
|
কুরআন কি অযোগ্য, নাকি আমরা?
প্রকাশ:
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৫৭ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| আকিদুল ইসলাম সাদী || ‘কুরআনকে সংবিধানের ভিত্তি করা যাবে না। কারণ, কুরআনের কোনো বিধান পরিবর্তন করা যায় না।’ কথাটি শুনতে যতটা সরল, এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নটি ততটাই গভীর। কুরআনের কোনো বিধান পরিবর্তন করা যায় না—একজন মুসলমানের কাছে এটি কুরআনের সীমাবদ্ধতা নয়; বরং তার বিশ্বাস অনুযায়ী কুরআনের ঐশী ও অপরিবর্তনীয় বিধানেরই স্বীকৃতি। তাহলে সেই অপরিবর্তনীয়তাকেই যদি কুরআনের নৈতিক ও আদর্শিক মূল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—সমস্যাটি কি কুরআনে, নাকি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে? একজন মানুষ যদি সমুদ্রের বিশালতা বুঝতে না পেরে বলে, “এ সমুদ্র আমার জন্য নয়”— তাতে সমুদ্রের বিশালতা কমে যায় না। বরং সীমাবদ্ধতাটি তার নিজের উপলব্ধিতে। একইভাবে কোনো মানুষের অক্ষমতা, অনাগ্রহ কিংবা ভুল প্রয়োগ কুরআনের ন্যায়, সত্য ও মানবিকতার শিক্ষাকে অকার্যকর করে না। কুরআন নিজেই মানুষের জন্য ন্যায়বিচার ও আমানত রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিচার করবে।’ (সূরা আন-নিসা, ৪:৫৮) অন্যায়ের বিরুদ্ধেও কুরআনের অবস্থান স্পষ্ট। আল্লাহ বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার পরিত্যাগে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো; এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সূরা আল-মায়িদা, ৫:৮) তাহলে প্রশ্ন হলো—ন্যায়বিচার, আমানত, সত্যবাদিতা, জবাবদিহি, দুর্নীতিবিরোধিতা, এতিমের অধিকার, মানুষের মর্যাদা ও দুর্বলদের প্রতি দায়িত্ববোধ—এসব শিক্ষা কি কোনো সমাজের জন্য অপ্রাসঙ্গিক হতে পারে? ইতিহাসের দিকে তাকালেও বিষয়টি গভীরভাবে ভাবার মতো। যে কুরআন জাহেলিয়াতের নানা অন্যায় ও সামাজিক অবক্ষয়ের মধ্যে একটি জনগোষ্ঠীর চিন্তা, নৈতিকতা ও জীবনব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল, সেই কুরআনই মানুষের ব্যক্তিজীবন থেকে সামাজিক জীবন পর্যন্ত ন্যায় ও কল্যাণের নানা নীতি সামনে এনেছে। কুরআন মানুষকে শুধু ইবাদতের কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেখায়নি; বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, সম্পদের ব্যবহার, আমানত, বিচার, পরিবার, এতিম, দরিদ্র ও সমাজের দুর্বল মানুষের অধিকার নিয়েও নির্দেশনা দিয়েছে। তাহলে আজ প্রশ্ন উঠতেই পারে— যে কিতাব মানুষকে অন্যায় থেকে ন্যায়, জুলুম থেকে ইনসাফ এবং অন্ধকার থেকে আলোর পথে আসার আহ্বান জানায়, তার নৈতিক শিক্ষাকে আমরা কীভাবে অপ্রাসঙ্গিক বলে পাশ কাটিয়ে যেতে পারি? তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি— কুরআনকে রাষ্ট্রীয় সংবিধান বা আইনব্যবস্থার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত করা হবে, সেটি একটি জটিল আইনগত ও রাজনৈতিক প্রশ্ন। আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামো, নাগরিক অধিকার, আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে ধর্মীয় নীতির সম্পর্ক নিয়ে বিস্তর আলোচনা হতে পারে। কিন্তু সেই আলোচনা যেন কুরআনের অপরিবর্তনীয়তাকে তার অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। কারণ, অপরিবর্তনীয় হওয়া আর অপ্রাসঙ্গিক হওয়া এক বিষয় নয়। কুরআনের মূল শিক্ষা যদি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে বলে, আমানত রক্ষা করতে বলে, অন্যায় থেকে বিরত থাকতে বলে, মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করতে বলে— তাহলে আমাদের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত: আমরা নিজেরা সেই শিক্ষাগুলো কতটা ধারণ করছি? সমস্যা হয়তো কুরআনের অপরিবর্তনীয়তায় নয়; বরং কুরআনের নির্দেশনাকে নিজেদের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার আলোচনায় কতটা গুরুত্ব দিতে চাই— সেই প্রশ্নে। আজ আমাদের প্রয়োজন কুরআনকে শুধু তাকের ওপর রাখা একটি পবিত্র গ্রন্থ হিসেবে নয়, বরং বুঝে পড়ার, চিন্তা করার এবং জীবনে তার নৈতিক শিক্ষা বাস্তবায়নের কিতাব হিসেবে গ্রহণ করা। ঘরে কুরআনের শিক্ষা চাই। সমাজে কুরআনের ন্যায়বোধ চাই। রাষ্ট্রীয় জীবনে কুরআনের আমানত ও জবাবদিহির চেতনা চাই। মানুষের আচরণে কুরআনের সত্য, দয়া ও ইনসাফ চাই। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কুরআন এমন পথের নির্দেশনা দেয়, যা সবচেয়ে সঠিক।’ (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৯) তাই কুরআনকে অযোগ্য প্রমাণ করার আগে আমাদের নিজেদের দিকে তাকানো প্রয়োজন। আমরা কি কুরআনকে যথেষ্ট বুঝেছি? আমরা কি তার ন্যায়বিচার নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠা করেছি? আমরা কি তার আমানতের শিক্ষা ধারণ করেছি? আমরা কি সত্যিই কুরআনের আলোয় নিজেদের সমাজকে আলোকিত করার চেষ্টা করছি? মনে রাখা জরুরি যে, কুরআন আমাদের থেকে দূরে নয়— আমরাই কুরআন থেকে দূরে সরে গেছি। আসুন, কুরআনকে নিয়ে সংশয় নয়; কুরআনকে বুঝে জীবনে ধারণ করার সাহস করি। শুধু তিলাওয়াতে নয়, চরিত্রে কুরআনকে ধারণ করি। শুধু ঘরে নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়, সত্য, আমানত ও মানবিকতার চর্চা করি। কুরআনের আলোকে নিজেদের বদলাই। কারণ, সমাজ পরিবর্তনের প্রথম ধাপ শুরু হয় মানুষের নিজের ভেতর থেকেই। আল্লাহ আমাদের কুরআনের হক বুঝে তা হৃদয়ে ধারণ করার, তার ন্যায় ও কল্যাণের শিক্ষা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার এবং মানুষের জীবনে ন্যায়, শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন। লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও ঔপন্যাসিক আইও/ |