
|
ইলম, আমল ও সমাজসংস্কারে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এনায়েতুল্লাহ বদরপুরী (রহ.)
প্রকাশ:
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:০৯ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| মাওলানা মুহাম্মাদ বুরহানুদ্দীন বিন সা‘দ || মানুষ পৃথিবীতে আসে এবং সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়। তবে কিছু মানুষ ব্যতিক্রম-তাঁরা শুধু নিজের জীবনকেই আলোকিত করেন না। তাঁদের ইলম, আমল, আদর্শ ও কর্মের আলোয় আলোকিত হয় একটি জনপদ, একটি সমাজ; কখনোবা প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তাঁরা দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেও তাঁদের চিন্তা-চেতনা, শিক্ষা ও আদর্শ মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। আল্লামা এনায়েতুল্লাহ বদরপুরী রহ. ছিলেন তেমনই একজন আলোকিত মনীষী। তিনি ছিলেন দক্ষিণ কুমিল্লার গর্ব, অসংখ্য আলেমের উস্তাদ, দক্ষ শিক্ষক, প্রাজ্ঞ সমাজসংস্কারক এবং বাতিল ও ইসলামবিরোধী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে আপসহীন এক সাহসী আলেমে দ্বীন। তাঁর জীবন ছিল ইলম, আমল, ত্যাগ, সাহসিকতা ও সমাজকল্যাণের এক অনন্য সমন্বয়। আজও নাঙ্গলকোটের মানুষের মুখে ‘বদরপুরের বড় হুজুর’ নামটি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। মৃত্যুর বহু বছর পরও তাঁর স্মৃতি মানুষের হৃদয়ে অম্লান। এটাই তাঁর জীবনের প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম প্রমাণ। আলেম পরিবারে জন্ম আল্লামা এনায়েতুল্লাহ রহ. আনুমানিক ১৯১৯ সালে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট থানাধীন ঢালুয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বদরপুর গ্রামের উলামা বাড়ির এক সম্ভ্রান্ত আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন হযরত মাওলানা রহমতুল্লাহ রহ.। নাঙ্গলকোট অঞ্চলে তিনি ‘বদরপুরের বড় হুজুর’ নামে সুপরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর সুযোগ্য সন্তান আল্লামা এনায়েতুল্লাহ রহ.-ও একই নামে মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করেন। মাওলানা রহমতুল্লাহ রহ.-এর ৮ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে জ্যেষ্ঠ সন্তান ছিলেন আল্লামা এনায়েতুল্লাহ রহ.। তাঁর অন্যান্য ভাইদের মধ্যেও অনেকেই ছিলেন হাফেজ ও আলেম। বদরপুরের উলামা বাড়ি নাঙ্গলকোটের একটি ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি পরিবার। যুগ যুগ ধরে এ পরিবারে বহু হাফেজ, আলেম ও দ্বীনের খাদেম জন্মগ্রহণ করেছেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই আল্লামা এনায়েতুল্লাহ রহ. একটি সমৃদ্ধ দ্বীনি আবহে বেড়ে ওঠার সুযোগ পান। জ্ঞানার্জনের দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা শৈশবেই তাঁর অন্তরে ইলম ও আমলের প্রতি গভীর অনুরাগ সৃষ্টি হয়। ঢালুয়া রহমতিয়া সিনিয়র মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর উচ্চতর জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে তিনি ঢাকার আলিয়ায় গমন করেন। সেখানে তৎকালীন বহু খ্যাতিমান উলামায়ে কেরামের শিষ্যত্ব লাভ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য উস্তাদদের মধ্যে ছিলেন আল্লামা জাফর আহমদ উসমানী রহ., মাওলানা আমীমুল ইহসান মুজাদ্দেদী রহ., মাওলানা দ্বীন মুহাম্মদ খান রহ. এবং মাওলানা আবদুর রহমান কাশগরী রহ.-এর মতো খ্যাতিমান মনীষীগণ। এসব বরেণ্য আলেমের সান্নিধ্য ও শিষ্যত্ব তাঁর জ্ঞানজগৎকে সমৃদ্ধ করে এবং পরবর্তী জীবনে তাঁর ইলমি ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষকতা ও কর্মজীবন ইলম অর্জনের পর তিনি নিজেকে ইলমে দ্বীনের খেদমতে নিয়োজিত করেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের একাধিক দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি ঐতিহ্যবাহী ঢালুয়া রহমতিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন। একজন দক্ষ শিক্ষক হিসেবে যেমন তিনি ছাত্রদের মাঝে জনপ্রিয় ছিলেন, তেমনি একজন প্রশাসক হিসেবেও তাঁর দক্ষতা ছিল প্রশংসনীয়। তাঁর যোগ্যতা ও প্রশাসনিক দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে ছারছীনার পীর হযরত মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ রহ. তাঁকে ছারছীনা দ্বীনিয়া মাদরাসার ‘মুদীর’ পদে নিয়োগ দেন। আমৃত্যু তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করেন। ইলমি মাকাম আল্লামা এনায়েতুল্লাহ রহ.-এর ইলমি মাকাম ছিল অত্যন্ত উচ্চ। তিনি শুধু একজন শিক্ষকই ছিলেন না; বরং সমকালীন বহু আলেমের কাছে ছিলেন ইলমি পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিত্ব। তৎকালীন এ অঞ্চলের বহু উলামায়ে কেরাম—বিশেষত ফেনীর শর্শদি দারুল উলূম মাদরাসা, ফেনী জামিয়া ইসলামিয়া, চৌদ্দগ্রামের নানানকরা মাদরাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞ আলেমগণ—বিভিন্ন ইলমি বিষয়ে তাঁর শরণাপন্ন হতেন এবং তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করতেন। লেখনী ও ইলমি অবদান আল্লামা এনায়েতুল্লাহ রহ. ছিলেন একজন দক্ষ লেখকও। ইলমে নাহু বিষয়ে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কিতাব রচনা করেন। এ ছাড়া আরবি ইনশা বিষয়েও তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ছিল, যা তৎকালীন বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মাদরাসার গণ্ডি পেরিয়ে সমাজসংস্কারের ময়দানে আল্লামা এনায়েতুল্লাহ রহ.-এর জীবন শুধু মাদরাসার চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন যুগসচেতন ও সমাজসংস্কারমুখী একজন আলেম। সমাজে কোনো ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড, অশ্লীলতা কিংবা অনৈতিকতার বিস্তার ঘটলে তিনি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতেন না। দৃঢ় মনোবল ও অসীম সাহস নিয়ে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমে পড়তেন। তাঁর নেতৃত্বে নাঙ্গলকোট অঞ্চলে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ১৯৯৩ সালে নাস্তিক তসলিমা নাসরিনকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, নাঙ্গলকোট থানায় তিনি সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এ সময় তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। কিন্তু তা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি; বরং আরও সাহসিকতার সঙ্গে তিনি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ঢালুয়ার ঠান্ডাবাডি কালীমন্দিরে দীর্ঘদিন ধরে পূজা ও বার্ষিক মেলার আয়োজন হয়ে আসছিল। এর বিরুদ্ধে তিনি শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন এবং আন্দোলন গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে তাঁর আন্দোলনের মুখে সেই বছর মেলা বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া ঢালুয়া কলেজ মাঠে সার্কাসের নামে গান-বাজনা ও অশ্লীল বিনোদনের আয়োজনের জন্য একটি নাচঘর নির্মাণ করা হলে তিনি এর বিরুদ্ধেও প্রতিবাদে সোচ্চার হন। তাঁর নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত নাচঘরটি অপসারণ করতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়। রেখে গেছেন এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার আল্লামা এনায়েতুল্লাহ রহ. মৃত্যুকালে স্ত্রী, ৩ ছেলে ও ৬ মেয়ে রেখে যান। আলহামদুলিল্লাহ, তাঁর সন্তান-সন্ততি, জামাতা, নাতি-নাতনি ও তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম ইলম ও দ্বীনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে খেদমত করে যাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন হাফেজ, আলেম, মুফতি, মুহাদ্দিস, লেখক, গবেষক, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক এবং বিভিন্ন দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও খাদেম। তাঁর স্মৃতি ও দ্বীনি উত্তরাধিকারকে ধারণ করে তাঁর পরিবার প্রতিষ্ঠা করেছে ‘আল্লামা এনায়েতুল্লাহ রহ. ফাউন্ডেশন’ এবং ‘ঢালুয়া এনায়েতিয়া তাখসিসি মাদরাসা’। এভাবেই তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম ইলম, আমল, তাকওয়া, পরহেজগারি ও দ্বীনি খেদমতের ধারাকে অব্যাহত রাখছে। এটি যেন এক জীবন্ত ‘শাজারায়ে তাইয়্যিবাহ’র উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত—যার শিকড় অতীতে প্রোথিত, আর যার শাখা-প্রশাখা চারদিকে বিস্তৃত। ইন্তেকাল দীর্ঘ কর্মময় জীবন শেষে ১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর, বুধবার, আল্লামা এনায়েতুল্লাহ রহ. ইন্তেকাল করেন। إنا لله وإنا إليه راجعون তাঁর ইন্তেকালের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাঙ্গলকোটসহ আশপাশের এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। হাজারো ছাত্র, আলেম, ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁদের প্রিয় উস্তাদ ও অভিভাবককে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। ইন্তেকালের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। ঢালুয়া রহমতিয়া মাদরাসার বিশাল মাঠে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় হাজার হাজার উলামায়ে কেরাম ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। তাঁরই সুযোগ্য সাহেবজাদা হাফেজ মাওলানা আবুল খায়ের দা.বা. জানাজার ইমামতি করেন। পরে তাঁকে তাঁর বাড়িসংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। স্মৃতিতে অমর এক মহাপুরুষ আল্লামা এনায়েতুল্লাহ বদরপুরী রহ.-এর জীবন ছিল ইলম, আমল, সাহসিকতা, সমাজসংস্কার ও দ্বীনি খেদমতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন অসংখ্য ছাত্র, গড়ে তুলেছেন এক বিশাল ইলমি উত্তরাধিকার এবং রেখে গেছেন এমন এক পরিবার, যারা আজও বিভিন্ন অঙ্গনে দ্বীনের খেদমত করে চলেছেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, একজন আলেম কেবল মাদরাসার দরসগাহে সীমাবদ্ধ থাকবেন না। বরং সমাজের নৈতিক ও ধর্মীয় পরিবেশ রক্ষায়ও তাঁর ভূমিকা থাকবে। ইলমের সঙ্গে আমল, আমলের সঙ্গে দাওয়াত এবং দাওয়াতের সঙ্গে সমাজসংস্কার। তাঁর জীবন যেন এ সমন্বিত আদর্শেরই এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। আজও নাঙ্গলকোটের মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয় ‘বদরপুরের বড় হুজুর’। সময়ের ব্যবধান তাঁর স্মৃতিকে ম্লান করতে পারেনি। বরং তাঁর ছাত্র-সন্তান-উত্তরসূরিদের দ্বীনি খেদমতের মাধ্যমে তাঁর কর্মের আলো আজও ছড়িয়ে পড়ছে। লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল ঈমান (বেগম মসজিদ কমপ্লেক্স), সদর, চাঁদপুর। আইও/ |