সোমবার, ২৫ মে ২০২৬ ।। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ৮ জিলহজ ১৪৪৭


জিলহজের ফজিলত ও আমাদের করণীয়

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| সামীউল হক নাজিব ||

আমাদের জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত, ক্ষণস্থায়ী। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে আল্লাহ তায়ালা কিছু বিশেষ সময় ও মুহূর্তকে অধিক মর্যাদাপূর্ণ করেছেন, যাতে আমরা সহজেই অধিক নেকি অর্জন করতে পারি এবং নিজেদের গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারি। এমনই এক মহিমান্বিত মাস হলো জিলহজ। অন্যান্য মাসের তুলনায় এই মাসের প্রথম দশ দিনের অনেক গুরুত্ব এবং ফজিলত রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মুসলমান এই সময়ে হজ পালনের উদ্দেশ্যে পবিত্র মক্কায় সমবেত হন। অন্যদিকে যাদের হজে যাওয়ার তাওফিক হয় না, তারাও নফল ইবাদত, রোজা, দোয়া, জিকির ও কুরবানির মাধ্যমে এই সময়ের বিশেষ নেকি লাভের চেষ্টা করেন।

জিলহজ আমাদের আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। তাই আমাদের উচিত এই মাসের মর্যাদা অনুধাবন করে যথাযথ আমলের মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে আলোকিত করা এবং তাকওয়ার রঙে রাঙানো।

জিলহজের ফজিলত:

পবিত্র কুরআন এবং হাদিসে জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনকে বছরের শ্রেষ্ঠ দিন বলা হয়েছে। কারণ, এই দিনগুলোতে একসঙ্গে বহু গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সুযোগ হয়—নামাজ, রোজা, সদকা, হজ, জিকির ও কুরবানি।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা জিলহজের প্রথম দশ রাতের শপথ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এবং শপথ দশ রাতের।’ (সুরা ফাজর: ২) মুফাসসিরগণ বলেন, এখানে ‘দশ রাত’ বলতে জিলহজ মাসের প্রথম দশ রাতকে বোঝানো হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা কোনো কিছুর শপথ তখনই করেন, যখন তার বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্ব থাকে। এ থেকেই এই দিনগুলোর মহত্ত্ব স্পষ্ট হয়ে যায়।

নেক আমলের শ্রেষ্ঠ সময় জিলহজ মাস:

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহর নিকট কোনো দিনের নেক আমল জিলহজের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় নয়।” (বুখারি শরিফ: ৯৬৯)

অর্থাৎ, এই দিনগুলোতে সামান্য নেক আমলের প্রতি প্রতিদান অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি। তাই আমাদের উচিত এই সুযোগকে কাজে লাগানো।

আরাফার দিনের গুরুত্ব:

৯ জিলহজ, আরাফার দিনের মর্যাদা অনেক। এই দিনে হজযাত্রীরা আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন, যা হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি যারা হজের সফরে নেই, তাদের জন্যও এই দিনের রোজা অনেক ফজিলতপূর্ণ। মুসলিম শরিফের এক হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো; উত্তরে তিনি বললেন, “এ রোজা বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের গুনাহের কাফফারা।” (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

কুরবানির শিক্ষা:

জিলহজ মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো কুরবানি। এটি শুধু পশু জবাই নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করার শিক্ষা। হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশে নিজের প্রিয় সন্তানকে কুরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ ও আনুগত্যের স্মরণে আমরা মুসলিমরা কুরবানি করে থাকি।

জিলহজ মাসে আমাদের করণীয়:

এক. নামাজের প্রতি গুরুত্বারোপ:

নামাজ ইসলামের মূল স্তম্ভ। পবিত্র এই মাসে গুরুত্বের সঙ্গে মসজিদে গিয়ে জামাতে অংশগ্রহণ করা এবং বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া উচিত। এতে করে আমাদের নেকিও অর্জন হবে এবং আমলের প্রতি আগ্রহও বৃদ্ধি পাবে।

দুই. নফল রোজা রাখা:

প্রথম নয় দিন রোজা রাখা অত্যন্ত উত্তম। বিশেষ করে আরাফার দিনের রোজা অনেক ফজিলতপূর্ণ। তাছাড়া রোজা আমাদের তাকওয়ার শিক্ষা দেয় এবং আমাদের আত্মসংযম বাড়ায়।

তিন. জিকির করা ও অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ:

এই সময়ে বেশি বেশি ‘আল্লাহু আকবার’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পাঠ করা। এছাড়াও বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করাও অনেক নেকির কাজ।

চার. কুরআনে কারিমের তেলাওয়াত:

জিলহজ মাস হলো আত্মশুদ্ধির সময়। তাই প্রতিদিন কুরআনে কারিমের তেলাওয়াত করা দরকার। এতে আমাদের ঈমানের নূর বৃদ্ধি পাবে, ইনশাআল্লাহ।

পাঁচ. তাওবা ও আত্মসমালোচনা:

মানুষ ভুল করে। কিন্তু উত্তম মানুষ সেই, যে নিজের ভুল বোঝার পর আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। এই সময়ে আন্তরিকভাবে তাওবা করা, গুনাহ থেকে দূরে থাকা এবং জীবনকে ইসলামের আলোকে সাজানোর চেষ্টা করা আমাদের প্রতিটা মুসলমানের জন্য উচিত।

ছয়. দান-সদকা করা:

গরিব, অসহায় ও অভাবীদের সাহায্য করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। জিলহজে বেশি বেশি দান-সদকা করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন এবং সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া ধনীদের মনে রাখা উচিত, তাদের সম্পদে গরিবের হক রয়েছে।

সাত. ঈদের নির্ধারিত দিনগুলোতে কুরবানি করা:

সামর্থ্যবান মুসলমানদের উচিত সুন্দরভাবে কুরবানি আদায় করা এবং কুরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন ও দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা। এতে সমাজে সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি হয়।

পরিশেষে: জিলহজ মুসলমানদের জন্য এক মহামূল্যবান সুযোগ। এই মাস আমাদের আল্লাহর আরও নিকটবর্তী হওয়ার আহ্বান জানায়। জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও আমাদের উচিত এই বরকতময় দিনগুলোকে অবহেলা না করে ইবাদত, তাওবা, জিকির, দান-সদকা ও কুরবানির মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে সুন্দর করা। আজকের পৃথিবীতে মানুষ ভোগবিলাস ও পাপাচারে ডুবে যাচ্ছে। এমন সময়ে জিলহজের শিক্ষা আমাদের নৈতিকতা, আত্মসংযম ও আল্লাহভীতির পথে চলার তাওফিক দান করুক। আমীন।

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ