ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের প্রয়োজন
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:৫৮ সকাল
নিউজ ডেস্ক

|| মুফতি ইউসুফ সুলতান ||

সম্প্রতি বাংলাদেশের ধর্মীয় আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে বেশ কিছু নেতিবাচক সংবাদ সামনে আসছে, যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। এ বিষয়ে আমার উপলব্ধি শেয়ার করছি।
অপরাধী যেই হোক না কেন, যেখানেই থাকুক না কেন, তার সাথে আচরণ অপরাধী হিসেবেই হওয়া জরুরি। একটু কমও নয়, বেশিও নয়। এ ব্যাপারে আমি সবসময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুটো হাদীস মাথায় রাখি।

এক: 
বনু মাখযুমের এক মহিলার চুরির ঘটনায় তার পক্ষে সুপারিশ আসার পর তিনি একটি যুগান্তকারী খুতবা দেন:
«أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ، وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ، وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا»
“হে লোকসকল! তোমাদের পূর্বের লোকেরা ধ্বংস হয়েছিল এ কারণেই যে, তাদের মধ্যে উঁচু মর্যাদার কেউ চুরি করলে তারা তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল অবস্থানের কেউ চুরি করলে তার উপর নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর করত। আল্লাহর কসম, মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমা যদি চুরি করত, আমি তার হাত কেটে দিতাম।”  সূত্র: সহীহ মুসলিম, ১৬৮৮; সহীহ বুখারী, ৩৪৭৫ ও ৬৭৮৮।

দুই:
«لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلَا يَسْرِقُ السَّارِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ»
“একজন জিনাকারী যখন জিনা করে, সে সময় সে মুমিন থাকে না; আর একজন চোর যখন চুরি করে, সে সময় সে মুমিন থাকে না।”  সূত্র: সহীহ বুখারী, ২৪৭৫; সহীহ মুসলিম, ৫৭।

এ হাদীসের মূল ব্যাখ্যা হলো, সে সময় ব্যক্তির পরিপূর্ণ ঈমান থাকে না। তবে আরেকটা দিক আমার সবসময় মনে হয়। তা হলো, একজন চোরের পরিচয়ে সে চোর। একজন জিনাকারীর পরিচয়ে সে জিনাকারী। সে মুমিন কিনা, সেই পরিচয়টা তার অপরাধ বিবেচনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

কাজেই একজন অপরাধী যদি আমার খুব কাছেরও হয়, আমার প্রতিষ্ঠানের হয়, আমার আত্মীয় হয়, আমার দলের হয়, সংগঠনের হয়, এলাকার হয়, অপরাধের বিচারের জায়গা থেকে তার ব্যাপারে কোনো রকম নমনীয়তা রাখার শরীয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে সেই অপরাধ যদি কারো হক বিনষ্টের হয়। উদাহরণস্বরূপ, কারো সম্পদ চুরি করা, আত্মসাৎ করা, কিংবা কারো ইজ্জত, সম্মান, আব্রু নষ্ট করা।

আবাসিক প্রতিষ্ঠান, তা যেকোনো ধর্মেরই হোক, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে পুরো বিশ্বেই নানারকম কলঙ্কজনক ঘটনার খবর পাওয়া যায়। এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানারকম আচরণবিধি, পরিচালনা কাঠামো, তদারকি নির্দেশিকা ও মানদণ্ডের কথা আমরা দেখতে পাই।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সব রকম শিক্ষা ব্যবস্থার নিজস্ব বোর্ড আছে। কিন্তু তাদের মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে শিক্ষার মান উন্নয়ন, কারিকুলাম, পরীক্ষা গ্রহণ, ফলাফল প্রদান এবং সার্টিফিকেট প্রদান। তবে আইন প্রয়োগের জায়গা থেকে তেমন কোনো ক্ষমতা না থাকায়, এ ধরনের বোর্ড থেকে অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা আশা করা একটা অবাস্তব প্রত্যাশা।

এক্ষেত্রে বরং যেটা করা দরকার বলে আমি মনে করি, তা হলো বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত সবগুলো প্রতিষ্ঠানকে একটি অভিন্ন আচরণবিধির আওতায় নিয়ে আসা। সেই বিষয়ে তাদেরকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়া, তাদের কাছ থেকে বার্ষিক প্রতিবেদন নেয়া।
কিন্তু এরপরেও অপরাধ হতে পারে। একদিকে যেমন নির্দেশিকা, আচরণবিধি, ওয়াজ, নসিহত এগুলো থাকবে, অন্যদিকে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীকে যদি অবাধে ছাড় দেয়া হয়, সহজে বের হয়ে আসার উপায় দেয়া হয়, তাহলে সেটা অপরাধকে এবং অপরাধীকে সমর্থন করার সমতুল্য বলে মনে করি।
আর তা যদি হয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে, তাহলে সেটা মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসকে প্রচণ্ডভাবে নষ্ট করতে পারে।

কাজেই আমার পরামর্শ:

১. শিক্ষা বোর্ড হিসেবে তাদের নথিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি অভিন্ন আচরণবিধি রাখা উচিত। সেই আচরণবিধি ভাঙলে তাদের অনুমোদন অথবা বোর্ডের স্বীকৃতি বাতিল করা হবে, এবং এ বিষয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন জমা নেয়া ও অন্যান্য কার্যক্রম থাকা উচিত।

২. সকল অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত এবং অপরাধের যে শাস্তি, তা অবশ্যই নিশ্চিত করা উচিত। সে যে কেউ হোক না কেন। অপরাধী হলে তাকে অবশ্যই দেশীয় আইনের দ্বারস্থ করা এবং অপরাধ প্রমাণে তার শাস্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা উচিত। কোনোভাবেই তাকে “নিরাপদ প্রস্থান” দেওয়ার সুযোগ নেই।

এসএইচ/