
|
তাবুক অভিযান—কঠিন সময়ে ঈমান ও ত্যাগের পরীক্ষা
প্রকাশ:
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৫০ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
সন্ধ্যার নরম আলো পড়েছে উঠোনে। দাদা তার পুরোনো কাঠের চেয়ারে বসে আছেন। নাতি-নাতনিরা গোল হয়ে তাঁর চারপাশে বসেছে। আজকের গল্প শুরুর আগেই দাদা একটু হেসে বললেন, আজ তোমাদের এমন একটি অভিযানের গল্প শোনাব, যেখানে তলোয়ারের ঝনঝনানির চেয়ে বেশি ছিল ধৈর্য, কষ্ট আর আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস। ছোট্ট নাতি জিজ্ঞেস করল, দাদা, যুদ্ধে আবার যুদ্ধই হলো না? দাদা মুচকি হেসে বললেন, এই কারণেই তো তাবুকের অভিযান এত বিশেষ। শোনো তাহলে... হিজরির নবম বছর। একদিন মদিনায় খবর এলো, উত্তরের বিশাল রোমান সাম্রাজ্য মুসলিমদের বিরুদ্ধে বড় একটি বাহিনী প্রস্তুত করছে। খবর শুনে সবাই চিন্তিত হয়ে পড়ল। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বুঝলেন, শত্রুর আক্রমণের অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে না। আগে থেকেই প্রস্তুত হতে হবে। তিনি সাহাবিদের ডেকে বললেন, 'চলো, আমরা তাবুকের পথে রওনা হই।' কিন্তু এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। চারদিকে প্রচণ্ড গরম। মরুভূমির উত্তপ্ত বালু যেন আগুনের মতো জ্বলছে। সামনে অনেক দীর্ঘ পথ। পানির বড় সংকট। তার ওপর তখন খেজুর পাকার মৌসুম। মানুষ বছরের এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করত। কারণ, এটাই ছিল তাদের জীবিকার অন্যতম ভরসা। নাতনি অবাক হয়ে বলল, দাদা, এত কষ্ট জেনেও সবাই কি গিয়েছিল? দাদা বললেন, যাদের হৃদয়ে আল্লাহর ভালোবাসা ছিল, তারা দুনিয়ার লাভ-লোকসান হিসাব করেনি। সাহাবিরা যার যা ছিল, তাই নিয়ে এগিয়ে এলেন। কেউ টাকা দিলেন, কেউ উট দিলেন, কেউ ঘোড়া, কেউ আবার খাদ্য নিয়ে হাজির হলেন। দাদা একটু থেমে বললেন, জানো, এই সময় উসমান ইবনে আফফান (রা.) এমন দান করেছিলেন, যা শুনে সবাই বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল। তিনি শত শত উট, ঘোড়া এবং বিপুল সম্পদ আল্লাহর পথে দান করলেন। আর আবু বকর আস-সিদ্দীক (রা.)? তিনি নিজের প্রায় সব সম্পদ নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে হাজির হলেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, "পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ?" তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন, "আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকেই রেখে এসেছি।" উমর ইবন আল-খাত্তাব (রা.) নিজের সম্পদের অর্ধেক দান করলেন। তিনি ভেবেছিলেন, আজ হয়তো দানের ক্ষেত্রে আবু বকর (রা.)-কে ছাড়িয়ে যাবেন। কিন্তু শেষে বুঝলেন, আবু বকর (রা.)-এর ঈমান ও ত্যাগ সত্যিই ছিল অনন্য। এদিকে কিছু দরিদ্র সাহাবিও অভিযানে যেতে চাইলেন। কিন্তু তাদের কাছে কোনো উট বা বাহন ছিল না। তারা রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের জন্য যদি কোনো বাহনের ব্যবস্থা হতো, তাহলে আমরাও যেতাম।" কিন্তু তখন সত্যিই আর কোনো বাহন অবশিষ্ট ছিল না। হতাশ হয়ে তাঁরা ফিরে গেলেন। তাদের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। যুদ্ধ থেকে ভয়ে নয়, বরং আল্লাহর পথে যেতে না পারার কষ্টে তারা কাঁদছিলেন। দাদা আবেগভরা কণ্ঠে বললেন, এই আন্তরিক মানুষগুলোর কথা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে স্মরণ করেছেন। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, মানুষের সাধ্যের বাইরে তিনি কোনো দায়িত্ব দেন না। সবাই কিন্তু এমন ছিল না। কিছু মুনাফিক নানা অজুহাত বানাতে শুরু করল। কেউ বলল, "এত গরমে যাওয়া সম্ভব নয়।" কেউ আবার ঘরে বসেই রয়ে গেল। তারা মনে করেছিল, অজুহাত দিলেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের এই দুর্বল ঈমানের সমালোচনা করলেন এবং সত্যিকারের মুমিনদের ধৈর্য ও ত্যাগের প্রশংসা করলেন। অবশেষে প্রায় ত্রিশ হাজার সাহাবিকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তাবুকে পৌঁছালেন। সবাই প্রস্তুত। যদি যুদ্ধ হয়, তাহলে তারা আল্লাহর পথে জীবন দিতেও প্রস্তুত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, রোমান বাহিনী আর সামনে এল না। নাতি অবাক হয়ে বলল, তাহলে যুদ্ধ হলো না? দাদা হেসে বললেন, না, বড় কোনো যুদ্ধ হয়নি। কখনো কখনো যুদ্ধ না হয়েও বড় বিজয় আসে। মুসলিমদের এত বড় ও সুসংগঠিত বাহিনী দেখে শত্রুরা ভয় পেয়ে গেল। তারা বুঝে গেল, মুসলিমদের সঙ্গে লড়াই করা এত সহজ নয়। এই অভিযানের পর আরবজুড়ে ইসলামী রাষ্ট্রের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পেল। অনেক গোত্র মুসলিমদের শক্তি ও ঐক্য দেখে তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে আগ্রহী হলো। দাদা গল্প শেষ করে নাতি-নাতনিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখো, তাবুকের অভিযান আমাদের শেখায়, ঈমানের আসল পরীক্ষা সুখের দিনে নয়; কঠিন সময়ে। যখন গরমে কষ্ট হয়, যখন ত্যাগ করতে হয়, যখন নিজের আরাম ছেড়ে আল্লাহর পথে এগিয়ে যেতে হয়— তখনই বোঝা যায় কার ঈমান কতটা দৃঢ়। আল্লাহর পথে করা কোনো ত্যাগ কখনো হারিয়ে যায় না। মানুষ ভুলে যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহ কখনো ভুলে যান না। আর যারা তাঁর ওপর ভরসা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে তিনি উত্তম প্রতিদান প্রস্তুত করে রাখেন। নাতি-নাতনিরা চুপচাপ বসে রইল। তাদের মনে তখন একটাই কথা ঘুরছিল— সত্যিকারের সাহস মানে শুধু যুদ্ধ করা নয়, বরং আল্লাহর জন্য কঠিন সময়েও অবিচল থাকা। দাদা বললেন, চলো, আজ ওঠা যাক। আগামীকালও গল্প হবে, আড্ডা হবে। নবী জীবনের বাস্তব গল্প জানা হবে। গল্পে গল্পে প্রিয় নবীজি (পর্ব: ২৬) লেখক: আকিদুল ইসলাম সাদী চলবে.... আইও/ |