
|
‘মৌলিকত্ব ঠিক রেখে কওমি সিলেবাসে পরিবর্তন-পরিমার্জন হওয়াটাই কাম্য’
প্রকাশ:
২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ০৯:৩৬ রাত
নিউজ ডেস্ক |
কওমি সিলেবাস নিয়ে আলোচনা আর কল্পনা-জল্পনার শেষ নেই। তরুণ মহলে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চর্চিত। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে প্রায়ই ঝড় ওঠে। বেশির ভাগ সমালোচকই অবশ্য নানাজনের মত-পথ বা কথায় প্রভাবিত। তবে স্বতন্ত্র চিন্তা ও মানসিকতা তাদের সমালোচনায় গৌণ হলেও আলোচ্য এ বিষয়ে বোদ্ধাজনের সংখ্যাও কম নয়। যারা কওমি-ব্যবস্থার আগপর ভেবে, অধ্যায়ন করে, জেনে ও বোঝে—চিন্তার সূত্রগুলোর পরস্পর মেলবন্ধক—গঠনমূলক সমালোচনা করেন। তাদের এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রশংসনীয়। প্রতিটা সূত্রের ব্যাখ্যা যেন গোছানো সংসার। এমনই একজন বরিত লেখক ও কথাসাহিত্যিক মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন। ‘কওমি সিলেবাসের মানোন্নয়নে আলেমগণের ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনায় আওয়ার ইসলামের পক্ষ থেকে তার মুখোমুখি হয়েছেন সহসম্পাদক যাকারিয়া মাহমুদ। আওয়ার ইসলাম: কওমি মাদরাসার সিলেবাস নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শোনা যায় চারদিকে। অধিকাংশেরই চাওয়া সিলেবাস পরিমার্জন হোক। আপনি ঠিক কতটা জরুরি মনে করেন এটাকে? মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন: যারা সিলেবাস পরিবর্তনের কথা বলেন, তারা মূলত দুই শ্রেণির। এক শ্রেণি হলো—যারা না ইসলামকে গভীরভাবে জানেন-বোঝেন, না কওমি সিলেবাসের আগাগোড়া সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত। এ-শ্রেণির লোকেরা সিলেবাস পরিবর্তনের কথা বলে যা বোঝাতে চান—তা হলো, মানুষের পেশাভিত্তিক জীবন। কেননা তাদের কাছে মানুষের পেশা বা কর্মজীবন ও ভবিষ্যতটাই প্রাধান্য। এবং এই আলোকেই তারা মনে করেন, অন্য আট-দশটা সিলেবাসের মতো কওমি মাদরাসার সিলেবাসও পরিবর্তন প্রয়োজন। এ শ্রেণির কথা শোনার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। কারণ, তারা ইসলাম ও কওমি মাদরাসা সম্পর্কে অজ্ঞতার ভেতর আছে। আরেক শ্রেণি হলো—যারা ইসলাম বোঝেন, কওমি মাদরাসার সিলেবাসের গুরুত্ব, গভীরতা ও গ্রহণযোগ্যতা—এবং গ্রহণযোগ্যতার পেছনের কারণগুলো ভালোভাবে অনুধাবন করেন। তাদের মধ্যে আবার দুই শ্রেণি—এক শ্রেণি হলো, যারা বলে থাকেন সিলেবাস পরিবর্তন না; বরং যোগ্য শিক্ষক প্রয়োজন। যদি শিক্ষকগণ আমানতদারিতার সাথে পাঠদান করেন, তাহলে আগে যেমন এ সিলেবাস থেকে ভালো ভালো আলেম তৈরি হয়েছেন, তা এ যুগেও সম্ভব। অপর শ্রেণি হলো—যারা কওমি সিলেবাসের সবকিছু জানার পরও মনে করেন—সিলেবাসের মৌলিকত্ব বহাল রেখে প্রাসঙ্গিক বিষয়াবলির মধ্যে সমকালের বিষয়াবলি এবং তুলনামূলক পরিবর্তী সময়ে লিখিত কিতাবাদি সংযোজন করা যেতে পারে। তাদের মতে—এতে ছাত্রদের উপকার হবে। এ-সময়ে যেহেতু ছাত্র-উস্তাদ সবার ভেতরেই একধরনের উদাসীনতা দেখা যায়, তাই আমি তাদের এই পরিমার্জনের চিন্তাকে স্বাগত জানাই। এবং মনে করি তাদের এই চিন্তা বাস্তবায়ন হওয়া উচিত। আওয়ার ইসলাম: দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠাকালে যে সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়েছিল—বর্তমান কওমি-সিলেবাস কি পুরোপুরি বহাল আছে সেটার ওপর? মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন: আসলে জোর দিয়ে ‘পুরোপুরি’ শব্দ ব্যবহার করা তো কঠিন। তবে আমাদের ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানের কওমি সিলেবাসে সময়ে সময়ে প্রাসঙ্গিক কিতাবাদির কিছু পরিবর্তন এলেও মৌলিকাংশে আসলে ওটাই—যা প্রণীত হয়েছিল। আওয়ার ইসলাম: প্রায় সকল শিক্ষার্থী, নবীন আলেম নির্বিশেষে সবারই চাওয়া—সিলেবাস পরিমার্জন হোক, সংস্কার হোক বা মানোন্নয়ন হোক—তা সত্ত্বেও দেখা যায়, বড়রা যারা এই পরিমার্জনটা করবেন, তারা একেবারে নিশ্চুপ এ ব্যাপারে। কোনো মন্তব্য শোনা যাচ্ছে না তাদের থেকে, তো এ ব্যাপারে আপনার কী মতামত? মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন: এখানে অবশ্য অভিযোগের সুযোগ একটা আছে! তবে যৌক্তিক যে বিষয়টা—মানোন্নয়নের দাবিদার যারা—চাই সে ছাত্র হোক বা হোক নবীন উস্তাদ—তারা সিলেবাসের যে মানোন্নয়ের কথা বলে, আসলে ‘উন্নয়ন’ বলতে তারা কী বোঝাতে চায়? এখানে এটাই হলো একরকমের ‘ফাঁপা’ বুলি। যার কোনো হাকিকত বা বাস্তবতা নাই। আরেকটা বিষয় হলো, চারপাশের পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হওয়াটা বর্তমানে মহামারির আকার ধারণ করেছে। সবাই যে মুরব্বি মানেন এমনটা না। বরং নিজের ভাবনায় ছাত্ররা কিতাব-সিলেবাস-সিস্টেম সম্পর্কে নানান বিষয় একীভূত করে নিজেদের মতো করে মুজাদ্দিদ সেজে বসে। তারপর সে সিলেবাসের দোষত্রুটি বয়ান করতে থাকে। তখন তাদের কাছ থেকে কোনোকিছু শোনা বা তাদের কথার জবাব দেওয়া—অনেক ক্ষেত্রে আত্মমর্যাদার সাথে সম্পৃক্ত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাই বড়রা তাদের কথার উত্তর দিতে চান না অনেক সময়। বড়রা মনে করেন, আমাদের ছাত্ররা নিজেদের যে ধারায় নিয়ে গেছে, সেটা আসলে খুবই সস্তা একটা ধারা। তাদের কথাগুলো আসলে শুনবার মতো না। আওয়ার ইসলাম: বর্তমান সিলেবাসে দেখা যায় সিরাত বেশ অবহেলিত। খুবই কম কিতাব পড়ানো হয় সিরাতের। তো এ ব্যাপারে আপনার কী অভিমত? মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন: আসলে পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে তা অনেকটা এমনই যে, সিরাতের একেবারেই কম বই পড়ানো হয়। এখানে লক্ষণীয় হলো, যদি রাসুলের জীবনীভিত্তিক বিষয়টাকেই সিরাত ধরা হয়, তাহলে সিরাতের কিতাব তো একেবারেই কম। আবার যদি বলা হয়, কুরআন-হাদিসের যা পড়ানো হয়, তার সবটাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—তাহলে সিরাতের কিতাব যে একেবারে অপর্যাপ্ত সে কথাও বলার সুযোগ নাই। তাছাড়া একটা বিষয় হলো, কে কত তাড়াতাড়ি ছা্ত্রদের মাওলানা বানাবে—এরকম একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে আজকাল। যার ফলে দিন দিন ক্লাস কমানো হচ্ছে। কিতাব কমানো হচ্ছে। এরকম কাটছাঁটের কারণে দেখা যায়—আজ থেকে ৩০-৩৫ বছর আগে সিরাতের যে কিতাবগুলো ছিল দরসে নেজামিতে, সেগুলো এখন বাদ পড়ে গেছে। বর্তমানেও তো চলছে এমন। শর্টকোর্সের নামে ছাত্রদের ৮ বছরে আলেম বানানোর কথা বলা হচ্ছে। এর ভেতরে আবার এসএসসি-এইচএসসি কীভাবে ঢোকানো যায়, দাখিল-আলিমের পরীক্ষাটা কোনোভাবে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায় কি না—এরকম নানান পরিকল্পনাও কম চলছে না। তো যদি পরিস্থিতি এভাবেই এগোয়, তাহলে বর্তমানে সিরাতের যা আছে, সেটাও থাকবে না। তুমি দেখে থাকবে—যারা এমনটা করে, তারাই আবার অভিযোগ তোলে—এটা নাই, ওইটা নাই। আওয়ার ইসলাম: দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠাকালীন মুরব্বি যারা আছেন, যেমন কাসেম নানুতবি, রাশিদ আহমাদ গাঙ্গুহি রহ. প্রমুখ। আমরা তাদের জীবনী অধ্যায়ন কালে দেখতে পাই—তারা ইতিহাস-ভূগোল, বিজ্ঞান-দর্শন, সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ মোটামুটি সব শাস্ত্রেই পারদর্শী ছিলেন। তো বর্তমান কওমি সিলেবাসে তো প্রত্যক্ষভাবে এসব দেখা যায় না। তবু কি বলা যায় আমরা আমাদের আকাবিরগণের পুরোপুরি অনুসরণ করছি? মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন: এ ক্ষেত্রে দুইটা বিষয়—এক হলো, মৌলিকত্ব। দ্বিতীয় হলো, প্রাসঙ্গিক। যেটা আমি শুরুতেই বলেছি। মৌলিকত্ব ঠিক রেখে প্রাসঙ্গিকে পরিবর্তন-পরিমার্জন—যেটাকে আমরাও সমর্থন করি। কিন্তু সমস্যা যেটা হয়ে দাঁড়ায়, কেউ আবার সময় বাড়াতে রাজি না। তো যদি সময় বাড়ানো না-হয় এবং এসব বিষয়কে সিলেবাসে আনার কথা বলা হয়, আর উদাহরণ টানা হয়—কাসেম নানুতবিদের মতো ব্যক্তিদের—তাহলে বিপদ যেটা হবে, কাসেম নানুতবি বিশ্বের জটিল কোনো বিষয় অধ্যায়ন শুরু করে, এক সপ্তাহের ভেতর সে বিষয়ে এতটা পাণ্ডিত্ব অর্জন করতেন যে, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার মতো যোগ্যতা তার হয়ে যেত। সুতরাং সে রকম তো আর সম্ভব না। কোনো একটা বিষয়ে পারদর্শী হতে আমাদের চাই লম্বা সময়। এখন যারা সিলেবাসে বিজ্ঞান-দর্শন, ইতিহাস-সাহিত্য ঢোকানোর কথা বলেন, তারা আবার সময় বাড়াতে রাজি না। এখন যদি সময় না-বাড়িয়ে এসব বিষয় সংযোজন করা হয়, তাহলে দেখা যাবে—কওমির শিক্ষার্থীরা আলিয়ার শিক্ষার্থীদের মতো সারাক্ষণ ওইটা নিয়েই পড়ে থাকবে। কুরআন-হাদিস আর পড়বে না। কারণ, এসব বিষয় পড়ে জাগতিক সুবিধা পাওয়ার রাস্তা উন্মুক্ত। আওয়ার ইসলাম: যদি উলামায়ে কেরাম সিলেবাস সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেন তাহলে, এই সংস্কারের পদ্ধতির ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কী থাকবে? মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন: এ-আলোচনা বহু আগে থেকেই চলে আসছে। সেটা প্রাসঙ্গিক পরিবর্তন। যা বিজ্ঞ আলেমগণ পরিকল্পনা করে আসছেন। তারা যদি বিচার-বিশ্লেষেণ করে, খুব ভেবে-চিন্তে—কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছান, সেটা হতে পারে নতুন কোনো সংযোজন বা পুরানা কিছু বিয়োজনের বিষয়—যা আমাদের দীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। তাহলে তা আমরাও সমর্থন করি এবং মনে করি এটা হওয়া উচিত। মোটকথা, মৌলিকত্ব ঠিক রেখে প্রাসঙ্গিক পরিবর্তন-পরিমার্জন হওয়াটাই কাম্য। জেডএম/ |