‘পবিত্র কালেমার অবমাননা ও ভূরাজনৈতিক বিভ্রান্তি এড়াতে সচেতন হোন’ 
প্রকাশ: ০২ জুলাই, ২০২৬, ০৮:২৮ রাত
নিউজ ডেস্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক-

সম্প্রতি বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা, হিজরি নববর্ষ উদযাপন এবং সাম্প্রতিক কয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রেক্ষাপটে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা, শহর ও অঞ্চলে গণহারে পবিত্র কালেমা খচিত পতাকা প্রদর্শনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিভিন্ন ধরনের উদ্বেগ ও নেতিবাচক ব্যাখ্যার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দেশের সর্বজনস্বীকৃত উলামায়ে কেরাম, ইসলামী দলসমূহের নেতৃবৃন্দ, রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত মহলে এ বিষয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

এ প্রেক্ষাপট সামনে রেখে বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যালয়ে দেশের শীর্ষ উলামায়ে কেরামের উপস্থিতিতে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসময় সভায় সভাপতিত্ব করেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুহাম্মদ মুহিবুল্লাহিল বাকী নদভী। 

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ধর্মমন্ত্রী আলহাজ কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ বলেন,কালেমা খচিত পতাকা বা ইসলামের অন্যান্য ধর্মীয় প্রতীককে ঘিরে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি, অবমাননা কিংবা রাজনৈতিক অপব্যবহার কাম্য নয়। এ ধরনের যেকোনো অপচেষ্টা সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং জাতীয় ঐক্য বিনষ্টের কারণ হতে পারে। ইসলামের পবিত্র নিদর্শন ও ধর্মীয় প্রতীকসমূহের মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব

ধর্মমন্ত্রী বলেন, পবিত্র কালেমা আমাদের ঈমানের মূল ভিত্তি। এর প্রতি প্রতিটি মুসলমানের গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান রয়েছে। তবে বর্তমান আন্তর্জাতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় কালেমা লিখিত নির্দিষ্ট ধরনের কালো পতাকা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের ব্যবহৃত প্রতীকের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় কিছু মহলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো গোষ্ঠী এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কালেমা খচিত পতাকার মিছিল বা সমাবেশে অনুপ্রবেশ করে পরিস্থিতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা চালাতে পারে। এতে ইসলাম, মুসলিম সমাজ এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শরিয়তের দৃষ্টিতে কালেমা খচিত পতাকা তৈরি ও উত্তোলন মূলত জায়েয মন্তব্য করে উপস্থিত আলেমগণ বলেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এসব পতাকার ব্যাপক ব্যবহার এবং তরুণদের হাতে হাতে বহনের ফলে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর ও নেতিবাচক প্রচারণার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

হাদিস ও সীরাতগ্রন্থে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং সাহাবায়ে কেরামের যুগে সাদা, কালো কিংবা কালেমা-সংবলিত পতাকার ব্যবহার মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে সাধারণ সভা-সমাবেশ বা মিছিলে এ ধরনের পতাকা বহনের নজির কুরআন, হাদিস বা নির্ভরযোগ্য ফিকহের কিতাবে পাওয়া যায় না।

আলেমগণ আরও বলেন, শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—সমাজে ফিতনা বা বড় ধরনের বিভ্রান্তির আশঙ্কা দেখা দিলে অনেক বৈধ (জায়েয) কাজও সাময়িকভাবে পরিহার করা উচিত। এ প্রসঙ্গে হযরত আয়েশা (রা.)-কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যদি মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তির আশঙ্কা না থাকত, তবে তিনি কাবা শরিফকে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর ভিত্তির ওপর, অর্থাৎ হাতীমসহ পুনর্নির্মাণ করতেন। অর্থাৎ বৈধ হওয়া সত্ত্বেও জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির আশঙ্কায় তিনি সেই কাজ থেকে বিরত ছিলেন।

সৌদি আরবের আফগানিস্তানের জাতীয় পতাকায় কালেমার কথা উল্লেখ করে অতিথি আলেমগণ বলেন, এসব পতাকা রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ব্যবহৃত হয় এবং যথাযথ সম্মানের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়। সৌদি আরবের জাতীয় পতাকায় কালেমা খচিত থাকায় সেটি কখনো অর্ধনমিত করা হয় না।

অপরদিকে, গণহারে ব্যবহৃত কালেমা খচিত পতাকা কর্মসূচি শেষে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকা, ছিঁড়ে যাওয়া বা পদদলিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পবিত্র কালেমার এমন অবমাননার সম্ভাবনার কারণে অনেক মুসলিম স্কলার পতাকায় কালেমা লিখে গণহারে ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করেছেন। খেলাধুলা বা অন্যান্য সাধারণ কর্মসূচিতে ব্যাপকভাবে কালেমা খচিত পতাকার ব্যবহার অনিচ্ছাকৃতভাবে এর পবিত্র মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে পারে। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের জাতীয় পতাকা যত্রতত্র পড়ে থাকলেও তা ধর্মীয় অবমাননার শামিল নয়; কিন্তু পবিত্র কালেমা সংবলিত পতাকা যদি অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকে, ময়লা-আবর্জনায় নিক্ষিপ্ত হয় বা পদদলিত হয়, তবে তা শুধু গুনাহের বিষয়ই নয়, বরং বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে গভীর আঘাত হানবে বলে বরেণ্য আলেমগণ মনে করেন। 

এ প্রেক্ষাপটে দেশের জমহুর উলামায়ে কেরাম, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পবিত্র কালেমার মর্যাদা রক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট এই স্পর্শকাতর বিষয়টির যথাযথ সমাধান সম্ভব। এ বিষয়ে মসজিদের ইমাম, খতিব, আলেম-ওলামা ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে জনগণের মধ্যে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন, মধুপুরের পীর সাহেব মাওলানা আবদুল হামিদ, মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ, অধ্যক্ষ মাওলানা মিজানুর রহমান, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সভাপতি মুফতি মাহফুজুল হক, মুফতি মনির হুসাইন কাসেমী, মাওলানা মোসাদ্দেক বিল্লাহ মাদানী, আফতাবনগর মাদ্রাসা মুহতামিম মুফতি মোহাম্মদ আলী, লালখান বাজার মাদ্রাসার মুহতামিম মুফতি হারুন এজহার,  জাতীয় ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা কাজী আবু হোরায়রা, মাওলানা শরীফ উল্লাহ, মাওলানা মাহমুদ হাসান গুনভী, মাওলানা আজহারুল ইসলাম, মাওলানা মহিউদ্দিন একরাম, মাওলানা এজহারুল হক, মাওলানা ড. মুশতাক আহমদ, মাওলানা ড. ওয়ালীয়ুর রহমান খান, মাওলানা মীর ইদরিস, মুফতি মো. আবদুল্লাহ, মাওলানা আনিসুজ্জামান সিকদার, মাওলানা জাকির হোসেন খান, মাওলানা আহমদ রফিক, মাওলানা মহিউদ্দিন, মাওলানা ছানাউল্লাহ আজহারী প্রমুখ। 

আওয়ার ইসলাম/জেডএম