শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪ ।। ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০ ।। ২১ শাবান ১৪৪৫

শিরোনাম :

কওমি শিক্ষকদের অবসর প্রসঙ্গ : মাওলানা লিয়াকত আলী

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ফাইল ছবি

|| মাওলানা লিয়াকত আলী ||

ইদানীং কওমি মাদ্রাসার উস্তাদদের অবসর নিয়ে কথা উঠছে। কেউ কেউ বলছেন ৬৫ বছর বয়স হলে কওমি উস্তাদদের অবসরের নিয়ম থাকা প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে একটু আলোচনার প্রস্তাব ও চাহিদা আসছে বিভিন্ন মহল থেকে। সেই তাগিদ থেকে এ নিবন্ধের অবতারণা।

সরকারি চাকরিতে বয়সের একটি সীমাবদ্ধতা রাখা হয়েছে। আমাদের দেশের সরকারি চাকুরেদের জন্য ৬০ বছর বয়সে অবসর গ্রহণের নিয়ম রয়েছে। এরপরেও যদি কারও বিশেষ কর্মদক্ষতা বা যোগ্যতার কারণে রাষ্ট্র তার আরও সেবা নিতে চায়, তাহলে তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৫ বছর এবং হাইকোর্টের বিচারপতিদের জন্য তা ৬৭ বছর করা হয়েছে।

কিন্তু আমাদের কওমি মাদ্রাসার উস্তাদদের অবসরের কোনো বয়সসীমা নেই। তারা আজীবন মাদ্রাসায় দরস (শিক্ষাদান) ও অন্যান্য খেদমতে (সেবা, কাজ) নিয়োজিত থাকেন। এটা যেমন তাদের ত্যাগ ও ঐকান্তিকতার কারণে, তেমনি এর পেছনে কিছু বৈষয়িক কারণও আছে, যা অস্বীকারের সুযোগ নেই। কওমি মাদ্রাসার প্রত্যেক আলেমের প্রতিজ্ঞা থাকে জীবনের সব শ্রম ও মেধা দীনের স্বার্থে উৎসর্গ করার। তাই জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা দীনের খাতিরে নিজেকে উজাড় করে দেন। তারা যেহেতু মাদ্রাসার পরিবেশকে নিজের বাসস্থানের চেয়েও প্রাধান্য দেন এবং কর্মক্ষমতা হারানোর সময়টাও মাদ্রাসার পরিবেশেই কাটাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সেজন্য তারা জীবনের ন্যূনতম কর্মক্ষমতাও মাদ্রাসার পেছনে ব্যয় করতে চান। মাদ্রাসার দায়িত্বশীলরা এমন ব্যক্তির উপস্থিতি প্রতিষ্ঠানের জন্য কল্যাণকর বিবেচনা করেন।

আর বৈষয়িক কারণ যেমন নির্মম, তেমনি বাস্তব। সরকারি বেসরকারি শিক্ষক ও সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মকাল সমাপ্তির সময় কিছু সুবিধা প্রদানের নিয়ম আছে। যেমন অর্জিত ছুটির বিপরীতে সম্মানী, গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ড ফান্ড ইত্যাদি। কওমি মাদ্রাসায় এসবের কিছুই নেই। একজন উস্তাদ বা কর্মকর্তা-কর্মচারী শারীরিক মানসিক কর্মক্ষমতা হারানোর ফলে অবসর নিলে বা নিতে বাধ্য হলে তাকে শূন্য হাতেই বাড়ি ফিরতে হয় এবং জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো তাকে পার করতে হয় নিদারুণ কষ্টে কিংবা অন্যদের অনুগ্রহের পাত্র হয়ে। তাই কেউ স্বেচ্ছায় অবসর নিতে চান না।

আল্লাহতায়ালার অমোঘ নিয়ম এই যে, সৃষ্টিকূলের প্রতিটি শ্রেণির প্রতিটি এককের ওপর বয়সের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। কোরআন মাজিদের একাধিক আয়াতে মানুষের পার্থিব জীবনের বিভিন্ন ধাপ ও স্তরের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে আল্লাহর অনুপম সৃষ্টিনৈপুণ্য সম্পর্কে যেমন মানুষকে অবহিত করা হয়েছে, তেমনি এ জীবনের নশ্বরতার প্রতি ইঙ্গিত করে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, পার্থিব জীবনে আল্লাহর বিধানের অনিবার্যতা প্রত্যক্ষ করে মানুষ যেন আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহে সদা সচেষ্ট ও যত্নবান থাকে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমরা যাকে দীর্ঘ জীবন দান করি, তাকে সৃষ্টিগত পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিই। তবুও কি তারা বোঝে না?’ -সুরা ইয়াসিন : ৬৮

এ ধরনের আরও আয়াত আছে। মোটকথা বয়সের কারণে শারীরিক ও মানসিক কর্মক্ষমতা হ্রাস পাওয়া অনিবার্য। তাই তখন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন দায় ও জবাবদিহি থেকে মুক্তি এবং বিশ্রামের সুযোগ। অবসরের নিয়ম এজন্যই। আল্লাহর অমোঘ বিধানের বাইরে নন কওমি আলেমরা। বয়সের কারণে তাদেরও শারীরিক মানসিক সামর্থ্য হ্রাস পেতে পেতে এক পর্যায়ে অন্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যেতে হয়। এই বয়সে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে বহাল থাকা ও কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কত যে কঠিন, তা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। ফলে দরসের ক্ষেত্রে তারা আগের মতো শিক্ষার্থীদের খোরাক জোগানোর মতো মানসিক পরিশ্রমের যোগ্য থাকেন না, আবার তাদের উপস্থিতিতে ও বিদ্যমানতায় সেই দরসটির দায়িত্ব অন্যদের অর্পণ করাও অশোভনীয় বিবেচনা করা হয়। ফলে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা।

যারা প্রশাসনিক দায়িত্বে অধিষ্ঠিত থাকেন, তাদের বিষয়টি আরও নাজুক হয়ে যায়। কেননা তারা প্রায়ই স্বাধীনভাবে ও একাকী সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলার কারণে সহযোগী ও উপদেষ্টাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। নিয়মতান্ত্রিক ও আনুষ্ঠানিক সহযোগীদের বাইরে যদি ঘনিষ্ঠতার সুবাদে অনিয়মতান্ত্রিক ও অননুমোদিত এক বা একাধিক ব্যক্তি তার ওপর প্রভাব সৃষ্টি করে, তাহলে পরিস্থিতির অবনতি হয়। চরম অবনতি ঘটে যদি সেই সহযোগী ও সহযোগীদের বা উপদেষ্টার নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে। এ পর্যায়ে আমাদের অনেক সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বকে দুঃখজনকভাবে অভিযোগের পাত্র ও সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু হতে দেখা গেছে। একদিকে তাদের মহীরুহ ব্যক্তিত্ব ও অতুলনীয় অবদানের কারণে সেসব অভিযোগের বস্তুনিষ্ঠ নিরীক্ষার উদ্যোগ নিতে কুণ্ঠিত থাকে সংশ্লিষ্ট মহল। অন্যদিকে দিনদিন তার প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধায় ভাটা পড়তে থাকে। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ায় এক পর্যায়ে তৈরি হয় ক্ষোভ এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

এই নির্মম বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে কওমি মাদ্রাসার উস্তাদ ও দায়িত্বশীলদের অবসরের নিয়ম করার দাবি সমর্থন না করার যুক্তি নেই। অবসরের বয়স কত হবে, তা নিয়ে আরও চিন্তার অবকাশ আছে। আমাদের রাষ্ট্রীয় নিয়মে যে তিনটি সীমার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা থেকে সর্বোচ্চ ৬৭ বছরের সীমাটি প্রাথমিকভাবে চিন্তায় রাখা যেতে পারে। কোনো কোনো মহল থেকে ৭০ বছরের কথাও আসছে।

তবে এ ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। প্রথমত, অবসরকালীন আর্থিক সুবিধা। একজন উস্তাদ, মুহতামিম বা নায়েবে মুহতামিম নিজ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ তিলে তিলে নিঃশেষ করে দিয়ে শেষ বয়সে শূন্যহাতে বাড়ি ফিরবেন এবং শারীরিক অক্ষমতার দিনগুলো অসহায়ভাবে কাটাবেন, এটা তো চিন্তা করাও অমানবিক। তাই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অবসরকালীন আর্থিক সুবিধার নিয়ম থাকা উচিত। এই নিয়মের ধারা-উপধারা প্রণয়ন করতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মডেল সামনে রাখা যেতে পারে। এ ব্যাপারে কওমি মাদ্রাসাগুলোর আর্থিক সদাসংকটের অজুহাত তর্কাতীত নয়। সংকটের মধ্যেও বিভিন্ন প্রকল্পের মতো এটিকেও একটি প্রয়োজনীয় খাত হিসেবে সাব্যস্ত করলে বাস্তবায়ন অসাধ্য হবে না- ইনশাআল্লাহ। 

দ্বিতীয়ত, অবসর ও অব্যাহতির অর্থ দায়িত্ব ও জবাবদিহি থেকে মুক্তি। তাই একজন প্রবীণ উস্তাদ ও দায়িত্বশীলকে অবসর দেওয়ার অর্থ তিনি চাকরিবিধির বেড়াজাল ও দায়িত্বের ভার থেকে মুক্ত হবেন। কিন্তু তার জ্ঞান, মনীষা, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার সুফল গ্রহণের সুযোগ বজায় থাকা ও রাখা শুধু প্রয়োজন নয়, উপকারীও বটে। কেননা প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা অমূল্য সম্পদ। তা থেকে প্রতিষ্ঠানকে বঞ্চিত করা প্রতিষ্ঠানেরই স্বার্থের পরিপন্থী। তাই বয়স হয়ে গেলেও সক্ষম ও সামর্থ্যবান প্রবীণকে নিয়মতান্ত্রিক অবসর দিয়েও কিছু দায়িত্ব কমিয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করা যেতে পারে। তার সম্মানজনক অবস্থান ও মর্যাদা নির্ধারণ করা দায়িত্বশীলদের কর্তব্য হবে।

এগুলো প্রাথমিক ও সরল চিন্তা। অত্যন্ত তিক্ত হলেও সত্য যে, সাধারণভাবে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে বিধিবদ্ধ ও লিখিত কোনো চাকরিবিধি নেই। জনবল কাঠামো, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, বেতন-ভাতা বা সুযোগ-সুবিধার কাঠামো, শাস্তি, অব্যাহতি, অবসর, অবসরকালীন সুবিধা ইত্যাদির কোনো নির্ধারিত কাঠামো নেই। প্রতিষ্ঠানগুলোর শৃঙ্খলার স্বার্থে এই ঘাটতিগুলো পূরণের প্রতি মনোযোগ দেওয়া জরুরি। সরেজমিনে বাস্তবতার নিরিখে কওমি মাদ্রাসাগুলোর জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ চাকরিবিধি প্রণয়ন সময়ের অপরিহার্য চাহিদা। আল হাইয়াতুল উলইয়া এমন পদক্ষেপ ও উদ্যোগ গ্রহণের সবচেয়ে উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠান। এই সংস্থার মাধ্যমে একটি চাকরিবিধি প্রণয়ন করে তা সব মাদ্রাসার জন্য অনুসরণীয় করা হলে সবারই উপকার হবে।

লেখক : শিক্ষা সচিব ও সিনিয়র মুহাদ্দিস মাদ্রাসা দারুর রাশাদ, মিরপুর, ঢাকা

কেএল/


সম্পর্কিত খবর


সর্বশেষ সংবাদ