
|
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী ও কিছু কথা
প্রকাশ:
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:৫৫ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
মুফতি ইউসুফ সুলতান সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে ১২২A ও ১২২B ধারা সংযোজনের বিলটি সংসদে উত্থাপনের আগে মতামতের জন্য হাতে এসেছিল। সঙ্গে এই সংযোজনের পক্ষে একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনাও যুক্ত ছিল। বিষয়টি সংক্ষেপে এই - একজন পিতা তাঁর মৃত্যুর আগেই সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেবেন, কিন্তু আমৃত্যু তিনি নিজেই তা ভোগ করতে পারবেন। সন্তান তাঁর সেই ভোগাধিকার কেড়ে নিতে পারবে না। অন্যদিকে সন্তানের মৃত্যু হলে তার উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তি হিসেবে সেটি পেয়ে যাবে। একইভাবে স্বামী ও স্ত্রী পরস্পরের সঙ্গে, এবং সন্তান থেকে পিতামাতার দিকেও এই ব্যবস্থা করা যাবে। এ বিষয়ে কয়েকটি পয়েন্টে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ শেয়ার করছি। ⁍ ⁍ এক, বিষয়টি মীরাসের নীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত আল কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা উত্তরাধিকার বণ্টনের নীতিমালা বিশদভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। মানুষের মধ্যে দুনিয়াবি ঝামেলা সবচেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা এখানেই, সম্ভবত এটিও একটি কারণ। যেহেতু এগুলো কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বিবৃত, তাই এখানে ইজতিহাদ ও নতুন গবেষণার সুযোগ একেবারেই সীমিত। সেই বিবেচনায় এই বিষয়টিকে আমাদের অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে দেখতে হবে। এটি সাধারণ হেবার মতো কোনো বিষয় নয়। ⁍ ⁍ দুই, ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে দুটি প্রশ্ন প্রথম প্রশ্ন, হেবা বা দানের সঙ্গে এ ধরনের শর্ত যুক্ত করা যায় কি না। আলোচ্য ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, দাতা দান করবেন কিন্তু ভোগদখল নিজের কাছে সংরক্ষণ করবেন। অর্থাৎ দানের সঙ্গে একটি শর্ত যুক্ত হচ্ছে। চার মাযহাব ঘেঁটে মোটা দাগে যা পাওয়া যায় তা হলো, এ ধরনের শর্ত হয় বাতিল, নয়তো মুফসিদ। এর ফলাফল হলো, শর্ত বাদ হয়ে যাবে কিন্তু দান বহাল থাকবে, অর্থাৎ দান পুরোপুরি কার্যকর হবে আর শর্তটি কার্যকর হবে না। কোনো কোনো মাযহাবে আবার দানটিও বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ যে নিরাপত্তা দাতাকে দেওয়ার জন্য এই ব্যবস্থা, সেই শর্তটিই ফিকহি বিচারে টিকছে না। হাম্বলি মাযহাব থেকে একটি মত উদ্ধৃত হয় যে, দানকৃত বস্তুর মানফাআত নির্দিষ্ট ও জ্ঞাত মেয়াদের জন্য সংরক্ষণ করার শর্ত করা যায়। তবে এই মতের মূল ক্রয়বিক্রয়ের মাসআলায়, বিক্রেতার শ্রম ও সেবা সংক্রান্ত। তাছাড়া দাতার অবশিষ্ট জীবনকাল জ্ঞাত মেয়াদ নয়। দ্বিতীয় প্রশ্ন, কবয বা অধিগ্রহণের শর্ত। হানাফি মাযহাবে হেবা সহিহ হওয়ার জন্যই কবয শর্ত। অন্য মাযহাবগুলোতেও হেবা পূর্ণ হওয়ার জন্য, মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য কিংবা লুযূমের জন্য কবয শর্ত। তাহলে মোটা দাগে সব মাযহাবেই কবযের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং কবয বা অধিগ্রহণ ছাড়া হেবা সম্পন্ন হয়েছে এ কথা বলা মুশকিল। এখন প্রশ্ন হলো, কী ধরনের কবয প্রয়োজন। কবযের মূল বিষয়টি হলো, ব্যক্তি যেন সত্যিকার অর্থে সেটির উপর নিজের দখল বুঝে নিতে পারেন। আধুনিক ইসলামি ফিন্যান্স নিয়ে কাজ করার সুবাদে আমরা জানি, কবযে হাকিকি ও কবযে হুকমি, অর্থাৎ actual possession ও constructive possession নামে দুই ধরনের অধিগ্রহণের কথা AAOIFI ও অন্যান্য রেজুলেশনে বলা হয়। প্রথমটি হলো শারীরিকভাবে প্রকৃত দখল নেওয়া। আর দ্বিতীয়টি হলো শারীরিকভাবে দখল না নিলেও দলিল দস্তাবেজ এমনভাবে বুঝে নেওয়া যে সেই ডকুমেন্ট দিয়ে তিনি চাইলেই যেকোনো সময় প্রকৃত দখল নিতে পারেন। বিল উত্থাপনের পেছনের পর্যালোচনায় কবযে হুকমির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ যাঁকে দান করা হচ্ছে তিনি প্রথমে constructive possession নেবেন, এরপর পিতার মৃত্যুর পর তাঁর actual possession হবে। এখানে দুটি কথা বলার আছে। প্রথমত, হেবার ক্ষেত্রে constructive possession স্বীকার করে নেওয়াটাই বেশ জটিল। কারণ আগেই বলেছি, হেবার জন্য কবয বা হাওযের শর্তের উপর নানা কারণে অনেক বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মীরাসের সঙ্গে সম্পর্কিত সম্পদে যখন হেবা করা হচ্ছে, তখন বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কবয অসম্পূর্ণ থাকলে আমরা একে হেবা হিসেবে স্বীকার করতে পারব না, আর হেবা স্বীকার না করলে সেটি মীরাসের সম্পদে পরিণত হবে। তখন জটিলতা আরও বাড়বে। দ্বিতীয়ত, ধরা যাক আমরা কবযে হুকমি ধরে নিলাম। স্থাবর সম্পত্তিতে কবয কীভাবে হয়, AAOIFI স্ট্যান্ডার্ডে তা বলা হয়েছে। কবযে হাকিকির সংজ্ঞা হলো তাখলিয়া এবং তাতে লেনদেনে সক্ষম করে দেওয়া (শরিয়াহ স্ট্যান্ডার্ড ১৮, ধারা ৩/২)। আর কবযে হুকমি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, স্থাবর সম্পত্তি খালি করে গ্রহীতার হাতে ছেড়ে দিলে কবয হতে পারে, কিন্তু গ্রহীতা যদি সেটির উপর তাসাররুফ করতে না পারেন, তাহলে খালি করে দেওয়াটাও কবয বলে গণ্য হবে না (শরিয়াহ স্ট্যান্ডার্ড ৮, ধারা ৩/২/৩)। আলোচ্য প্রস্তাবে দুটির একটিও ঘটছে না। দাতা ছাড়ছেন না, আর গ্রহীতাকে কোনো তাসাররুফে সক্ষমও করা হচ্ছে না। বরং ধারা ১২২A(৩) অনুযায়ী দাতার ভোগাধিকার সম্পত্তির সঙ্গে লেগে থাকবে, ফলে গ্রহীতা কাগজে কলমেও এর উপর স্বাধীনভাবে লেনদেন করতে পারছেন না। এখানে আরেকটি মূলনীতিও প্রাসঙ্গিক। কবয শর্ত করার উদ্দেশ্যই হলো ঝুঁকির স্থানান্তর (ধারা ৩/২/২)। এখানে কোনো ঝুঁকিই স্থানান্তরিত হচ্ছে না। সব ঝুঁকি ও সব উপকার দাতার কাছেই থেকে যাচ্ছে, গ্রহীতার হাতে থাকছে কেবল একটি নিবন্ধিত কাগজ, যার অর্থনৈতিক বাস্তবতা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শূন্য। ফলে এটি এমন একটি হেবা যেখানে কোনোভাবেই কোনো অধিগ্রহণ ঘটছে না। সুতরাং হেবা পরিপূর্ণ হচ্ছে, এ কথা বলার সুযোগ থাকছে না। ⁍ ⁍ তিন, একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন এই সংযোজনে বলা হয়েছে, দানকারীর জন্য আজীবন ভোগদখল থাকবে, আবার যাঁকে দেওয়া হয়েছে তিনি এর মালিক হবেন। কিন্তু মালিক হওয়ার পর তাঁর হাক্কুত তাসাররুফ, অর্থাৎ মালিকানার যে অধিকারগুলো, যেমন অন্য কারও কাছে বিক্রি করা বা অন্য কাউকে হেবা করা, সেই সুযোগ থাকবে কি না, এ বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। এটি পরবর্তীতে আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। কারণ তিনি যদি তাঁর অধিকার প্রয়োগ করেন, তখন যাঁর জন্য ভোগাধিকার আলাদা করে রাখা হয়েছিল, তাঁর কী হবে? ধারাগুলোর মধ্যে এর উত্তর আমি পাইনি। ⁍ ⁍ চার, যে উদাহরণগুলো টানা হয়েছে পর্যালোচনায় কিছু উদাহরণ আনা হয়েছে যেখানে ভোগাধিকারকে আলাদা করে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যেমন হিবা উমরা। কিন্তু হিবা উমরার ব্যাপারটি সম্পূর্ণ উল্টো। সেখানে দাতা কাউকে দান করে বলে দেন, তোমার মৃত্যু পর্যন্ত তুমি এটি ভোগ করতে পারবে, তারপর এটি আমার কাছে ফিরে আসবে। অর্থাৎ সেখানে দাতা ভোগাধিকার ছেড়ে দিয়ে মূল স্বত্ব নিজের কাছে রাখতে চাইছেন, আর আমাদের আলোচ্য ক্ষেত্রে ঘটছে ঠিক তার উল্টো, মূল স্বত্ব ছেড়ে দিয়ে ভোগাধিকার রেখে দেওয়া। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। উমরার এই ফিরে আসার শর্তটি নিয়েও মাযহাবগুলোর মধ্যে মতভেদ আছে। মালিকি মাযহাবে সম্পত্তি দাতার কাছে ফিরে আসে, কিন্তু হানাফি, শাফিয়ি ও হাম্বলি মাযহাবে শর্তটি বাতিল হয়ে যায় এবং সম্পত্তি গ্রহীতার ওয়ারিসদের কাছেই থেকে যায়। মালয়েশিয়ার যে উদাহরণ নেওয়া হয়েছে, সেটিও ভিন্ন। সেখানে মূলত হেবা সম্পন্ন হওয়ার পর সম্পত্তিটি একটি ট্রাস্টে রাখা হয়, এবং সেই ট্রাস্টের সুবাদে দাতা অনেকটা ট্রাস্টির মতো করে তা ভোগ করেন। এই ব্যবস্থাতেও শরিয়াহর দিক থেকে কিছু ইস্যু রয়েছে, যেগুলো আইনি কাঠামোয় ঠিক করে নিতে হয়। তবে এটি একটি পদ্ধতি বটে, আর আমাদের প্রস্তাবিত ধারা সেই পদ্ধতি নয়। ⁍ ⁍ পাঁচ, প্রয়োজনটির বাস্তবতা আছে কি? এই ধরনের বিল প্রস্তাব করার একটি কারণ হতে পারে মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টনের জটিলতা। মালয়েশিয়ায় থাকার সুবাদে এবং সেখানে শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি পরিচালনার সুবাদে বিভিন্ন ওয়াসিয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার এবং গবেষণায় অংশ নেওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। মৃত্যু পরবর্তী সম্পত্তি বণ্টনের আধুনিক সমস্যা ও সমাধান নিয়ে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি কাজ হয়েছে মালয়েশিয়াতেই। সেখানে সারা বছরজুড়ে এ বিষয়ে নানা কনফারেন্স হয়, পেপার প্রকাশিত হয়। কাজেই বিষয়টি যে জটিল, তাতে সন্দেহ নেই। তবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, মুসলিমদের জন্য এটি এতটা জটিল হওয়ার কথা ছিল না। কারণ ইসলামে সম্পত্তি বণ্টনের বিষয়গুলো অত্যন্ত সুন্দরভাবে ও সবিস্তারে বলে দেওয়া হয়েছে। অন্য ধর্মে উত্তরাধিকার নিয়ে কিছু বিধান পাওয়া গেলেও কুরআনে যেভাবে হিস্যা ধরে ধরে, ওয়ারিসদের স্তরবিন্যাসসহ একটি পূর্ণাঙ্গ বণ্টনব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে, তার তুলনা নেই। অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে বিস্তারিত কাঠামোটা যুগে যুগে মানুষই তৈরি করেছে, জটিলতায় পড়েছে, সংশোধন করেছে, আপডেট করেছে। আমাদের ক্ষেত্রে যেহেতু কুরআনেই বলে দেওয়া হয়েছে, তাই এখানে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে বরং যা করা যায় তা হলো প্রক্রিয়াটিকে সহজ করা। বণ্টন যেন দীর্ঘায়িত না হয়, কেউ যেন বিলম্ব না করে, এবং যাঁদের হক নষ্ট হচ্ছে, যেমন বোনের হক, ফুফুর হক, সেগুলো যেন ঠিকমতো আদায় হয়। এর জন্য একদিকে দরকার ওয়াজ ও নসিহত, অন্যদিকে দরকার আইনি অবকাঠামোর সংস্কার। পাশাপাশি জমি-জমার রেজিস্ট্রেশন, খারিজ ইত্যাদি বিষয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরী। ⁍ ⁍ ছয়, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা ১৯৬১ সনে মুসলিম পারিবারিক আইনে উত্তরাধিকার বিষয়ে আইয়ুব খানের সংশোধনী বরং সমস্যা আরও বাড়িয়েছে। ফতোয়া বিভাগগুলোতে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা জানেন, সেই সংশোধনীতে আসা বেশ কিছু জটিলতার কারণে বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশের আইন এবং ফতোয়া বিভাগগুলোর ফতোয়ার মধ্যে একটি বিরোধ তৈরি হয়ে আছে। এটিও আমাদের একটি সামাজিক সমস্যার কারণ। আশঙ্কা হলো, নতুন এই সংশোধনীর মাধ্যমে আইন ও ফতোয়ার মাঝে আরেকটি দ্বৈততার দুয়ার খুলে যাবে। ⁍ ⁍ শেষ কথা সব মিলিয়ে আমরা পরামর্শ দিয়েছিলাম, বিষয়টিতে তাড়াহুড়া না করে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ, বিভিন্ন দারুল ইফতা এবং বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করে জটিলতাগুলো নিরসন করা হোক। প্রয়োজনটি হয়ত কিছুটা বাস্তব। কিন্তু আমি মনে করি, এর পদ্ধতিটি সঠিক হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে এটি বাংলাদেশের ফতোয়া বিভাগগুলোর সঙ্গে, এমনকি আইনি অবকাঠামোর ভেতরেও ঝামেলা তৈরি করতে পারে। লেখক: আলেম স্কলার ও ইসলামি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ আরএইচ/ |