
|
সমসাময়িক কওমি মাদ্রাসা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা: মুফতি দিলাওয়ার হোসাইনের সাক্ষাৎকার
প্রকাশ:
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:০০ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থা, সনদের স্বীকৃতি, পাঠ্যক্রমে আধুনিকায়নের দাবি এবং সমসাময়িক নানা ইস্যু নিয়ে প্রতিনিয়তই আলোচনা হয়ে থাকে। এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষের বিভিন্ন কৌতূহল ও ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটাতে আওয়ার ইসলামের মুখোমুখি হয়েছিলেন রাজধানীর স্বনামধন্য দ্বীনি শিক্ষাপীঠ মসজিদুল আকবর কমপ্লেক্সের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, বিশিষ্ট আলেম আল্লামা মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন আওয়ার ইসলামের মাল্টিমিডিয়া প্রধান তানবিরুল হক আবিদ। আওয়ার ইসলাম: কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি নিয়ে কথা উঠেছে। এই সনদের আওতায় এলে কওমি মাদ্রাসাগুলোর অবস্থাও কি আলিয়া মাদ্রাসার মতো হয়ে যাবে বলে মনে করেন? মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন: আমাদের আকাবির বা শীর্ষ আলেমরা একটি নির্দিষ্ট শর্তেই এই সনদের স্বীকৃতি নিয়েছেন। শর্তটি হলো, আমাদের নেসাব তথা সিলেবাসের মধ্যে সরকার কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করবে না। যদি সিলেবাস বা আমাদের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে সরকার হস্তক্ষেপ না করে, তবে সনদ এবং স্বীকৃতি পাওয়ার পরও আমাদের কার্যক্রমে ইনশাআল্লাহ কোনো পরিবর্তন আসবে না। আর যদি হস্তক্ষেপ করতে যায়, তখন সমস্যা দেখা দিতে পারে। আল্লাহ পাক আমাদের এসব থেকে হেফাজত করুন। শর্তগুলো ঠিক থাকলে কোনো সমস্যা হবে বলে মনে করি না। আওয়ার ইসলাম: সময়ের চাহিদা অনুযায়ী কওমি সিলেবাস বা শিক্ষার ভেতরে কী ধরনের পরিবর্তন বা উন্নতি সাধন করা যেতে পারে? মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন: আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা হয়ে আছে যে, কওমি মাদ্রাসায় কেবল আরবি, ফার্সি ও উর্দু পড়ানো হয়। অন্য কিছু পড়ানো হয় না। এই ধারণাটি মোটেও সঠিক নয়। কওমি মাদ্রাসায় এখন বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজি, ভূগোল, ইতিহাস থেকে শুরু করে অর্থনীতি, পৌরনীতি, রাষ্ট্রনীতিসহ প্রায় সবই পড়ানো হয়। আমি একটি উদাহরণ দিই। একবার সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবী একটি সেমিনারে এসে আমাকে হেজিং, অপশন ব্যবসা এবং এমএলএম ব্যবসা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। আমি তাদের বললাম, এগুলো তো আমরা পড়াই এবং আমাদের ছাত্ররাও এগুলো সম্পর্কে অবগত। আমাদের ছাত্ররা এখন বিভিন্ন ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ডে কাজ করছে, সেমিনারে অংশ নিচ্ছে। সুতরাং মাদ্রাসায় শুধু পুরনো বিষয় পড়ানো হয়, এই ধারণাটি ভুল। আধুনিক যুগের অর্থনীতির নানা জটিল বিষয় সম্পর্কেও তারা সচেতন এবং তদানুযায়ী আমল করে। জীবিকার জন্য তাদের চিন্তিত হতে হয় না। আওয়ার ইসলাম: সম্প্রতি হেবা আইন পাস হয়েছে এবং কেউ কেউ বলছেন এটি সর্বসম্মত। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী? মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন: এ বিষয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমরা গত কয়েকদিন আগে একটি মিটিং করেছেন। আগামী বুধবার আরও একটি মিটিং হওয়ার কথা রয়েছে। এরপরই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে। আওয়ার ইসলাম: বাংলাদেশ যেহেতু মুসলিম অধ্যুষিত দেশ, এ দেশের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ফতোয়া বোর্ড থাকার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন কি? মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন: সরকারের তত্ত্বাবধানে ফতোয়া বোর্ড না থাকাই ভালো বলে আমি মনে করি। কারণ ফতোয়া বোর্ড তো আমাদের এমনিতেই আছে। হাইয়াতুল উলয়া, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়াসহ এ ধরনের বোর্ড তো আছেই। একসময় আমি নিজেই মহাসচিব ছিলাম, সেখানেও ফতোয়া বোর্ড আছে। এই বোর্ডগুলোর মাধ্যমেই জাতির চাহিদা ইনশাআল্লাহ পূরণ হবে। সরকারিভাবে ভিন্ন বোর্ডের প্রয়োজনীয়তা দেখছি না। আওয়ার ইসলাম: সম্প্রতি কওমি মাদ্রাসাগুলোকে কেন্দ্র করে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা বা অপপ্রচার দেখা যাচ্ছে। এসব থেকে বেঁচে থাকতে মাদ্রাসার মুহতামিম বা বোর্ডের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত? মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন: আমরা যতটুকু খোঁজখবর নিয়েছি বা তাহকিক করেছি, এসব ঘটনার অধিকাংশই মিথ্যা এবং অপপ্রচার। আমাদের আশপাশের কিছু ঘটনা সম্পর্কেও খোঁজ নিয়ে দেখেছি সেগুলো পুরোটাই প্রতারণা। এ ধরনের ঘটনা বাস্তবে খুবই কম ঘটে। অন্যান্য জায়গায় এর চেয়ে অনেক বেশি ঘটে, কিন্তু সেগুলো নিয়ে তেমন মাতামাতি হয় না। কওমি মাদ্রাসা নিয়ে এর পেছনে কোনো দুরভিসন্ধি থাকতে পারে। তারপরও মাদ্রাসার মুহতামিম বা পরিচালকদের খুব সতর্ক থাকা উচিত। আমাদের যে বড় দুটি বোর্ড আছে, হাইয়াতুল উলয়া এবং বেফাক, তাদেরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এ নিয়ে মিটিংও হয়েছে এবং সামনে যেন আরও সতর্কতা অবলম্বন করা যায় সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আওয়ার ইসলাম: একজন ছাত্র যদি মুহাক্কিক মুফতি হিসেবে গড়ে উঠতে চায়, তবে তার অধ্যয়নের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত? মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন: প্রথমত, তাকে আরবি ব্যাকরণ অর্থাৎ ইলমে সরফ ও ইলমে নাহু খুব ভালোভাবে জানতে হবে। পাশাপাশি বর্তমান বিশ্ব কীভাবে চলছে সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে। আরবিতে একটি কথা আছে, যে ব্যক্তি তার সমসাময়িক যুগ সম্পর্কে জানে না, সে মূর্খ। তাই বর্তমান দুনিয়ার হালচাল, মানুষের প্রচলিত অভ্যাস বা প্রথা সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে। এরপর ইসলামি আইনের গুরুত্বপূর্ণ কিতাব যেমন 'হেদায়া' খুব ভালোভাবে পড়তে হবে। পড়াশোনা শেষে কোনো বিজ্ঞ মুফতির তত্ত্বাবধানে ইফতা বিভাগে ভর্তি হয়ে অন্তত কয়েক বছর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। তবেই সে একজন বিজ্ঞ মুফতি হতে পারবে। আওয়ার ইসলাম: কওমি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কী এবং এই উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আমরা কী করতে পারি? মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন: কওমি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের দুনিয়া ও আখেরাত সুন্দর করা। অমানুষকে মানুষ বানানো, অশিক্ষিতকে শিক্ষিত ও নৈতিকতাসম্পন্ন করা। কওমি মাদ্রাসার প্রতিটি ক্লাসেই নৈতিকতা ও মানবতার শিক্ষা দেওয়া হয়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সিরাত বা জীবনী আমাদের সিলেবাসভুক্ত। বড় বড় মনীষীদের জীবনী এখানে পড়ানো হয়। এতে করে নিজের চরিত্র গঠন করতে সুবিধা হয়, অন্যের চরিত্র গঠন করানোও সহজ হয়। আমাদের দেশে এখন শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বত্রই দুর্নীতি। অথচ যারা কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে, তারা যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজও করে, তাদের মধ্যে সাধারণত দুর্নীতি পাওয়া যায় না। নৈতিকতার এই শিক্ষা কওমি মাদ্রাসায় ব্যাপকভাবে চর্চা হয়। এ ধারা অব্যাহত থাকলে একসময় দেশ ও দশের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে ইনশাআল্লাহ। আওয়ার ইসলাম: ছবি তোলার বিষয়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি বা আপনার তাহকিক কী? মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন: ছবি যদি কাগজে ছাপানো হয়, তবে আমরা সেটাকে নাজায়েজ মনে করি। আর ডিজিটাল যন্ত্র বা মোবাইলের স্ক্রিনে যে ছবি দেখা যায়, সেটি মূলত আলোর রশ্মির মাধ্যমে ধরে রাখা হয়। এটি স্থায়ী কোনো রূপ নয়। তাই যন্ত্রের ভেতরের ছবি কাগজের ছবির মতো সরাসরি নাজায়েজের আওতায় পড়ে না। তবে এরপরও যথাসাধ্য এসব থেকে বেঁচে থাকাটাই উত্তম। যেকোনো সময় মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়তে পারে, তাই সতর্কতা কাম্য। আওয়ার ইসলাম: দেশবাসীর উদ্দেশে আপনার সর্বশেষ বার্তা কী? মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন: দেশবাসীর প্রতি আমার একটিই অনুরোধ, কোনো ঘটনা কানে আসলেই তা নিয়ে চর্চা শুরু করা উচিত নয়। আগে খুব ভালোভাবে তাহকিক বা যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন যে ঘটনাটি সত্য কি মিথ্যা। আমাদের দেশের একটি প্রবণতা হলো, কারও নামে কোনো অভিযোগ উঠলে সাথে সাথে তা মিডিয়ায় চলে আসে। অথচ পরবর্তীতে সেই ব্যক্তি যখন নিরপরাধ প্রমাণিত হন, তখন আর সেই খবরটি মিডিয়াগুলো সেভাবে প্রচার করে না। মিডিয়ার উচিত যেভাবে অভিযোগের খবরটি প্রচার করা হয়, ঠিক সেভাবেই কেউ নির্দোষ প্রমাণিত হলে সেটিও প্রচার করা। তাহলে মানুষ বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। আওয়ার ইসলাম: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন: জাজাকাল্লাহ। এসএইচ/ |