
|
লক্ষ্মীপুরের ২৫৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক
প্রকাশ:
১৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:২৬ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
লক্ষ্মীপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ৭৩২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়গুলোতে অধ্যায়ন করছে প্রায় চার লাখ শিক্ষার্থী । এর মধ্যে ২৫৮টি বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক। এ ছাড়া সহকারী শিক্ষকের অনেক পদও শূন্য। শিক্ষক সংকটে এসব বিদ্যালয়ে ব্যাহত হচ্ছে শিশুশিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম। পাশাপাশি সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সংকটে জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তদারকি কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। জেলায় বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭৩২ হলেও কর্মকর্তা মাত্র ১৪ জন। ওসব কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। যথাযথ তদারকি না থাকায় বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার মান নিম্নমুখী হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন অভিভাবকরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কোনও বিদ্যালয়ে তিন বছর, কোনোটিতে ছয়-সাত বছর, কোনোটিতে ১৪ বছরে ওসব পদে নিয়োগ না হওয়ায় পাঠদানে ভাটা নামছে। অবসর গ্রহণ, সময়মতো পদোন্নতি না হওয়া এবং নতুন নিয়োগ বন্ধ থাকায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজ এবং পাঠদান সামলাতে হয়। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সদরের ১০৯ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও ৭০টিতে সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য। রায়পুর উপজেলার ১৬টিতে প্রধান শিক্ষক ও ২৫টিতে খালি সহকারী শিক্ষকের পদ। রামগঞ্জ উপজেলার ৭৪টিতে প্রধান শিক্ষক ও ৩৩ জন সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য। কমলনগর উপজেলায় ১৬টিতে প্রধান শিক্ষক ও নয় জন সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য। রামগতির ৪৩টিতে প্রধান শিক্ষক ও ২৩ জন সহকারী শিক্ষকের পদ খালি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি জেলার ৭৩২টি বিদ্যালয় পরিদর্শনের জন্য ৩৩টি সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৪ জন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা। দীর্ঘ প্রায় নয় থেকে ১০ বছর ধরে ১৯টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় নয়টি পদ শূন্য আছে। এই হিসাবে গড়ে ৫২টি বিদ্যালয় একজন কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছে। প্রতিদিন একটি বিদ্যালয় পরিদর্শন করলে একজন কর্মকর্তার সব কটি বিদ্যালয় পরিদর্শন শেষ করতে আড়াই মাস প্রয়োজন। অথচ ২০ থেকে ২৫টি বিদ্যালয় মনিটরিংয়ের জন্য একজন এটিও থাকার নিয়ম রয়েছে। এর মধ্যে রামগঞ্জ উপজেলায় শিক্ষা কর্মকর্তাই নেই। রায়পুরের সোনাপুর জীবনেন্নেছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক উত্তম কুমার শীল বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছি ১৪ বছর ধরে। এর মধ্যে একজন এসে এক বছর থেকে বদলি হয়ে চলে গেছেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অফিসের নথিপত্র, প্রশাসনিক কাজ এবং পাঠদান একসঙ্গে সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নিয়মিত প্রধান শিক্ষক থাকলে কাজের সমন্বয় সহজ হয়।’ একই কথা বলেছেন রায়পুর পৌরসভা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুন নাহার, দক্ষিণ রায়পুর বিএম বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক উত্তম কুমার পাইক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদর উপজেলার দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষক বলেছেন, ‘প্রধান শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক প্রধান হিসাবে কাজ করেন। এ ছাড়া শ্রেণিকক্ষে পাঠদানসহ আরও অনেক কাজ করতে হয় তাদের। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম নষ্ট হচ্ছে। এতে মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।’ রায়পুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দিন আহমেদ এবং রামগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইউছুফ জানান, গত কয়েক বছর ধরে সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদগুলো শূন্য পড়ে আছে। সহকারী শিক্ষকদের দিয়ে দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। এতে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া ব্যাহত হয়। শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সময় কমে যাচ্ছে। শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সময়মতো পদোন্নতি না হওয়াই এ সমস্যা তৈরি হয়েছে।’ রায়পুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু। এই পদ শূন্য থাকলে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষা কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক ও সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বছরের পর বছর না থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে সামগ্রিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এ ব্যাপারে রায়পুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মঈনুল ইসলাম ও রামগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা এমরান হোসেন জানান, বিধি অনুযায়ী ৬৫ শতাংশ প্রধান শিক্ষক সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে এবং ৩৫ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ হওয়ার কথা ছিল। এ নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে। মামলা জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন পদোন্নতি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এই শূন্যতা সৃষ্টি হয়। সরকার ইতোমধ্যে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে। দ্রুত মামলা জটিলতা নিরসন করে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে আশা করছি। এতে সব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদ পূরণ হবে এবং শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাজ্জাদ বলেন, ‘আমরা প্রতি মাসে সংশ্লিষ্ট দফতর ও মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে বিষয়টি জানাই। সরকারের ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় দ্রুত পদোন্নতি ও নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হলে এ সংকট নিরসন হবে বলে আশা করছি।’ জেডএম/ |