
|
সংস্কৃতিচর্চার অধিকার আছে কিন্তু ধর্মচর্চার অধিকার কই?
প্রকাশ:
৩১ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:১৪ সকাল
নিউজ ডেস্ক |
মুফতি এনায়েতুল্লাহ শুধ ব্রাহ্মণবাড়িয়া নয়, বলতে গেলে সারাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ জিম্মি এক শ্রেণির সাংস্কৃতিককর্মীদের কাছে। তারা সংস্কৃতিচর্চার নামে যা করবে, তা করতে দিতে হবে। না হলে দেশ গেলো, উন্নয়ন গেলো, জাত গেলো- রব তুলে সব একাকার করে ফেলবে। চিহ্নিত পত্রিকাগুলোর কলাম, সম্পাদকীয় কলাম, সংবাদ বিশ্লেষণ আর টক শোতে তাদের আলোচনা শুনলে মনে হবে, এদেশে ধর্মচর্চা মনে হয় অপরাধ। ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা বলা গুরুতর অন্যায়। অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তাদের কাছে সংস্কৃতিচর্চার অধিকার আছে কিন্তু ধর্মচর্চার অধিকার নেই। এটা ঠিক যে, সংস্কৃতি ও ধর্ম এক বিষয় নয়। ধর্মভেদে সংস্কৃতি ভিন্ন হবে, এটাই স্বাভাবিক। এই ভিন্নতাকে ভুলে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের সংস্কৃতিকে ক্ষেত্রবিশেষ বাঙালি সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দেওয়ার রীতি চলছে আমাদের সমাজে। কেওয়াজের শুরু এখানেই। শুরু থেকেই এই রীতি ও প্রবণতার বিরুদ্ধে কথা বলে আসছেন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা। তাদের প্রতিবাদের মুখে সংস্কৃতি চর্চার পথকে সুগম করতে যুগ যুগ ধরে ধর্ম নিয়ে অতিরঞ্জিত বাড়াবাড়ি, ধর্মের কুসংস্কার ও ধর্মীয় আধিপত্যবাদের কথা বলা হচ্ছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে। যেমন- বিভিন্ন মাজারে হামলা, নৌকা বাইচ ও সিনেমা বন্ধসহ বেশ কিছু ঘটনাকে সংস্কৃতির ওপর হামলা বলে প্রচারণা চালানো হচ্ছে সুকৌশলে। বিষয়গুলো ধর্মীয় নয়, কিন্তু ধর্মীয় নেতারা এগুলো সরাসরি উচ্ছেদ কিংবা বন্দের কথা বলেন না। এ কারণেই দেশের আনাচে-কানাচে প্রচুর মাজার গড়ে উঠেছে। কিন্তু মাজারকে কেন্দ্র করে নোংরামি-অসভ্যতা ও মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলাকে মাজারের বিরুদ্ধে কথা বলা বলে প্রচার করা হয়। নৌকা বাইচের নামে জুয়া হলে, অশ্লীল মেলা হলে, গ্রামে-গ্রামে এটা নিয়ে ঝগড়া হলে- শান্তি রক্ষার্থে তা বন্ধের কথা বলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বিষয়গুলো যথাযথভাবে প্রচার না করে শুধু নৌকা বাইচ বন্ধের খবরটাই দেওয়া হয়। মাজার বন্ধের কথা বলা হয়, কিন্তু কেন বন্ধের দাবি এলো, সেটা বলা হয় না। এভাবেই বছরের পর বছর এগুলো নিয়ে চলছে নোংরা রাজনীতি। এর মাধ্যমে এক শ্রেণির সংবাদমাধ্যম ও সংস্কৃতিকর্মীরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে ধর্মের মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপচেষ্টা করছে নিয়মিত। অপতথ্য ও মতলবি বয়ান দিয়ে ধর্ম ও সংস্কৃতিকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর হীন চেষ্টা চলছে। এ ধরনের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। নানা অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডের বিরোধীতা করলেই ধর্মপ্রাণ মানুষকে লক্ষ্য করে বলা হয়, তারা বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অন্ধকারে ঠেলে দিতে চায় এবং বিশ্বের কাছে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করতে চায়। কিন্তু মতলববাজদের উচ্ছৃঙ্খলতা নিয়ে কথা বলা হয় না। সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কেউ থাকে না। শিক্ষার পরিবেশ যেসব কাজে নষ্ট হয়, তা নিয়ে কথা বলা হয় না। উল্টো তরুণ সমাজের ধর্মচর্চাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, নানাবিধ অপপ্রচার করে সামাজিক বিভাজন বাড়ানো হয়। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। মনে রাখতে হবে, দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ মানুষ মুসলমান হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ধর্মীয় অনুভূতি অত্যন্ত গভীর। তাই প্রকাশ্যে যেন মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না লাগে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সবার। আপনি সংস্কৃতিচর্চার নামে ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলবেন, মাদকের আখড়াকে সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্র বানাবেন, গান-বাজনা, যাত্রাপালা ও নাটক করে বেহায়াপনা-অশ্লীলতার বাজারজাত করবেন, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাকে প্রগতি বলবেন- এটা হতে পারে না। সংস্কৃতি চর্চার নামে ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ কিংবা ধর্মভীরু জনগণের আবেগ-অনুভূতির বিরুদ্ধাচরণ সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যম হতে পারে না। আর সব ঘটনায় মাদরাসা শিক্ষার্থী ও তওহিদি জনতাকে ‘ফ্রেমিং’ করাও কাম্য নয়। মিথ্যা তথ্য-বয়ান দিয়ে মাদরাসা শিক্ষার্থী বা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সাংস্কৃতিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে দাঁড়া করানো হয় ও হচ্ছে- এটা কেন? এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা দেখা যায় না কেন? এটা কি ইচ্ছা করেই করা হচ্ছে? কেন ঢালাওভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাদরাসার শিক্ষার্থীদের কথিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হলো? এর পেছনের খেলাটা কারা খেলতে চেয়েছিল, জাতি তাদের চিনতে ও জানতে চায়। দেশের বিভিন্ন এলাকার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে দ্বিমত ও আপত্তি থাকা সত্ত্বেও আলেম-উলামা কিংবা ধর্মপ্রাণ মানুষ সরাসরি প্রতিবাদের পথ বেছে নেয় না, সেগুলোকে বাঁধাও দেয় না। মসজিদ-মন্দির কিংবা মসজিদ-মাজার পাশাপাশি পরিচালিত হচ্ছে নিজ নিজ বিশ্বাসমতে। এভাবেই চলে আসছে, এই সত্য অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। তবে হ্যাঁ, কোনো বিষয় যখন দীর্ঘদিনের সামাজিক কাঠামো, ধর্মীয় রীতিনীতি ও আবহমান সামাজিক অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীতে চলে যায়, কেবল তখনই তওহিদি তথা ইসলামি জনতা তার প্রতিবাদ জানায়। তবে সেটিও সহিংসতার মাধ্যমে নয়। এই সত্যটা অস্বীকার করে সমাজে কারা ক্ষত সৃষ্টি করছে, তাদের খুঁজে বের করা খুব জরুরি। দেশের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যই এটা খুঁজতে হবে। লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষক আরএইচ/ |