বিহারে আলেমদের সেমিনার, ফিকহি ঐতিহ্য সংরক্ষণে ১০ প্রস্তাব
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:৪৭ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতের বিহারে ইসলামি ফিকহশাস্ত্রে স্থানীয় আলেমদের অবদান নিয়ে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী জাতীয় সেমিনার শেষ হয়েছে। এতে ফিকহি ঐতিহ্য সংরক্ষণ, প্রাচীন ফতোয়া ও পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ, গবেষণা-প্রকাশনা এবং সমকালীন চাহিদার সঙ্গে ফিকহশাস্ত্রের সমন্বয়ে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।

গত ৪ ও ৫ নভেম্বর পশ্চিম চম্পারণের কাটহারিতে শামস টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সেমিনার হলে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পাটনার ফুলওয়ারি শরিফভিত্তিক আবুল কালাম রিসার্চ ফাউন্ডেশন এ আয়োজন করে।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের সভাপতি ও বিশিষ্ট ফকিহ মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ রহিমানি। অল ইন্ডিয়া মিল্লি কাউন্সিলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও আবুল কালাম রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সভাপতি মাওলানা মুহাম্মদ আনিসুর রহমান কাসেমি ছিলেন সেমিনারের পৃষ্ঠপোষক ও প্রধান উদ্যোক্তা। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৫০টির বেশি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলের আলেম, শিক্ষক, গবেষক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।

দুই দিনের তিনটি অধিবেশনে বিহারের আলেমদের ফিকহি অবদানের ঐতিহাসিক, গবেষণামূলক ও ব্যবহারিক বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। এতে উপমহাদেশের ফিকহি ঐতিহ্যে বিহারের আলেমদের ভূমিকা, তাদের রচিত গ্রন্থ, ফতোয়া, পাঠদান ও গবেষণার ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়।

দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে দারুল উলুম দেওবন্দের সাবেক প্রধান মুফতি মাওলানা মুফতি জাফিরুদ্দিনের জীবন ও ফিকহি অবদান নিয়ে তাঁর ছেলে মাওলানা আহমদ সাজ্জাদ একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। পরে মুম্বাইয়ের দাওয়াতুস সুন্নাহ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মাওলানা মুহাম্মদ শাহিদ নাসেরি আলোচনায় অংশ নিয়ে মুফতি জাফিরুদ্দিনের হাজারো ফতোয়া সংকলন ও প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর চিন্তাভাবনা, প্রবন্ধ এবং দীর্ঘদিনের জ্ঞানচর্চার ধারাও লিখিতভাবে সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এ কাজে মুফতি জাফিরুদ্দিনের সন্তান ও অনুসারীদের পাশাপাশি নিজের প্রতিষ্ঠান থেকেও সহযোগিতার আশ্বাস দেন মাওলানা নাসেরি।

এ ছাড়া মাওলানা মুফতি আখতার ইমাম আদিল কাসেমির গবেষণাপত্রও সেমিনারে বিশেষ গুরুত্ব পায়।

সমাপনী অধিবেশনে সভাপতি মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ রহিমানি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ফিকহ কেবল কিছু মাসআলা ও বিধিবিধান জানার নাম নয়; বরং এটি মানুষকে জীবনযাপনের সঠিক পদ্ধতি এবং অন্যের অধিকার আদায়ের শিক্ষা দেয়। মানুষের জীবন পরিচালনার তিনটি নীতি—ইনসাফ, ইহসান ও জুলুমের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ইনসাফ হলো নিজের অধিকার গ্রহণের পাশাপাশি অন্যের অধিকার যথাযথভাবে আদায় করা। ইহসান হলো নিজের প্রাপ্য থেকে কিছু ছাড় দিয়ে অন্যকে তার অধিকারের চেয়েও বেশি দেওয়া। আর জুলুম হলো নিজের অধিকার বাড়িয়ে নেওয়া এবং অন্যকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। ইনসাফ অপরিহার্য, ইহসান প্রশংসনীয় এবং জুলুম অবৈধ।

তিনি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জন ও শিক্ষাদানের পাশাপাশি মানুষের অধিকার আদায়, কল্যাণকামিতা ও মানবসেবার মানসিকতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

সেমিনারের পৃষ্ঠপোষক মাওলানা মুহাম্মদ আনিসুর রহমান কাসেমি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ব্যক্তিত্ব গঠন, চিন্তা ও চরিত্রের সংশোধন এবং সমাজকে সঠিক পথনির্দেশনা দিতে জ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান ব্যক্তিগত উন্নতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে উম্মাহ ও সমাজের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য কেবল অবকাঠামো, সুযোগ-সুবিধা কিংবা সনদে নয়; বরং জ্ঞান, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও সেবার মানসিকতাসম্পন্ন মানুষ তৈরির মধ্যেই প্রকৃত সাফল্য।

এ সময় মাওলানা মুফতি উমর আবেদিন শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারে সময় নষ্ট না করা এবং নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের পরামর্শ দেন। অনুষ্ঠানে তাঁর রচিত গবেষণাগ্রন্থ ‘রিয়াজুল আযহার ফি তারাজিমি আ’লামি বিহার’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বইটিতে বিহারের বিশিষ্ট আলেম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের জীবন ও অবদান সংরক্ষণের প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।

সেমিনারের শেষ পর্যায়ে আবুল কালাম রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সম্পাদক মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ আদিল ফরিদির উপস্থাপনায় বিহারের ফিকহি ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশে ১০টি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবগুলো অনুমোদন করেন।

প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—বিহারের আলেমদের ফিকহি অবদান নিয়ে গবেষণা ও জাতীয় পর্যায়ে সেমিনার আয়োজন, তাঁদের রচিত গ্রন্থ, ফতোয়া, পাণ্ডুলিপি ও অপ্রকাশিত গবেষণাকর্ম সংগ্রহ, ফকিহ ও মুহাদ্দিসদের জীবনী ও অবদানের সমন্বিত সংকলন তৈরি এবং প্রাচীন ফতোয়া ও পাণ্ডুলিপি ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করে একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে ফিকহবিষয়ক গবেষণার সমন্বিত তালিকা তৈরি, ইসলামি অর্থনীতি, ডিজিটাল বাণিজ্য, চিকিৎসা ও জীববিজ্ঞানের নতুন বিষয়সহ সমকালীন ফিকহি সমস্যার ওপর বিশেষ সেমিনার আয়োজন এবং ফিকহি আলোচনা ও বিধানকে আধুনিক আইনি পরিভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি মাদরাসার ফিকহ ও উসুলে ফিকহের পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, তরুণ গবেষকদের উৎসাহিত করা এবং গৃহীত প্রস্তাব বাস্তবায়নে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। সেমিনার আয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদানের স্বীকৃতি জানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রস্তাবও গৃহীত হয়। সূত্র: বসিরত অনলাইন

এসএইচ/