মসজিদে বুলডোজার ও মাদরাসায় হয়রানি বন্ধের দাবি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৪২ সকাল
নিউজ ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতের মসজিদ, ঈদগাহ ও অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনায় উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ এবং মাদরাসাগুলোকে হয়রানি না করার দাবি জানিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় মজলিসে মুনতাজিমার বার্ষিক অধিবেশনের প্রথম দিনে গৃহীত প্রস্তাবে এসব দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে দেশের সব প্রাদেশিক, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ইউনিটকে কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত একই দিন ও সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ভারতের হরিয়ানার নুহ জেলার মেওয়াতের ডিএলএফ স্প্রিংফিল্ড, সহসৌলা পট্টির পিপাকায় জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের মজলিসে মুনতাজিমার বার্ষিক অধিবেশন শুরু হয়। সংগঠনটির সভাপতি মাওলানা মাহমুদ মাদনির পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় দুই হাজার সদস্য, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও আলেম অংশ নেন।

অধিবেশনের প্রথম পর্বে মাদরাসার সুরক্ষা, মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙার অভিযান বন্ধ এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রস্তাব গৃহীত হয়।

মাদরাসাসংক্রান্ত প্রস্তাবে স্বীকৃতি ও তদন্তের নামে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে হয়রানি, ভিত্তিহীন প্রচার এবং সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিতর্কে জড়ানোর চেষ্টায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ভারত সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি এ ধরনের কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ এবং সংবিধান অনুযায়ী মাদরাসাগুলোর অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

একই সঙ্গে মাদরাসার দায়িত্বশীলদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের জমির দলিল, অনুমোদিত নকশা, আবাসিক শিক্ষার্থীদের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য এবং আর্থিক হিসাবের নিরীক্ষা স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রস্তুত ও সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়।

মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনা সুরক্ষাসংক্রান্ত প্রস্তাবে দেশজুড়ে মসজিদ, ঈদগাহ, দরগাহসহ বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা লক্ষ্য করে উচ্ছেদ ও ভাঙচুরের ঘটনায় উদ্বেগ জানানো হয়।

প্রস্তাবে বলা হয়, মসজিদ কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামষ্টিক পরিচয়ের প্রতীক। ভারতের সংবিধানের ২৫ ও ২৬ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত ধর্মীয় স্বাধীনতারও গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।

এতে ১৯৯১ সালের প্লেসেস অব ওয়ারশিপ (স্পেশাল প্রভিশনস) আইনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলা হয়, ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর বিদ্যমান ধর্মীয় অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখা এবং অতীতের বিরোধ নতুন করে উত্থাপন বন্ধ করাই এ আইনের মূল উদ্দেশ্য। অযোধ্যা মামলার রায়েও সুপ্রিম কোর্ট আইনটিকে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

অধস্তন আদালতগুলোর পক্ষ থেকে এ আইনের মূলনীতি উপেক্ষা করে ধর্মীয় স্থাপনা জরিপের নির্দেশ দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক সম্ভলের জামে মসজিদের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, একতরফা জরিপের নির্দেশের পর সৃষ্ট পরিস্থিতি শান্তি ও আইনশৃঙ্খলার জন্য গুরুতর সংকট তৈরি করেছিল।

প্রস্তাবে ভারত সরকার ও উচ্চ আদালতের প্রতি ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি ১৯৯১ সালের আইনবিরোধী নতুন দাবি প্রাথমিক পর্যায়েই খারিজ করার দাবি তোলা হয়।

এ ছাড়া যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে পৌরসভা, রাজস্ব বিভাগ ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মসজিদ ভাঙার অভিযান বন্ধের দাবি জানানো হয়। আইন লঙ্ঘনকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সব প্রাদেশিক, জেলা ও উপজেলা ইউনিট কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত একই তারিখ ও সময়ে নিজ নিজ এলাকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে স্মারকলিপি দেবে।

পাশাপাশি আগামী ছয় মাসের মধ্যে মসজিদ পরিচালনা কমিটিগুলোর সহযোগিতায় মসজিদের জমির দলিল, খতিয়ান, খসড়া-খতিয়ান, পৌরকরসংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য আইনি কাগজপত্র যাচাই ও হালনাগাদ করার জন্য সব ইউনিটকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) নিয়ে গৃহীত প্রস্তাবে আইনটিকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়, এর কাঠামোর মধ্যেই বৈষম্য রয়েছে।

মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনা সুরক্ষাসংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করেন জমিয়তে উলামায়ে উত্তর প্রদেশের সহসভাপতি মাওলানা প্রফেসর নোমান শাহজাহানপুরী। এতে সমর্থন জানান জমিয়তে উলামায়ে উত্তরাখণ্ডের মহাসচিব মাস্টার এহসান ইলাহী এবং পূর্ব উত্তর প্রদেশ জোনের মহাসচিব মুফতি জামিলুর রহমান।

মাদরাসাসংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করেন মাওলানা শামসুদ্দিন বাজলি। এতে সমর্থন জানান জমিয়তে উলামায়ে তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্র প্রদেশের দীন ও তালীমি বোর্ডের সভাপতি মুফতি আবদুল কভি।

অভিন্ন দেওয়ানি বিধিসংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করেন জমিয়তে উলামায়ে রাজস্থানের মহাসচিব মাওলানা আবদুল ওয়াহিদ খতরি। এতে সমর্থন জানান জমিয়তে উলামায়ে মধ্য উত্তর প্রদেশের সভাপতি মাওলানা ইসলামুল হক আসজাদ, দারুল উলুম দেওবন্দের শুরা সদস্য মাওলানা মাহমুদ হাসান খায়রওয়া এবং মাওলানা মুফতি আবদুর রাজ্জাক আমরোহভি।

এর আগে গত ২৯ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মাদানি হলে সংগঠনটির মজলিসে আমেলার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মজলিসে মুনতাজিমার অধিবেশনে উত্থাপনের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাবের খসড়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মজলিসে আমেলায় অনুমোদিত প্রস্তাবগুলোই শুক্রবারের অধিবেশনে উপস্থাপন করা হয়।

অধিবেশনের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন জমিয়তে উলামায়ে হরিয়ানা, পাঞ্জাব ও হিমাচল প্রদেশের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া কারিমি। এরপর জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ হাকিমুদ্দিন কাসেমি বিগত অধিবেশনের কার্যবিবরণী পাঠ এবং সাংগঠনিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। এ সময় কবি কারি এহসান মুহসিন কবিতা আবৃত্তি করেন। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের উত্তর ভারতীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মুফতি জাকির হুসাইন কাসেমি শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করেন।

আগামী ৩১ অক্টোবর দুপুর পর্যন্ত অধিবেশন চলবে। এতে ভারতের চলমান পরিস্থিতি এবং মুসলমানদের সামাজিক, শিক্ষাগত, জাতীয় ও সাংগঠনিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপনের কথা রয়েছে। অধিবেশনে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মাওলানা মাহমুদ আসআদ মাদনির গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ারও কথা রয়েছে।

সূত্র: মিল্লাত টাইমস উর্দু

আইও/