|| মাওলানা ইউসুফ সুলতান ||
যুদ্ধের তখন মাত্র তৃতীয় বা চতুর্থ দিন। পরপর দুই দিন, প্রথমে মালয়েশিয়ার টিমের সঙ্গে, এরপর বাংলাদেশের টিমের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছি। আলোচনার বিষয় ছিল, এই যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে, ব্যক্তি পর্যায়ে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এর প্রভাব কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে, এবং আমাদের স্ট্র্যাটেজিক ডিরেকশন কী হওয়া উচিত।
এর দু-একদিন পর মালয়েশিয়ার একটি বড় প্রতিষ্ঠানের ইফতার-পূর্ব একটি অনুষ্ঠানে যুক্ত হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে একাধিক শরীয়াহ স্কলারের সঙ্গে কথাবার্তা হয়। আমার মনে হয়েছে, তখনও অনেকে বিষয়টিকে পুরোপুরি সিরিয়াসভাবে বিবেচনা করছিলেন না। কিন্তু আমি তখনই টিমকে বলেছিলাম, এবারের যুদ্ধের প্রভাব পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি অর্থনীতিকেই কোনো না কোনোভাবে ছুঁয়ে যাবে। আমাদের সময়ে সর্বশেষ কোভিডে আমরা যে বৈশ্বিক ধাক্কা দেখেছি, অথবা তার আগে যে অর্থনৈতিক মন্দাগুলো দেখেছি, আল্লাহ না করুন, এবারের রিসেশন তার চেয়েও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে।
মালয়েশিয়ায় গত দুই সপ্তাহেই জ্বালানির দামে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বেড়েছে, এবং সামনে আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে নয়; পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থা, পণ্যমূল্য, বিদ্যুৎ এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও পড়বে। হয়তো সরকারি পর্যায়েও শীঘ্রই ওয়ার্ক ফ্রম হোম, জ্বালানি সাশ্রয়, বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ, এ ধরনের পদক্ষেপ সামনে আসতে পারে বলে সংবাদ হচ্ছে। যদিও মালয়েশিয়া নিজস্বভাবে কিছু জ্বালানি উৎপাদন করে, তবুও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও সংবেদনশীল। আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থার বড় অংশই আমদানিনির্ভর। যদিও গ্যাসের ক্ষেত্রে কিছুটা নিজস্ব সুবিধা আছে, তবুও বৈশ্বিক তেলের বাজার যখন অস্থির হয়ে যায়, তখন তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে, আমদানি ব্যয়ে, পরিবহন ব্যয়ে এবং বাজারদরে। সব মিলিয়ে আমরা হয়তো একটি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক চাপের দিকেই এগোচ্ছি।
এ অবস্থায় রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, পরিবার, সকল স্তরেই আমাদের খোলামেলা ও গভীর আলোচনা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্পেশাল টাস্কফোর্স তৈরি করা প্রয়োজন। যারা প্রচলিত অর্থনীতি ও ইসলামী অর্থনীতির সমন্বয়ে এই সংকটকালে নানা সমাধানে কাজ করার পরামর্শ দেবে। ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন সংকটকালে গণমানুষের মৌলিক চাহিদা - খাদ্য ও চিকিৎসা নিশ্চিতকরণে নানা কার্যকরী পদক্ষেপের নজীর আছে।
এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি বিষয় ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র, সবারই মাথায় রাখা দরকার।
► প্রথমত, বাস্তবতাকে জানা ও স্বীকার করা। আমরা একটি কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, অথবা খুব দ্রুত এমন এক সময়ের দিকে যাচ্ছি। এই বিষয়টি পরিবারে, প্রতিষ্ঠানে এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সবার বোঝা প্রয়োজন। সংকটের সময়ে কমন আন্ডারস্ট্যান্ডিং না থাকলে সিদ্ধান্তে বিশৃঙ্খলা আসে, ব্যয়ে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়, এবং মানসিক অস্থিরতাও বেড়ে যায়।
► দ্বিতীয়ত, ব্যয় সংকোচন। ভালো সময়ে মানুষ ও প্রতিষ্ঠান অনেক ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় করে, শপিং, বাইরে খাওয়া, অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ, অগ্রাধিকারহীন প্রকল্প, প্রদর্শনধর্মী ব্যয় ইত্যাদি। কিন্তু অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে এসব ব্যয় কমিয়ে আনা খুব জরুরি। শুধু অতিরিক্ত ব্যয় নয়, প্রয়োজনীয় ব্যয়ের মধ্যেও কোথায় কীভাবে আরও সংযমী হওয়া যায়, সেটিও নতুন করে দেখা উচিত। পরিবারে বাজেট করা, প্রতিষ্ঠানে ব্যয়ের খাত রিভিউ করা, এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প স্থগিত রাখা জরুরী।
অপচয় সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার ভাষা খুবই কঠিন:
إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ
“নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।” (সূরা ইসরা, ১৭:২৭)
আর ব্যয়ের ভারসাম্য সম্পর্কে তিনি বলেন:
وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا
“আর তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপচয়ও করে না, কৃপণতাও করে না; বরং এ দুয়ের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে।” (সূরা ফুরকান, ২৫:৬৭)
আজকের বাস্তবতায় এই ভারসাম্যই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। না আতঙ্কে সব বন্ধ করে দেওয়া, না বেপরোয়াভাবে চলা, বরং হিসাবী, সংযমী ও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।
► তৃতীয়ত, সকল প্রকার হারাম আয় থেকে সম্পূর্ণরূপে বের হয়ে আসা। হারাম আয় বাহ্যিক পরিমাণে হয়তো বেশি দেখা যায়, কিন্তু তা বারাকাহ নষ্ট করে দেয়। আর বারাকাহ কী জিনিস, তা মানুষ সবচেয়ে বেশি অনুভব করে মুসিবত ও সংকটের সময়ে। যখন আয় কমে যায়, বাজার অস্থির হয়, অসুস্থতা বা অনিশ্চয়তা বাড়ে, তখন অল্প সম্পদেও নিরাপদ থাকা, অল্প উপার্জনেও প্রয়োজন মিটে যাওয়া, সামান্যতে শান্তি পাওয়া, এসবই বারাকাহর প্রকাশ।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ
“আল্লাহ রিবা/ সুদকে ধ্বংস করেন এবং সদকাহকে বৃদ্ধি করেন।” (সূরা বাকারা, ২:২৭৬)
► চতুর্থত, দান-সদকা বাড়িয়ে দেওয়া। এ ধরনের সময়েই দান-সদকার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। একদিকে দান-সদকা সম্পদে সুরক্ষা ও বারাকাহ আনে, অন্যদিকে সমাজের দুর্বল মানুষদের টিকিয়ে রাখে। সংকটের সময় সবচেয়ে আগে আক্রান্ত হন নিম্নবিত্ত মানুষ, দিন আনে দিন খায় এমন পরিবার, একক উপার্জননির্ভর পরিবার, ছোট ব্যবসায়ী, দিনমজুর, অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা। তাই আমাদের আশেপাশের প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, কর্মচারী, সহকর্মী, কারা কষ্টে আছেন, তা খোঁজ নেওয়া খুব জরুরি। বিপদের সময় একে অপরের পাশে দাঁড়ানোই সমাজকে টিকিয়ে রাখে।
রাসূল স. বলেন:
مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ
“সদকাহ কোনো সম্পদ কমিয়ে দেয় না।” (সহীহ মুসলিম: ২৫৮৮)
আল্লাহ তা'য়ালা বলেন:
وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ رِبًا لِيَرْبُوَ فِي أَمْوَالِ النَّاسِ فَلَا يَرْبُو عِنْدَ اللَّهِ ۖ وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ زَكَاةٍ تُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُضْعِفُونَ
"মানুষের ধন-সম্পদে বৃদ্ধি পাবে বলে তোমরা যে সুদ দাও, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। পক্ষান্তরে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তোমরা যে যাকাত দাও (তাই বৃদ্ধি পায়); বস্তুত তারাই হচ্ছে দ্বিগুণ লাভকারী।" (সূরা রূম, ৩০:৩৯)
► পঞ্চমত, কৃত্রিম সংকট তৈরি না করা। ব্যবসায়ীদের জন্য এটি একটি বড় আমানাহ। অপ্রয়োজনে মূল্য বৃদ্ধি, মজুতদারি, কৃত্রিম ঘাটতি সৃষ্টি, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করা, এসব শুধু অনৈতিক নয়, শরীয়াহর দৃষ্টিতেও নিন্দনীয়। অনিশ্চিত সময়ে বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
مَنِ احْتَكَرَ فَهُوَ خَاطِئٌ
“যে ব্যক্তি মজুতদারি করে, সে গুনাহগার।” (সহীহ মুসলিম: ১৬০৫)
► ষষ্ঠত, প্যানিক বাইং থেকে বিরত থাকা। ব্যক্তি পর্যায়ে অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত জিনিস মজুত করতে শুরু করে। এতে নিজের জন্য সাময়িক নিরাপত্তার অনুভূতি এলেও সামগ্রিক বাজারে অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হয়, সরবরাহে চাপ পড়ে, এবং সংকট আরও ঘনীভূত হয়। তাই প্রয়োজনমাফিক কেনাকাটা করা, অযথা আতঙ্কে আচরণ না করা এবং অন্যদের জন্যও বাজারকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করা, এটিও দায়িত্বশীল আচরণের অংশ।
► সপ্তমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে মনোযোগী হওয়া। ব্যক্তিগত ঘর থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত, সব জায়গায় সাময়িকভাবে হলেও আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কোথায় বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে, কোথায় যাতায়াতে সাশ্রয় করা যায়, কোথায় বিকল্প পদ্ধতি নেওয়া যায়, এসব বাস্তবভাবে ভেবে দেখা দরকার।
সবশেষে, এ সময় আমাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা। বিশ্লেষণ দরকার, পরিকল্পনা দরকার, কৌশল দরকার, কিন্তু সবকিছুর ওপরে দরকার দোয়া, তাওবা, ইস্তিগফার এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
“আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন। এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দেন, যা সে কল্পনাও করে না।” (সূরা ত্বালাক, ৬৫:২-৩)
আজকের বাস্তবতায় এই সবর জন্য বড় মোটিভেশন।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। মুসলিম বিশ্বকে নিরাপদ রাখুন। আমাদের রিযিকে বারাকাহ দিন। আমাদের সিদ্ধান্তে হিকমাহ দিন। আমাদেরকে হালাল, সংযমী, দায়িত্বশীল জীবন যাপনের তাওফিক দিন। আর এই ফিতনা, অস্থিরতা, বিভক্তি, দুর্বলতা ও বৈশ্বিক বিপর্যয় থেকে উম্মাহকে উত্তমভাবে বের করে আনুন। আমিন।
লেখক: তরুণ আলেম ও বিশিষ্ট অর্থনীতি বিশারদ
এমএম/