এক আলেমের চোখে প্রতিভা
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:২৪ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| আকিদুল ইসলাম সাদী || 

কুফার বাজারে সেদিন বেশ ভিড়। সকাল থেকেই ক্রেতাদের আনাগোনা। কেউ কাপড়ের দামদর করছে, কেউ পছন্দের কাপড় হাতে নিয়ে আলোয় ধরে দেখছে। দোকানিদের হাঁকডাকে বাজারের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত মুখর।

তরুণ নু‘মান নিজের কাপড়ের দোকানে বসে হিসাব করছিল। ব্যবসার কাজে তাঁর মনোযোগ ছিল। ক্রেতার সঙ্গে প্রতারণা করত না, মাপে কম দিত না, দাম নিয়ে অযথা ঝগড়াও করত না। এজন্য অল্প বয়সেই তাঁর প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছিল।

ব্যবসার ব্যস্ততার মাঝেও নু‘মানের মনে অন্য একটি জগতের প্রতি টান তৈরি হচ্ছিল। সেটি হল আলেমদের মজলিসের জগৎ। কোনো আলেমকে  পাশ দিয়ে যেতে দেখলে সে একটু থেমে যেত। তাঁদের কথা শুনত। কখনো মনে কোনো প্রশ্ন এলে  সুযোগ বুঝে আলেমকে জিজ্ঞেস করত।

একদিন  সকালে বাজারের পথে তাঁর দেখা হয়ে গেল বিখ্যাত তাবেঈ আলেম শা‘বি (রহ.)-এর সঙ্গে। তিনি তাঁকে দেখে থামলেন। প্রশ্ন করলেন, তুমি কি নু‘মান?

নু‘মানও অবাক হয়ে তাকালেন। নমনীয় ভাষায় বলল, জি, হুজুর।

— কোথায় যাচ্ছ?

— দোকানে।

শা‘বি (রহ.) কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আলেমদের কাছে বসো?

নু‘মান একটু ইতস্তত করে বলল, জি হুজুর। সুযোগ পেলেই যাই।

— কী পড়ছ?

প্রশ্নটি শুনে নু‘মান চুপ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছিল, শা‘বি (রহ.) সাধারণ কৌতূহল থেকে প্রশ্ন করছেন না। এজন্য নিঃসংকোচে উত্তর দিল, তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয় শুনি। তবে এখনো নিয়মিত কোনো একটি বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করিনি।

শা‘বি (রহ.) মৃদু হেসে বললেন, তোমার মধ্যে আমি এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি, যা তোমার নিজেরও জানা নেই।

নু‘মান অবাক হয়ে বলল, কী দেখতে পাচ্ছেন?

— তোমার মধ্যে মেধা আছে। বুদ্ধি আছে। প্রশ্ন করার ক্ষমতা আছে। এসব যদি ইলমের পথে কাজে লাগাও, তাহলে মানুষ একদিন তোমার কাছ থেকেও উপকৃত হবে।

নু‘মান নীরব হয়ে গেল। কথাগুলো খুবই সাধারণ। কখনো কখনো একটি ছোট বাক্যও মানুষের পুরো জীবন বদলে দেয়।

শা‘বি (রহ.) আবার বললেন, ব্যবসা করবে, এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ইলমের দরজাটা বন্ধ করে রেখো না।

নু‘মান বিনয়ের সঙ্গে মাথা নত করল। আকুতি কণ্ঠে বলল, আপনার দোয়া চাই, হুজুর।

— আল্লাহ তোমাকে উপকারী ইলম দান করুন।

শা‘বি (রহ.) চলে গেলেন। নু‘মানও ধীরে ধীরে নিজের দোকানের দিকে এগোল। আজ তাঁর পা যেন আগের মতো চলছে না। মনে হচ্ছে, কেউ যেন তার সামনে একটি নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। দোকানে এসে বসার পরও বারবার শা'বী রহ.-এর কথাগুলো মনে হতে লাগল।

আজ নু'মান নিজের দিকে নতুন করে তাকাল। এতদিন সে নিজেকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবেই চিনত। কাপড়ের হিসাব, ক্রেতার পছন্দ, বাজারের দাম— এসবই ছিল তার পরিচিত জগত। কিন্তু আজ মনে হলো, তাঁর জীবনে হয়তো আরও বড় কোনো দায়িত্ব অপেক্ষা করছে।

সেদিন বিকেলে দোকানের কাজ শেষ করে সে এক আলেমের মজলিসে গেল। সেখানে বসে অনেকক্ষণ মন দিয়ে আলোচনা শুনল। একটি বিষয় নিয়ে আলেম কথা বলছিলেন। নু‘মানের মনে একটি প্রশ্ন এলো। হাত তুলে সে বলল,  হুজুর, এ বিষয়ে যদি অন্য কোনো বর্ণনা থাকে, তাহলে সেটিও কি বিবেচনা করতে হবে?

আলেম তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন,  অবশ্যই। একটি বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে বিষয়টির বিভিন্ন দিক জানতে হয়।

নু‘মান চুপ হয়ে গেল। তাঁর মনে হলো, শা‘বি (রহ.) হয়তো ঠিকই বলেছেন। তার সামনে ইলমের একটি বড় দরজা খুলছে। সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে নু‘মান অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না।

জানালার বাইরে কুফার নিস্তব্ধ রাত। আকাশের দিকে সে তাকিয়ে ভাবল, “আমি কি শুধু ব্যবসা করেই জীবন কাটাব?”

প্রশ্নটির উত্তর তখনও তাঁর কাছে স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল— ইলমের পথে তাকে এগোতে হবে। অনেক দূর যেতে হবে।

এসএইচ/