পরীক্ষা ছাড়া বেফাকের আর কাজ কী?
প্রকাশ: ৩১ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৪৯ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| মাওলানা মাহফুজুল হক ||

একটি প্রশ্ন অনেকেই করেনপরীক্ষা ছাড়া বেফাকের আর কাজ কী? মূলত অনেকের জানার সীমাবদ্ধতা থাকে, তার জানা অনুযায়ী সে বলে। আবার সমাজে আমরা এমন অনেককে দেখি, দায়িত্বশীলতার কমতি, আমি আমার জায়গা থেকে একটি কথা বলব, সে কথাটা বলার আগে সে বিষয়ে ভালো করে আগে জানার চেষ্টা না করা। এসব কমতির কারণে আমার বলাটা অভিযোগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

আসলে তো বেফাক প্রথম প্রতিষ্ঠার টার্গেটই হলো, পরীক্ষা না। সারাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে আনা। এটাই বেফাকের প্রথম এক নম্বর টার্গেট।

দুই নম্বর টার্গেট হলো, এই কওমি মাদরাসাগুলোর যে মূল মাকসাদ, কোরআন-হাদিসের মজবুত শিক্ষা। ভালো মানের শিক্ষা এবং এর পাশাপাশি সমান গুরুত্বের সাথে শিক্ষার্থীদের আমল-আখলাক, তাদের তারবিয়াত সম্মতভাবে গড়ে তোলা।

বেফাক প্রতিষ্ঠার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ মাকসাদ হলো, এই মাদরাসাগুলোর তালিম-তারবিয়তের মানোন্নয়ন। এই ক্ষেত্রে তালিমি মানোন্নয়নের একটা ব্যবস্থাপত্র হলো, কেন্দ্রীয় পরীক্ষা। আলহামদুলিল্লাহ, এই কেন্দ্রীয় পরীক্ষাটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেখানে আমরা দেখছি, সরকার যে সকল পরীক্ষার আয়োজন করছে তারা নকলমুক্ত পরীক্ষা আয়োজন করতে গলদঘর্ম হয়ে যায়, তারা হিমশিম খাচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস –এটাকে রোধ করতে পারছে না। এক্ষেত্রে আমরা আলহামদুলিল্লাহ, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ আমরা খুব জোর গলায় এবং দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি, যে আমরা ১০০% পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস–এটাকে আমরা রোধ করার বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে আমরা শতভাগ সফল। দ্বিতীয়ত, আমাদের পরীক্ষাগুলো নকলমুক্ত পরিবেশে গ্রহণ করা হয়। এই সময়ে আমাদের বাংলাদেশের জন্য কওমি মাদরাসা, এ সকল জাতীয় বোর্ডের পরীক্ষা–এটা একটা উদাহরণ। আমাদের পরীক্ষাটাও আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি এবং এর মধ্যে দিয়ে ব্যাপকভাবে সারাদেশের ছাত্রদের মাঝে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। এই এটাই একমাত্র বেফাকের কাজ নয়।   

এই বাংলাদেশে এক সময় কওমি মাদরাসাগুলোতে শিক্ষার মাধ্যম ভাষা ছিল উর্দু। এবং সেটা বাস্তবসম্মত কারণেই ছিল। কিন্তু আমাদের চিন্তাশীল আলেমগণ ভাবলেন যে, আমাদের মাতৃভাষা হলো, বাংলা। অতএব, শিক্ষার মাধ্যম ভাষা এই বাংলা ভাষাই হওয়া উচিত। তারা এই প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন এবং বেফাকই সেটা বাংলাদেশে কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। এখন আমরা বাস্তবতার নিরিখে একথা বলতে পারি, সারাদেশে ৯০% কওমি মাদরাসায় শিক্ষার মাধ্যম ভাষা, বাংলা। আর এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ।

আরেকটা বিষয় বলব সেটা হলো, আমাদের কওমি মাদরাসায় সাধারণ শিক্ষা –বাংলা, অংক, ইংরেজি, সমাজ-ভূগোল –এজাতীয় শিক্ষা ছিল না। ঠিক এটার ক্ষেত্রেও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছে এবং আলহামদুলিল্লাহ, বেশ অনেক আগেই শিশু শ্রেণি থেকে নিয়ে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত বাংলা, অংক, ইংরেজি এবং পাশাপাশি ক্লাস টু থেকে সমাজ, ভূগোল, ইতিহাস বিষয়ক বই রচনা করেছে বেফাক। মাদরাসায় এগুলো সিলেবাসভুক্ত করেছে এবং মাদরাসার দায়িত্বশীলদের উদ্বুদ্ধ করে প্রতিটা মাদরাসায় এই সাধারণ শিক্ষা পড়ানোটার পরিবেশ গড়ে তুলেছে। ফাইভ পর্যন্ত তো অনেক আগেই হয়েছে। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় ধাপে সিক্স থেকে নিয়ে এইট পর্যন্ত আলহামদুলিল্লাহ, বাংলা, অংক, ইংরেজি বই বেফাক তৈরি করেছে এবং এগুলোও পর্যায়ক্রমে মাদরাসাগুলো সিলেবাসভুক্ত করছে। ইদানীং আমরা আরেকটু অগ্রসর হয়ে নাইন, টেনের বাংলা এবং ইংরেজি –এটাকেও সিলেবাসভুক্ত করা এবং এর জন্য বই রচনা করার দিকে বেফাক মনোযোগ দিচ্ছে। কুরআন-হাদিসের শিক্ষার সাথে এই সমাজে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ বাংলা, অংক, ইংরেজি এবং সাধারণ শিক্ষা –এটা আমাদের এই কওমি মাদরাসার আঙ্গিনায় বেফাকেরই উদ্যোগে আজকের এই পর্যায়ে উপনীত। অন্যান্য বোর্ডগুলো বেফাককেই অনুসরণ করে তারাও অনেক দূর এগিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বেফাক বোর্ড এগিয়ে আছে।

এছাড়া আলহামদুলিল্লাহ বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ তালিম-তারবিয়াতের মানোন্নয়নের জন্য যে শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, এই শিক্ষক প্রশিক্ষণের কার্যক্রম বেফাক অনেক আগেই শুরু করেছে এবং এটাকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের বেফাকের যে কেন্দ্রীয় কার্যালয় (কাজলা ভাঙাপ্রেসে) তার পাশেই সামাদ নগরে আমরা ১১ তলা বিশিষ্ট প্রশিক্ষণ ভবন তৈরি করছি। এবং সেখানে সারা বছর নিজস্ব পরিবেশে নিজস্ব প্রশিক্ষকদের মাধ্যমে নূরানী হিফজের প্রশিক্ষণ হচ্ছে। দেশব্যাপী আমাদের প্রশিক্ষণ শাখার তত্ত্বাবধানে আমাদের সব ধরনের প্রশিক্ষণ চলছে। এবং আমরা এলাকাভিত্তিক মাদরাসা পরিচালনাকে সুন্দর করার জন্য দায়িত্বশীল প্রশিক্ষণের আয়োজন করছি, হিসাব প্রশিক্ষণের আয়োজন করছি। এটাও আলহামদুলিল্লাহ বেফাক করছে। এ জাতীয় আরো বিভিন্ন রকমের কার্যক্রম বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া করছে।

কোনো এলাকায় মাদরাসাগুলো বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত হলে বেফাক সেখানে মাদরাসাগুলোর পাশে দাঁড়াচ্ছে। করোনাকালীন বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ সারা দেশের কওমি মাদরাসাগুলোকে এককালীন একটা সহযোগিতা করেছে। এরপর বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার সময় আমরা এরকমভাবে বেফাকের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মাদরাসাগুলোকে সহযোগিতা করেছি। এ জাতীয় বিভিন্ন রকমের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বেফাক তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পরীক্ষা অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং সেটাকেও অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, অত্যন্ত ভালোভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রেও বেফাক ভূমিকা পালন করে চলেছে।

[বেফাক মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক সম্প্রতি আওয়ার ইসলামকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে একটি প্রশ্নের উত্তরে কথাগুলো বলেন। অনুলিখন করেছেন: আল আমীন বিন সাবের আলী]

আইও/