সৌদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ বিক্রির পরিকল্পনা কেন বিতর্কিত?
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৪২ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

সৌদি আরবের কাছে প্রায় ৫০টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। তবে এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্দরমহলে।

অত্যাধুনিক এফ-৩৫ নিয়ে  যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারছেন না মার্কিন কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য।
বিবিসি জানায়, সৌদি আরব বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার চেষ্টা করছে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। বিমানটিতে এমন প্রযুক্তি রয়েছে, যা শত্রুর রাডার ও নজরদারিব্যবস্থা এড়িয়ে চলতে সহায়তা করে।

এত দিন সৌদি আরবকে এফ-৩৫ বিক্রির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক ছিল। এর অন্যতম কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলও এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে। মার্কিন আইনে ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর তুলনায় উন্নত মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ফলে সৌদি আরবকে এফ-৩৫ দেওয়ার সিদ্ধান্তে ইসরায়েলের সামরিক সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রস্তাবিত চুক্তিটির মূল্য প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার। এখন এটি পর্যালোচনা বা আটকে দেওয়ার জন্য মার্কিন কংগ্রেসের হাতে ৩০ দিন সময় রয়েছে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের অন্যতম বড় ক্রেতা। ইলিনয়ের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রাজা কৃষ্ণমূর্তি বৃহস্পতিবার এই বিক্রির বিরোধিতা করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি চীনের নাগালের মধ্যে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

আরো কয়েকজন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা এবং কিছু মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাও সৌদি আরবকে এফ-৩৫ দেওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, সৌদি আরব ও চীনের নিরাপত্তা সহযোগিতার কারণে এফ-৩৫-এর সংবেদনশীল প্রযুক্তি চীনের হাতে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বৃহস্পতিবার চুক্তির ঘোষণা দিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, এই বিক্রি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করবে। দপ্তরের ভাষ্য, সৌদি আরব উপসাগরীয় অঞ্চলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বড় অ-মার্কিন-ন্যাটো মিত্র। এফ-৩৫ বিক্রির মাধ্যমে দেশটির নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী হবে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আরো বলেছে, প্রস্তাবিত সামরিক সরঞ্জাম ও সহায়তা বিক্রির কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্যে কোনো পরিবর্তন হবে না। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
 
গত নভেম্বরে মোহাম্মদ বিন সালমান হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে গত বছরের মে মাসে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদেও দুজনের বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠকের সময় সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১৪২ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র বিক্রির চুক্তি হয়। হোয়াইট হাউস তখন এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রির চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছিল। সৌদি আরবের জন্য সর্বশেষ প্রস্তাবিত চুক্তিতে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন এসব যুদ্ধবিমান তৈরি করে। চুক্তিটি কার্যকর হলে সৌদি আরবের কাছে থাকা এফ-৩৫-এর সংখ্যা ইসরায়েলের বর্তমান সংখ্যার সমান হবে। বর্তমানে ইসরায়েলের কাছে ৫০টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান রয়েছে।

তবে ইসরায়েলও এ সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। গত মে মাসে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, তারা আরো একটি এফ-৩৫ স্কোয়াড্রন কিনবে। জেরুজালেম পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, নতুন চুক্তি হলে ইসরায়েলের কাছে থাকা এফ-৩৫-এর সংখ্যা বেড়ে ১০০ হতে পারে। লকহিড মার্টিনের তৈরি একটি এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমানের দাম প্রায় ৮ কোটি ২৫ লাখ ডলার। সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র চুক্তি নিয়ে এর আগেও মার্কিন কংগ্রেসে প্রশ্ন উঠেছে। ২০১৮ সালে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার পর রিয়াদের সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি নিয়ে কংগ্রেসের সদস্যরা আপত্তি জানিয়েছিলেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনও সৌদি আরবকে এফ-৩৫ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেছিল। তবে তখন একটি শর্ত ছিল। এফ-৩৫ পাওয়ার আগে সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হতো। শেষ পর্যন্ত সেই কূটনৈতিক উদ্যোগ এগোয়নি।
 
এদিকে সৌদি আরব বর্তমানে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত। ইরানের সমর্থন পাওয়া এই সশস্ত্র গোষ্ঠী ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলের বড় একটি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। সম্প্রতি সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর কাছ থেকে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করেছে হুতিরা। এই পরিস্থিতিতে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর ব্যক্তিগতভাবে চাপ দিয়েছেন বলে জানিয়েছে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে সূত্র দুটি এ তথ্য জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিবিসির সংবাদমাধ্যম অংশীদার সিবিএস নিউজ। তবে সূত্রগুলোর দাবি, ট্রাম্প এখন পর্যন্ত হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক বাহিনীকে যুদ্ধে জড়াতে রাজি হননি।

এসএইচ/