স্মৃতির পাতায় আল্লামা আব্দুর রহীম আনোয়ারী (রহ.)
প্রকাশ: ২৩ জুন, ২০২৬, ০৪:৩২ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| সলিমুদ্দীন মাহদী কাসেমী ||

আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগের কথা। হাইয়ার পরীক্ষার নাযূর হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য গিয়েছিলাম জামিয়া মাদানিয়া শুলকবহরে। মেহমানখানায় অবস্থান করছিলাম। হঠাৎ খবর এল, একজন সম্মানিত ব্যক্তি সাক্ষাৎ করতে এসেছেন। বের হয়ে দেখি, তিনি স্বয়ং শায়খে বুখারী আল্লামা আব্দুর রহীম আনোয়ারী (রহ.)।

আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলাম। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সালাম ও মুসাফাহা করলাম। অত্যন্ত সংকোচের সঙ্গে বললাম,

“হযরত! আমরা তো সময় করে আপনার খিদমতে হাজির হতাম। আপনি কেন কষ্ট করে এখানে চলে এলেন?”

হুজুর মুচকি হেসে বললেন, “শুনলাম, জামিয়া পটিয়া থেকে উস্তাদ এসেছেন। তাই দেখা করতে চলে এলাম।”

কথাটি ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু তার গভীরতা ছিল অসীম। আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার প্রতি এমন ভালোবাসা! এমন টান! এমন আন্তরিকতা! আজকাল ক'জনের মাঝে দেখা যায়?

এরপর শুরু হলো স্মৃতিচারণ। জামিয়ার কথা উঠতেই তাঁর চেহারার রঙ বদলে গেল। কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো। চোখ ভিজে উঠল অশ্রুতে। তিনি বলছিলেন, আর কাঁদছিলেন। আমরা শুনছিলাম, আর অবাক হচ্ছিলাম।

এই প্রতিষ্ঠানেই তিনি বেড়ে উঠেছেন। এই প্রতিষ্ঠানেই তাঁর তারুণ্যের দিনগুলি কেটেছে। তাঁর পিতা ছিলেন জামিয়ার একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। মাওলানা হোসাইন আহমদ (রহ.)। জামিয়ার সুখ-দুঃখ ছিল তাঁর নিজের সুখ-দুঃখ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তিনি জামিয়ার প্রতিনিধিত্ব করতেন। দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিতেন। তাবলীগের মেহনত করতেন। সহযোগী ও শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।

হুজুর সেই সব দিনের কথা বলছিলেন। একটি একটি করে স্মৃতি তুলে ধরছিলেন। কখনো হাসছিলেন।কখনো থেমে যাচ্ছিলেন। কখনো অশ্রু মুছছিলেন। সেদিন মনে হয়েছিল, মানুষ কেবল একটি প্রতিষ্ঠানে পড়ে না। কখনো কখনো একটি প্রতিষ্ঠানই মানুষের রক্তে মিশে যায়। তার ভালোবাসা হৃদয়ের গভীরে গেঁথে যায়। হুজুরের চোখের পানি যেন সেই ইতিহাসেরই সাক্ষী ছিল।

হঠাৎ মনে পড়ল কবিরের সেই পংক্তি—

؎ محبت مجھے اُن نوجوانوں سے ہے

ستاروں پہ جو ڈالتے ہیں کمند

নিজের শিকড়কে ভুলে যাননি তিনি। ভুলে যাননি উস্তাদদের। ভুলে যাননি প্রতিষ্ঠানকে। ভুলে যাননি অতীতের ঋণ। আর এটাই ছিল তাঁর সৌন্দর্য। এটাই ছিল তাঁর মহত্ত্ব। এটাই ছিল তাঁর পরিচয়। সেদিন আমরা তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তাঁর কথার দিকে নয়। তাঁর চরিত্রের দিকে। তাঁর বিনয়ের দিকে। তাঁর আনুগত্যের দিকে। তাঁর ভালোবাসার দিকে। আর অন্তরে অন্তরে আফসোস করছিলাম। এমন বিনয় যদি আমাদেরও হতো! এমন মহব্বত যদি আমাদের হৃদয়েও জন্মাত! এমন বিশ্বস্ততা যদি আমরাও অর্জন করতে পারতাম!

সত্যিই, বড় মানুষরা তাদের ইলম দিয়ে যতটা বড় হন, তার চেয়েও বেশি বড় হন তাঁদের বিনয়, কৃতজ্ঞতা ও মহব্বতের কারণে। আল্লাহ তাআলা শায়খে বুখারী, শায়েরে ইসলাম আল্লামা আব্দুর রহীম আনোয়ারী (রহ.)-এর কবরকে জান্নাতের বাগিচাসমূহের একটি বাগিচা বানিয়ে দিন। তাঁর অশ্রুসিক্ত ভালোবাসাকে তাঁর নাজাতের অসিলা বানিয়ে দিন। এবং আমাদেরকেও তাঁর মতো উস্তাদপ্রেম, প্রতিষ্ঠানপ্রেম ও বিনয়ের কিছু অংশ দান করুন। আমীন।

؎ لوگ مر جاتے ہیں لیکن یاد زندہ رہتی ہے

اہلِ دل جاتے ہیں، ان کی بات زندہ رہتی ہے

লেখক: তত্ত্বাবধায়ক, তাফসির বিভাগ, জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া

আইও/