রোগমুক্তির আশায় শরীরে যমযমের পানি ছিটানো, কী বলে ইসলাম?
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:৩৪ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক 

পবিত্র যমযমের পানি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময়। হাদিসে এ পানির ফজিলত, খাদ্যের বৈশিষ্ট্য এবং রোগমুক্তির প্রত্যাশার কথা বর্ণিত হয়েছে। যুগে যুগে মুসলিম মনীষীরা আল্লাহর কাছে শিফা কামনায় যমযমের পানি পান করেছেন এবং এর বরকত লাভের কথা উল্লেখ করেছেন।

যমযমের পানি পান করার সময় আল্লাহর কাছে উপকারী জ্ঞান, প্রশস্ত রিজিক ও রোগমুক্তি কামনা করা যায়। পাশাপাশি অসুস্থতার ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করাও জরুরি।
যমযমের পানিতে রয়েছে খাদ্যের বৈশিষ্ট্য ও রোগমুক্তি

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

خَيْرُ مَاءٍ عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ مَاءُ زَمْزَمَ، فِيهِ طَعَامٌ مِنَ الطَّعْمِ وَشِفَاءٌ مِنَ السُّقْمِ.

‘ভূপৃষ্ঠের সর্বোত্তম পানি হলো যমযমের পানি। এতে রয়েছে খাদ্যের বৈশিষ্ট্য ও রোগ থেকে মুক্তি।’ (আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি, হাদিস ১১১৬৭; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদিস ৫৭১২) 

এ বর্ণনায় যমযমের পানির দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে—এতে খাদ্যের বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে রোগমুক্তি কামনা করা যায়।

খাদ্য মানুষের জীবনধারণের অন্যতম প্রধান উপকরণ। খাদ্য থেকে মানুষ শক্তি পায় এবং দৈনন্দিন কাজ করার সামর্থ্য অর্জন করে। যমযমের পানির বরকত সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসেও এর খাদ্যসদৃশ বৈশিষ্ট্যের কথা এসেছে।

শুধু যমযম পান করে দিন কাটিয়েছিলেন আবু যর (রা.)

সাহাবি হজরত আবু যর গিফারি (রা.)-এর জীবনের একটি ঘটনা যমযমের পানির খাদ্যসদৃশ বৈশিষ্ট্য বোঝাতে উল্লেখ করা হয়।

সহিহ মুসলিমে বর্ণিত দীর্ঘ একটি হাদিসের অংশে এসেছে, ইসলাম গ্রহণের আগে হজরত আবু যর (রা.) মক্কায় অবস্থানকালে দীর্ঘ সময় শুধু যমযমের পানি পান করে কাটিয়েছিলেন। এ সময় তিনি ক্ষুধা অনুভব করেননি বলেও বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

তিনি বলেন,

مَا كَانَ لِي طَعَامٌ إِلَّا مَاءُ زَمْزَمَ فَسَمِنْتُ حَتَّى تَكَسَّرَتْ عُكَنُ بَطْنِي، وَمَا أَجِدُ عَلَى كَبِدِي سُخْفَةَ جُوعٍ.

‘যমযমের পানি ছাড়া আমার আর কোনো খাবার ছিল না। শুধু এ পানি পান করেই দিন কাটিয়েছি। এমনকি আমার শরীরও মোটা হয়ে গিয়েছিল। এ সময়ে আমি ক্ষুধাও অনুভব করিনি।’

এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إِنَّهَا مُبَارَكَةٌ، إِنَّهَا طَعَامُ طُعْمٍ.

‘নিশ্চয়ই এটি বরকতময় পানি। এতে রয়েছে খাদ্যের বৈশিষ্ট্য।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৪৭৩) 

ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহ.) তাঁর যাদুল মাআদ গ্রন্থে যমযমের পানি পান করে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করা এবং ক্ষুধা অনুভব না করার কিছু অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেছেন।

রোগমুক্তির জন্য যমযম পান

যমযমের পানির আরেকটি বিশেষ ফজিলত হলো, এ পানি পান করে আল্লাহর কাছে শিফা বা আরোগ্য কামনা করা। হাদিসে এ বিষয়ে উৎসাহমূলক বর্ণনা পাওয়া যায়।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

مَاءُ زَمْزَمَ لِمَا شُرِبَ لَهُ، فَإِنْ شَرِبْتَهُ تَسْتَشْفِي بِهِ شَفَاكَ اللهُ.

‘যে উদ্দেশ্যে যমযমের পানি পান করা হয়, তা সে উদ্দেশ্যের জন্যই। তুমি যদি আরোগ্য লাভের আশায় তা পান করো, তবে আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন।’ (আল-মুস্তাদরাক, হাকেম, হাদিস ১৭৩৯) 

এ বর্ণনার আলোকে যমযম পান করার সময় আল্লাহর কাছে সুস্থতা ও রোগমুক্তি কামনা করা যায়। তবে শিফা দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তাই যমযম পান করার পাশাপাশি অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

যমযম পান করে যে দোয়া পড়তেন ইবনে আব্বাস (রা.)

বর্ণিত আছে, হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) যমযমের পানি পান করার সময় রোগমুক্তিসহ কল্যাণ কামনা করে দোয়া করতেন। দোয়াটি হলো—

اللَّهُمَّ أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا وَاسِعًا، وَشِفَاءً مِنْ كُلِّ دَاءٍ.

‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, প্রশস্ত রিজিক এবং সব রোগ থেকে আরোগ্য কামনা করছি।’ (আল-মুস্তাদরাক, হাকেম, হাদিস ১৭৩৯) 

যমযমের পানি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা

ইসলামের ইতিহাসে বহু আলেম ও মনীষী রোগমুক্তির আশায় যমযমের পানি পান করার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর ছেলে তাঁর পিতার সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, তিনি রোগমুক্তির আশায় যমযমের পানি পান করতেন এবং তা দিয়ে হাত ও মুখ মাসাহ করতেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১১/২১২) 

ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহ.)-ও তাঁর যাদুল মাআদ গ্রন্থে যমযমের পানি পান করে অসুস্থতা থেকে উপকৃত হওয়ার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন।

তিনি লেখেন, একবার মক্কায় অসুস্থ হয়ে পড়লে যমযমের পানি নিয়ে তাতে কয়েকবার ‘ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন’ পাঠ করে পান করেছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এর মাধ্যমে তিনি সুস্থতা লাভ করেন। অন্যান্য ব্যথা-বেদনাতেও এ আমল করে উপকার পাওয়ার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। (যাদুল মাআদ, ৪/১৭৮, ৪/৩৯৩) 

এসব বিবরণ সংশ্লিষ্ট মনীষীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখিত। এগুলো থেকে যমযমের পানির বরকত সম্পর্কে তাঁদের বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতার পরিচয় পাওয়া যায়।

যমযমের পানিতে নবীজি (সা.)-এর বরকতময় স্পর্শ

যমযমের পানির সঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি স্মরণীয় ঘটনার বর্ণনাও পাওয়া যায়।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যমযম কূপের কাছে এলে সাহাবিরা তাঁকে এক পেয়ালা পানি পান করতে দেন। তিনি পানি পান করার পর পেয়ালায় কুলি করেন। পরে সাহাবিরা পেয়ালার সেই পানি যমযমের কূপে ঢেলে দেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ৩৫২৭) 

এ ঘটনা উল্লেখ করে আলেমরা যমযমের পানির ফজিলত ও বরকতের বিষয়টি আলোচনা করেছেন। মুসলমানদের কাছে যমযমের পানি শুধু পবিত্রতার প্রতীক নয়, বরং এটি আল্লাহর রহমত ও বরকতের প্রত্যাশায় পান করা একটি মর্যাদাপূর্ণ পানি।

যমযম পান করার সময় কী করবেন?

যমযমের পানি পান করার সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি, উপকারী জ্ঞান, হালাল ও প্রশস্ত রিজিক এবং রোগমুক্তি কামনা করা যেতে পারে। অন্তরে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে দোয়া করা এবং তাঁর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করাই মুমিনের প্রত্যাশিত আমল।

আর যমযমের পানি শরীরে ছিটানোকে সুন্নাহ বলা বা এ বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট হাদিসের নির্ভরযোগ্য সূত্র ও আলেমদের ব্যাখ্যা যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো আমলকে সুন্নাহ বা বিদআত হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে যমযমের পানির বরকত দান করুন, উপকারী জ্ঞান ও প্রশস্ত রিজিক দান করুন এবং সব ধরনের অসুস্থতা থেকে শিফা দান করুন। আমিন।

এসএইচ/