
|
জনপ্রিয়তা নয়, যোগ্যতা দেখে বক্তা নির্বাচন করুন: মাওলানা শাহ তৈয়্যেব আশরাফ
প্রকাশ:
১৫ আগস্ট, ২০২৬, ০৪:৩৯ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| মাওলানা রাকিবুল ইসলাম || দেশের মানুষের মধ্যে দ্বীনি চেতনা, ঈমান-আমল ও ইসলামি পরিবেশ গড়ে তুলতে ওয়াজ মাহফিলের ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। তবে সময়ের পরিবর্তনে অনেক ক্ষেত্রে ওয়াজ মাহফিলের মূল উদ্দেশ্য ও রূহ দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মাদরাসা মারকাযুল ইহসান, ঢাকার প্রিন্সিপাল হজরত মাওলানা শাহ তৈয়্যেব আশরাফ। তিনি ওয়াজ মাহফিলকে ব্যক্তি প্রচার, জনপ্রিয়তা ও দুনিয়াবি স্বার্থের মাধ্যম না বানিয়ে ইলম, ইখলাস, ইসলাহ ও তরবিয়তের ময়দান হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। বুধবার (১২ আগস্ট) টাঙ্গাইল, নরসিংদী, গাজীপুর, চাঁদপুর ও শরীয়তপুর থেকে আগত ওলামায়ে কেরামের উদ্দেশে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। মাওলানা শাহ তৈয়্যেব আশরাফ বলেন, একসময় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহর-মহল্লা পর্যন্ত ওয়াজ মাহফিল ছিল মানুষের ঘরে ঘরে দ্বীনের কথা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম। আলেম-ওলামায়ে কেরাম দূর-দূরান্ত থেকে মানুষের কাছে যেতেন, আল্লাহ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন এবং মানুষকে আখিরাতের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানাতেন। তিনি বলেন, ওয়াজ মাহফিল শুধু একটি রাতের আয়োজন ছিল না; বরং এর মাধ্যমে আলেমদের সঙ্গে পরিবার, গ্রাম ও মহল্লার মানুষের আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হতো। মানুষ আলেমদের আপনজন মনে করত এবং তাঁদের কাছে দ্বীনি মাসআলা, পারিবারিক সমস্যা ও সন্তানদের বিষয়ে পরামর্শ নিত। আলেমের সোহবত, নসিহত ও দোয়া মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতো। বর্তমান সময়ে কিছু ওয়ায়েজের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওয়ায়েজরা দ্বীনের দাওয়াত ও নসিহতের পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক বক্তায় পরিণত হচ্ছেন। সময়ভেদে বক্তার পারিশ্রমিক নির্ধারণ, সঙ্গে থাকা খাদেমের জন্য অর্থ, ক্যামেরাম্যানের খরচ এবং বিভিন্ন অতিরিক্ত হাদিয়ার বিষয়ও আলোচনায় আসছে। তাঁর ভাষ্য, প্রয়োজনীয় যাতায়াত খরচ কিংবা সম্মানজনক হাদিয়ার বিষয় এক হলেও অতিরিক্ত আর্থিক দাবি যদি মাহফিলের অন্যতম বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, বক্তার ইলম, আমল, আকিদা, মানহাজ ও মানুষের ইসলাহ করার যোগ্যতার পরিবর্তে অনেক সময় তাঁর জনপ্রিয়তা, মাহফিলে উপস্থিতির সংখ্যা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কত ভিউ হয়—এসবকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বক্তার বক্তব্য ধারণ ও প্রচারের প্রসঙ্গ টেনে মাওলানা তৈয়্যেব আশরাফ প্রশ্ন তোলেন, কোনো বক্তা নিজের প্রচারের জন্য ক্যামেরাম্যান নিয়ে মাহফিলে এলে সেটি দ্বীনের প্রচার, নাকি ব্যক্তির প্রচার—এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, একজন প্রকৃত দাঈর চিন্তা হওয়া উচিত কীভাবে মানুষের কাছে আল্লাহর দ্বীন পৌঁছানো যায়, কীভাবে মানুষের ঈমান ও আমল সংশোধন করা যায় এবং কীভাবে একজন গুনাহগার মানুষ তাওবার পথে ফিরে আসতে পারে। মাওলানা শাহ তৈয়্যেব আশরাফ বলেন, বর্তমান সময়ে কিছু বক্তার মধ্যে শ্রোতাদের আকৃষ্ট করার জন্য অতিরিক্ত আবেগ, চিৎকার-চেঁচামেচি, অভিনয়, গান বা বিভিন্ন কণ্ঠস্বরের অনুকরণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অথচ একজন দাঈর সবচেয়ে বড় সম্পদ হওয়া উচিত ইলম, হিকমত, আদব, আমল ও অন্তরের অবস্থা। তাঁর মতে, শ্রোতাদের হাসাতে বা কাঁদাতে পারাই দাওয়াতের মূল মানদণ্ড নয়। সুন্দর কণ্ঠ, আকর্ষণীয় শব্দচয়ন বা আবেগময় উপস্থাপনার পাশাপাশি বক্তার ইলম, তাকওয়া ও মানুষের ইসলাহের যোগ্যতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনীতি, জিহাদসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল শরঈ বিষয়ে যথাযথ ইলম ও প্রস্তুতি ছাড়া বক্তব্য দেওয়া নিয়েও সতর্ক করেন তিনি। এসব বিষয়ে সামান্য ভুল বক্তব্য মানুষের চিন্তা ও আমলের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মন্তব্য করেন মাওলানা তৈয়্যেব আশরাফ। তিনি বলেন, উম্মতের কাছে দ্বীন পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বক্তার জ্ঞান ও যোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপর্যাপ্ত জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপিত হলে মানুষের কাছে পরিশুদ্ধ ও সঠিক দ্বীনি শিক্ষা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। ইলম ও অন্তরের অবস্থার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি মাওলানা জালালুদ্দীন রূমী রহ.-এর একটি বক্তব্যের মর্ম তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কোনো পাখির কণ্ঠস্বর নকল করা সম্ভব হলেও তার অন্তরের ব্যথা নকল করা সম্ভব নয়। একইভাবে বক্তব্যের ভঙ্গি ও শব্দচয়ন অনুকরণ করা গেলেও ইখলাস, আল্লাহভীতি, উম্মতের প্রতি দরদ এবং আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক অনুকরণ করা যায় না। তাঁর মতে, আকর্ষণীয় বক্তব্য, ছবি, ভিডিও ও আবেগময় উপস্থাপনা মানুষের বাহ্যিক আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু অন্তরের প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ইলম, আমল, ইখলাস, তাকওয়া ও আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক। ইসলাহী মজলিসের প্রসঙ্গ তুলে মাওলানা শাহ তৈয়্যেব আশরাফ বলেন, ইসলাহ শুধু কিছু কথা বলার নাম নয়। ইসলাহ হলো অন্তরের সংশোধন, নফসের চিকিৎসা, আমল ও আখলাকের পরিশুদ্ধি এবং আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক মজবুত করা। তিনি বলেন, একজন মানুষকে ধীরে ধীরে আল্লাহওয়ালা বানানোর চেষ্টা ইসলাহ ও তরবিয়তের অন্যতম উদ্দেশ্য। তাই যারা নিজেরাই ইসলাহ ও তরবিয়তের প্রকৃত মর্মের সঙ্গে পরিচিত নন, তাঁদের জন্য অন্যের ইসলাহ করার দাবি করা নিয়েও চিন্তা করা প্রয়োজন। বক্তব্যের শেষাংশে তিনি ওয়াজ মাহফিলের মূল উদ্দেশ্যের দিকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, ওয়াজ মাহফিলের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করা, ঈমান জাগ্রত করা, আমল সংশোধন করা, আখিরাতের চিন্তা সৃষ্টি করা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা বৃদ্ধি করা এবং মানুষকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে তাওবা ও তাকওয়ার পথে নিয়ে আসা। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে এমন আলেম ও ওয়ায়েজ প্রয়োজন, যাঁদের ইলমের সঙ্গে আমল, আমলের সঙ্গে ইখলাস, ইখলাসের সঙ্গে আল্লাহভীতি এবং আল্লাহভীতির সঙ্গে উম্মতের প্রতি গভীর দরদ রয়েছে। বক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আয়োজকদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়ে মাওলানা তৈয়্যেব শাহ আশরাফ বলেন, শুধু মানুষের ভিড় বা বক্তার জনপ্রিয়তা দেখে নয়; বরং তাঁর ইলম, আমল, যোগ্যতা ও দ্বীনি দায়িত্ববোধ বিবেচনা করে বক্তা নির্বাচন করা উচিত। তিনি বলেন, একটি মাহফিলের মঞ্চে একজন বক্তাকে দাঁড় করানো মানে শুধু তাঁর হাতে একটি মাইক্রোফোন তুলে দেওয়া নয়; বরং হাজার হাজার মানুষের সামনে দ্বীনের কথা বলার আমানত দেওয়া। এ আমানতের ব্যাপারে বক্তা ও আয়োজক উভয়কেই আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। আলোচনার শেষে ওয়াজ মাহফিলগুলোকে ব্যক্তি প্রচার ও দুনিয়াবি স্বার্থের মাধ্যম না বানিয়ে সত্যিকার অর্থে হেদায়েত, ইসলাহ ও তরবিয়তের ময়দান হিসেবে গড়ে তোলার তাওফিক কামনা করে দোয়া করেন মাওলানা শাহ তৈয়্যেব আশরাফ। আইও/ |