলেও ইসলামপন্থীদের আরও বেশ কয়েকজন সংসদে যেতে সক্ষম হতেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইসলামি দলগুলোর নেতারা নির্বাচনী লড়াইয়ে ততটা দক্ষ নন। এর আগে কখনো মূলধারার রাজনীতিতে তারা সেভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। এবারই প্রথম মূলধারার রাজনীতিতে আলেমদের বড় অংশগ্রহণ চোখে পড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসলামপন্থীরা সঠিক ধারায় রাজনীতি অব্যাহত রাখতে পারলে আগামীতে তাদের সামনে বড় সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে।

 এমএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ