বেফাকের মেধা তালিকায় এক মাদরাসার ৬৫৩ শিক্ষার্থী, সাফল্যের রহস্য কী?
প্রকাশ: ১৮ মার্চ, ২০২৬, ০৪:৩৩ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| নিজস্ব প্রতিবেদক ||

বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) ৪৯তম কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় অবস্থিত অন্যতম দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়াতুস সুন্নাহ। এবারের পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন জামাত থেকে সর্বমোট ৬৫৩ জন শিক্ষার্থী মেধা তালিকায় নাম লিখিয়ে এক অনন্য রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি এবারসহ টানা ১৫ বছর ধরে বেফাকে শীর্ষস্থান অর্জন করে আসছে।

আজ বুধবার (১৮ মার্চ) বেফাকের ফলাফল প্রকাশের পর জামিয়াতুস সুন্নাহ-এর শিক্ষার্থীদের এই সাফল্যে শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।

প্রকাশিত ফলাফল ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, জামিয়াতুস সুন্নাহ-এর বিভিন্ন স্তরে মেধা তালিকায় স্থান পাওয়া ৬৫৩ জন পরীক্ষার্থীদের মধ্যে মিশকাত (ফজিলত) ৫ জন, শরহে বেকায়া (সানাবিয়া উলিয়া) ৩৭ জন, কাফিয়া (সানাবিয়া) ২৮ জন, নাহবেমীর (মুতাওয়াসসিতা) ১৮০ জন, তাইসির (ইবতিদাইয়্যাহ) ৩৫৯ জন, হিফজুল কোরআন ৪৩ জন এবং ইলমুত তাজবীদ ওয়াল কিরাত ১ জন।

টানা ১৫ বছর নিজেদের প্রথম স্থানে ধরে রাখার মতো কঠিন বিষয়টি কিভাবে সম্ভব হলো? জানতে চাইলে জামিয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা নেয়ামতুল্লাহ ফরিদী বলেন, মাদরাসার শিক্ষকগণ শতভাগ আবাসিক। তারা ছাত্রদের সার্বক্ষণিক নেগরানি করেন। শিক্ষকদের নিবিড় পরিচর্যা ও তত্ত্বাবধানই ভালো ফলাফলের মূল রহস্য।

‘সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মাদরাসায় ঠিক মতো ক্লাস হয় এবং ক্লাসে সবক বুঝে নেয়া হয়। ছাত্ররাও শিক্ষকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিশ্রম করে।’—যোগ করেন মাওলানা ফরিদী।

ভালো ফলাফলের জন্য ভালো ছাত্র নির্বাচন করা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ? উত্তরে তিনি বলেন, ভালো ফলাফল তো ভালো শিক্ষার্থীদের মাধ্যমেই হয়। ছাত্র নির্বাচন যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রত্যেক জামাতে ছাত্র ভর্তির সময় সবচেয়ে যোগ্য ছাত্রদের নির্বাচনের চেষ্টা করি। তবে শুধু পরীক্ষা ভালো করবে এমন ছাত্র খুঁজি না। বরং ভালো কিতাব বুঝে, আমল আখলাক ভালো এমন ছাত্রকেই আমরা প্রাধান্য দেই।

জামিয়াতুস সুন্নাহ কীভাবে ছাত্রদের প্রস্তুত করে সে বিষয়ে জানতে চাইলে মাওলানা নেয়ামতুল্লাহ ফরিদী জানান, ‘ভর্তির জন্য যে ন্যূনতম মার্কস পাওয়া আবশ্যক, তা পেলেই আমরা ছাত্রদের ভর্তি করিয়ে নেই। তা কিন্তু একশো তে আশি নয়। এরপর ছাত্রদের পেছনে আমরা সর্বোচ্চ শ্রম ব্যয় করি। শিক্ষকদের শ্রম ও ছাত্রদের আন্তরিক চেষ্টায় একজন ছাত্র ধীরে ধীরে যোগ্য হয়ে ওঠে। একটি ছেলে যে মাকবুল (পাশ মার্কস পাওয়া) পর্যায়ের যোগ্যতা নিয়ে ভর্তি হওয়ার ছয় মাস পর তার যোগ্যতা জায়্যিদ জিদ্দান পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আলহামদুলিল্লাহ!’

তিনি মনে করেন, শ্রেণি কক্ষই একজন ছাত্রের যোগ্য হওয়ার মূল কারখানা। শ্রেণি কক্ষে দুর্বলতা থাকলে অন্য প্রচেষ্টায় ছাত্রদের যোগ্য হওয়া কঠিন। তাই তিনি শ্রেণি কক্ষের উপরই সবচেয়ে গুরুত্ব দেন। সময় মতো ক্লাস হওয়া, ছাত্র-শিক্ষকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং পাঠদান ও গ্রহণ সন্তোষজনক হচ্ছে কিনা তিনি নিয়মিত খোঁজ নেন। মাদরাসার সার্বিক লেখাপড়া ও তরবিয়্যাত পর্যালোচনার জন্য প্রতি সপ্তাহে উস্তাদদের মিটিং অনুষ্ঠিত হয়।

বেফাকভূক্ত জামাতের জন্য আলাদা কোনো প্রস্তুতি ও প্রচেষ্টা আছে কিনা জানতে চাইলে জামিয়াতুস সুন্নাহ-এর প্রিন্সিপাল বলেন, ‘আমি যাওয়ার পূর্বে জামিয়ার একটি বদনাম ছিলো যে, বেফাকের জামাতে ভালো লেখাপড়া হয় এবং অন্য জামাতে তেমন হয় না। আমি এসে সব জামাতে যেনো সমান গুরুত্বে লেখা পড়া হয় তার উপর গুরুত্ব দেই। আলহামদুলিল্লাহ! সব জামাতে সমমানের লেখাপড়া হয়। তবে হ্যা, কোনো প্রস্তুতিই যে আলাদা করে নেয়া হয় না, তাও নয়। সাধারণভাবে সব জামাতেই সাপ্তাহিক পরীক্ষা আছে। এর বাইরে বেফাকভূক্ত জামাতে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার পর একটি মডেল টেস্ট হয়। এ টেস্টের পূর্বে ছাত্ররা ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে।’

১৯৯০ সালে মাদরাসার প্রতিষ্ঠাকালীন নাম ছিলো জামিয়া মোহাম্মাদিয়া ফয়জুল উলুম। ২০০০ সালে আল্লামা মাহমুদুল হাসানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বৃহৎ পরিসরে জামিয়ার বর্তমান ঠিকানায় স্থানান্তরিত হয়। এরপর আল্লামা মাহমুদুল হাসানের তত্ত্বাবধান ও শিল্পপতি আলহাজ্জ বাদশাহ মিয়ার উদার সহযোগিতায় জামিয়ার আজকের মহীরূহ অবকাঠামো গড়ে উঠে।

প্রতিষ্ঠাকাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি বেফাকে ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে আসছে। ফলাফলে দেখা যায় অন্যান্য বছরের মতো এবারও তারা আছেন শীর্ষে। এ নিয়ে টানা ১২ বছর বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় নিজেদের প্রথম স্থানে ধরে রেখেছে মাদারীপুর জেলার জামিয়াতুস সুন্নাহ শিবচর মাদরাসা।

এদিকে, আজ বুধবার (১৮ মার্চ) বেফাক মিলনায়তনে দুপুর ১১টায় বেফাক মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বোর্ডের ৪৯তম কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করেন। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, গড় পাসের হার  ৮০:৯৫%। মুমতায (স্টার মার্ক) ৫৩,৫০০ জন। জায়্যিদ জিদ্দান (প্রথম বিভাগ) ৫৫,৭৪৭ জন। জায়্যিদ (২য় বিভাগ) ৬৫,৬৭৩ জন। মাকবুল (৩য় বিভাগ) ১,১১,৬৭১ জন। মোট উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থী ২,৮৬,৫৯১ জন।

পরীক্ষার ফলাফলের যাবতীয় তথ্য বেফাকের নিজস্ব ওয়েবসাইট (www.wifaqresult.com)-এ পাওয়া যাবে।

উল্লেখ্য, গত ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ঈসাব্দ হতে ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ঈসাব্দ পর্যন্ত সারা দেশের ৫৯৮টি দরসিয়াত ছাত্র ও ১৩৩৮টি দরসিয়াত ছাত্রী কেন্দ্রে, ৩৯৯টি হিফয ছাত্র ও ৫০টি হিফয ছাত্রী কেন্দ্রে এবং ২২টি ইলমুত তাজবীদ ওয়াল কিরাআত (ছাত্র-ছাত্রী) কেন্দ্রে মোট ৭টি স্তরে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারী মোট পরীক্ষার্থী ৩,৫৪,০৩৬ জন।

এতে দরসিয়াত ছাত্র অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ১,০৩,৫৮৪ জন, ছাত্রী অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ২,০৯,২৪২ জন, তাহফিজুল কুরআন ছাত্র অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ৩৭,৬৮৫ জন, ছাত্রী অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ২,৪৭৪ জন ও ইলমুত তাজবীদ ওয়াল কিরাআত অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ১,০৫১ জন।

আইএইচ/