আল আমীন বিন সাবের আলী
‘শেষ ভালো যার সব ভালো তার’—বাণীটা আমরা মুখে মুখে ব্যাপকভাবে শুনে থাকি। এটাকে প্রচলিত একটি প্রবাদবাক্য মনে হলেও মূলত এটা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস থেকেই গৃহীত। রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন, إنما الاعمال بالخواتيم (সহিহ ইবনে হিব্বান, ৩৪০) অন্য হাদিসে আছে, ‘ইন্নামাল ইবরতু বিল খাওয়াতিম’।
আরবি বছরের শেষ মাস ‘জিলহজ’। মুমিনের শেষটা যেন ভালো হয়, সেজন্য আল্লাহ রব্বুল আলামিন এ-মাসের শুরু থেকেই নানারকমের পূণ্য ও পুরস্কার দিয়ে সাজিয়েছেন। তাই এ মাসটাকে গুরুত্বের সঙ্গে কাজে লাগানো সচেতন মুমিনের কাজ ও কর্তব্য।
এক. জিলহজের প্রথম দশকে ইবাদত করে নেকিময় জিন্দেগি লাভ করা । রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন, আল্লাহর নিকট জিলহজের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। (সুনানে আবু দাউদ, ২৪৩৮) অন্য হাদিসে আছে, ‘যে সকল দিবা-রাত্রি ইবাদত করে কাটানো আল্লাহর কাছে প্রিয়, এর মধ্যে সবচে’ বেশি প্রিয় হলো জিলহজের প্রথম দশকের ইবাদত। কেননা এ-মাসের একেক রোজার সওয়াব একবছর রোজা রাখার সমতুল্য এবং এ-মাসের একেকটি রাত্রের ইবাদতের সওয়াব কদরের রাত্রে ইবাদত করার সমতুল্য।’ (ফাজাইলুল আওকাত লিল বাইহাকি, ৩৪৬)
দুই. আরাফার (৯ জিলহজের) দিনে রোজা রেখে গুনাহমুক্ত জিন্দেগি সাজানো। এ ব্যাপারে রাসুল সা. বলেছেন, ‘আমার আশা আরাফার দিনে রোজা রাখলে আল্লাহ তায়ালা রোজাদারের আগের ও পরের এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।’ (সহিহ মুসলিম, ১১৬২) তিনি আরও বলেছেন, ‘আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন এত অধিক পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না।’ (সহিহ মুসলিম, ১৩৪৮)
তিন. সামর্থবানদের জন্য বাইতুল্লাহয় হজ পালন করার মাধ্যমে বেগুনাহ মাসুম হয়ে যাওয়া ও নবীজি সা. -এর দায়িত্বে নিজের জীবন অর্পণ করার সৌভাগ্য অর্জন করা। রাসুল সা. বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনোরূপ গুনাহে না জড়িয়ে সঠিকভাবে হজ পালন করবে সে সদ্য ভুমিষ্ঠ নবজাতকের ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে হজ থেকে বাড়িতে ফিরবে।’ (সহিহ বুখারি, ১৫২১) অপর হাদিসে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির উপর হজ ফরজ হওয়া সত্ত্বেও হজ পালন করে না, সে ইহুদি হয়ে মরুক বা নাসারা হয়ে মরুক (তার ব্যাপারে আমার কোনো দায়িত্ব নেই)’। (সুনানে দারেমি, ১৮২৬)
চার. তাকবিরে তাশরিক দীর্ঘ সময় (৯ই জিলহজ তথা আরাফার দিন ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত) পাঠের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার বড়ত্ব প্রকাশ করা, আল্লাহর ধ্যান-খেয়াল দিলে পয়দা করা এবং একত্ববাদের চেতনাকে উজ্জীবিত করা। রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন, ‘আইয়ামে তাশরিক হলো, পানাহার ও আল্লাহর জিকিরের জন্য।’ (মুসনাদে আহমদ, ২০৭২২)
পাঁচ. ঈদের রাতে ইবাদত করে কেয়ামতের দিনের জন্য প্রফুল্ল ও আলোকিত হৃদয় ধারণ করা। রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাত্রিতে সওয়াব লাভের আশায় ইবাদত করে অতিবাহিত করবে, যেদিন (কিয়ামতের দিন) সকলের অন্তরসমূহ মরা থাকবে তার অন্তর সেদিন মরবে না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, ১৭৮২) অর্থাৎ সবাই থাকবে মনমরা অবস্থায়, কিন্তু ঈদের রাত্রে ইবাদতকারী থাকবে প্রফুল্লচিত্ত অবস্থায়। যার ছাপ তার চেহারায়ও ফুটে উঠবে।
ছয়. সামর্থবানরা ঈদের দিন (১০ই জিলহজ বাদ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ের ভেতরে) কুরবানি করে ইবরাহিমি সুন্নত পালন ও মহিমান্বিত দিন উদযাপন করাসহ আল্লাহ তায়ালার হুকুমের সামনে নিজেদেরকে সপে দেওয়া, আত্মত্যাগ, মানবিকতা, শয়তানের সাথে প্রকাশ্য দুশমনি ঘোষণা করা এবং গুনাহ মাফের অবারিত সুযোগ গ্রহণ করা। যেমনটি ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কুরবানি দিন।’ (সুরা কাউসার, ৩)
রাসূল সা. বলেন, 'আল্লাহ তায়ালার নিকট সবচে মহিমান্বিত দিন হচ্ছে ‘ইয়াওমুন নাহর’ তথা কুরবানির দিন।' (সুনানে আবু দাউদ, ১৭৬৫) অন্য হাদিসে তিনি বলেন, ‘আমাকে ‘ইয়াওমুল আযহা’র আদেশ করা হয়েছে (অর্থাৎ এ দিনে কুরবানি করার আদেশ করা হয়েছে)। এ দিবসকে আল্লাহ তায়ালা এ উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছেন।' (মুসনাদে আহমাদ, ৬৫৭৫)
৭। কুরবানির হুকুমের মাধ্যমে (ইতিহাসে) আল্লাহপাক ইবরাহিম আ. -এর কাছে নিজ সন্তানের কুরবানি চেয়ে তাদেরকে পরীক্ষা করেছেন। এর মাধ্যমে আমাদেরকেও আল্লাহপাক পরীক্ষা দিয়েছেন যে, আমাদের সন্তানের সরাসরি কুরবানি নয় বরং দ্বীনের পথে, দ্বীনি তালিমের পথে তাদেরকে উৎসর্গ করতে আমরা পারি কি না। যদি কুরআনের শিক্ষায়, সুন্নাহর শিক্ষায়, দ্বীনি শিক্ষায় সন্তানদের আমরা কুরবান করতে পারি তাহলেই প্রকৃত কুরবানির শিক্ষা আমাদের দ্বারা অর্জন হবে, ইনশাআল্লাহ!
৮। কুরবানির বিধান দিয়ে আল্লাহপাক আমাদেরকে তাকওয়ার শিক্ষা দান করেছেন আজীবনের জন্য। যেমনটি ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহ তায়ালার কাছে কুরবানির পশুর গোশত ও রক্ত কিছুই পৌঁছে না, তবে তার কাছে কেবল তোমাদের মনের তাকওয়াই পৌঁছে থাকে। ( সুরা হজ, ৩৭) আর তাকওয়া মানে হলো, মানব মনের দশটি আখলাকে রজিলা (মন্দ স্বভাব) তথা- লোভ, দীর্ঘ আশা, রাগ, মিথ্যার আশ্রয়, পর সমালোচনা, কৃপণতা, হিংসা-বিদ্বেষ, রিয়া, অহংকার ও কীনা ইত্যাদি –পরিত্যাগ করা। যদি এই দোষগুলোকে কুরবানি না করা যায় তাহলে শুধু পশু কুরবানিতে কোনো ফায়দা নেই। তারপর দশটি আখলাকে হামিদা (ভালো গুণ) অর্জন করা। যেমন : সবর, শুকুর, অল্পতুষ্টি, সহিহ ইলম, সহিহ একিন, যুহদ, তাওয়াক্কুল, তাকদিরে সন্তুষ্টি, ইখলাস ও তাওবা ইত্যাদি গুণগুলো নিজের মধ্যে আনা। এবং সে মোতাবেক আমৃত্যু জিন্দেগী পরিচালনা করা। তাহলেই একজন মানুষ আল্লাহ তায়ালার মর্জি মোতাবেক প্রকৃত মানুষ হয়ে রফিকে আলার কাছে যেতে সক্ষম হবে, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে বছরের শেষ মুহূর্তে এসে উক্ত বিষয়গুলোর হিসাব নিকাশ করে বছরকে বিদায় জানানো এবং সামনের বছরকে স্বাগত জানানোর তাওফিক দান করেন। আমিন!
লেখক: পরিদর্শক, বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক)।
জেডএম/
