সদাকাতুল ফিতর কী ও কেন?
প্রকাশ: ১৫ মার্চ, ২০২৬, ১২:৩৭ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| আল আমীন বিন সাবের আলী ||

আমাদের নামাযে ভুল-ভ্রান্তি হলে যেমন আমরা সিজদায়ে সাহু দিয়ে থাকি, ঠিক তেমনি রোজা রেখেও আমাদের ভুল ভ্রান্তি হয়। মিথ্যা ও অনর্থক কথা বলা, গিবত করা, গালিগালাজ করা ইত্যাদি। এতে রোযার ক্ষতি হয়। ওই ভুল-ভ্রান্তিগুলো ঠিক হয় সদাকাতুল ফিতরের দ্বারা। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণিত, ‘রাসূল সা. সদাকাতুল ফিতরকে অপরিহার্য করেছেন– অর্থহীন, অশালীন কথা ও কাজে রোজার যে ক্ষতি হয় তা পূরণের জন্য এবং নিঃস্ব লোকের আহার জোগানোর জন্য’। (আবু দাউদ, ১/২২৭)

কারা আদায় করবে? 
যে মুসলমানের কাছে এতোটুকু পরিমাণ সম্পদ আছে যার উপর জাকাত ফরজ হয়, কিংবা জাকাত ফরজ না হলেও ঋণ, প্রয়োজনীয় ও ব্যবহার্য্য আসবাবের অতিরিক্ত সাড়ে ৫২ ভরি রুপার সমমূল্যের আসবাবপত্র (চাই তা ব্যবসার জন্য হোক বা না হোক, এর উপর বছর অতিক্রান্ত হোক বা না হোক) ঈদুল ফিতরের দিন সকালে যার কাছে থাকে তার উপর সদকা দেওয়া ওয়াজিব। এই সদকাকেই শরীয়তের পরিভাষায় 'সদাকাতুল ফিতর' বলে। উক্ত সদকার ক্ষেত্রে নারী এবং পুরুষ উভয়ের হুকুম সমান। তবে পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, নারীর নিজের সদকা নিজের উপরই ওয়াজিব। তার উপর কারো পক্ষ থেকে সদকা ওয়াজিব নয়। কিন্তু পুরুষের উপর নিজের এবং নাবালেগ সন্তানাদির (মালদার না হলে) সদকাও ওয়াজিব। তবে সে তার বালেগ সন্তান ও স্ত্রীর সদকা তাদের অনুমতিক্রমে আদায় করলে আদায় হয়ে যাবে। (ফাতাওয়া বিন্নুরী টাউন করাচি) আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, 'রাসূল সা. সদাকাতুল ফিতর অপরিহার্য করেছেন, এক সা' খেজুর বা যব কিংবা আধা সা' গম –গোলাম, স্বাধীন, নারী, পুরুষ ও ছোট, বড় প্রত্যেকের উপর।' (আবু দাউদ, হা. ১৬২২)

কখন আদায় করবে?
ঈদুল ফিতরের দিন যখন ফজরের সময় শুরু হয় তখনই সদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয়। রমজান মাসেও তা আদায় করা যায়। তবে ঈদুল ফিতরের নামাজের আগেই তা আদায় করবে। এতে সে পূর্ণাঙ্গ সওয়াবের অধিকারী হবে। যদি ঈদের নামাজের আগে আদায় করতে না পারে তাহলে নামাজের পরে আদায় করবে। এতে সওয়াব কম হবে। আর ঈদের দিনের মধ্যে আদায় করতে ব্যর্থ হলে পরে তা আদায় করতেই হবে। কিন্তু তা খেলাফে সুন্নত–মাকরূহ হবে। (প্রাগুক্ত)

কী দিয়ে আদায় করবে? 
এই সদকার পরিমাণ কি এবং কি দিয়ে আদায় করবে– তা জানার আগে আরেকটি বিষয় হলো, আমাদের দেশের কিছু ভাইয়ের ধারণা, টাকা দ্বারা সদাকাতুল ফিতর আদায় করলে তা আদায় হবে না। কারণ, টাকা দ্বারা আদায় করার কথা হাদিসে পাওয়া যায় না। তাদের এ ধারণা ঠিক নয়। কেননা আকাবির ও আসলাফের যুগে আমরা এর অসংখ্য নজির দেখতে পাই। ইমাম বুখারী রহ. তার সহিহ বুখারীতে মুয়াজ রা. -এর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। তিনি ইয়ামানবাসীকে বলেন, 'তোমরা সদকার মধ্যে খাদ্যদ্রব্যের পরিবর্তে কাপড় নিয়ে এসো। কেননা সেটি তোমাদের জন্য অধিকতর সহজ এবং মদিনার সাহাবীগণের জন্যও অধিক উপযোগী।' (বুখারী, হা. ১১৪৭) আতা রহ. বর্ণনা করেন, 'ওমর রা. সদকার ক্ষেত্রে টাকা ইত্যাদি গ্রহণ করতেন।' (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা. ১০৫৩৯) প্রসিদ্ধ তাবেয়ি হাসান বসরী রহ. বলেন, 'সদাকাতুল ফিতর দেরহাম দ্বারা প্রদান করতে কোনো সমস্যা নেই।' (প্রাগুক্ত) 

তাই হানাফী ফিকহ অনুযায়ী (নিম্নোক্ত দ্রব্যাদীর পরিবর্তে) টাকা দ্বারা সদাকাতুল ফিতর প্রদান করা উত্তম। তবে হাদিস ও সুন্নাহয় বর্ণিত এই সদকার পরিমাণের মাপকাঠি ২টি : সা' ও নিসফে সা'। অর্থাৎ –যব, খেজুর, পনির ও কিসমিস দ্বারা আদায় করলে এক সা'। আর গম দ্বারা আদায় করলে নিসফে সা' প্রযোজ্য। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. বর্ণনা করেন,  রাসূল সা. একজন ঘোষককে বলেন, 'সে যেন মক্কার পথে পথে ঘোষণা করে –জেনে রেখো, প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, গোলাম-স্বাধীন, ছোট-বড় সবার উপর সদাকাতুল ফিতর অপরিহার্য। দুই মুদ (আধা সা') গম কিংবা এক সা' অন্য খাদ্যদ্রব্য।' (তিরমিজি, ৬৭৪)

সেই মাপকাঠি বর্তমানের টাকার হিসাবে নিম্নোক্ত– 
(এবারের সরকারীভাবে নির্ধারিত সদাকাতুল ফিতরার পরিমাণ মোতাবেক উল্লেখ করা হলো,)
১। গমের হিসাব ধরা হলে, ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম। মূল্য প্রায় ১১০ টাকা। এটা বর্তমানের জনপ্রতি সর্বনিম্ন হার। 
২। যবের হিসাব ধরা হলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম। মূল্য প্রায় ৫৯৫ টাকা। 
৩। খেজুরের হিসাব ধরা হলে, ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম। মূল্য প্রায় ২৪৭৫ টাকা। 
৪। কিসমিসের হিসাব ধরা হলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম। মূল্য প্রায় ২৬৪০ টাকা। 
৫। পনিরের হিসাব ধরা হলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম। মূল্য প্রায় ২৮০৫ টাকা। –(ইফা)
প্রত্যেকে নিজ সাধ্য অনুযায়ী দেওয়া ভালো। সর্বনিম্ন হারে প্রদান করা হলেও দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে।
স্থানীয় বাজার মূল্য হিসেবে সদাকাতুল ফিতরের পরিমাণ কম বেশি হতে পারে। তাই স্থানীয় বাজার মূল্য অনুযায়ী তা আদায় করা সমীচীন। 

সামর্থ্যবানদের জন্য উচিত হবে, ফিতরার সর্বনিম্ন হারকে নিজেদের জন্য গ্রহণ না করে উচ্চ হারগুলো প্রতিষ্ঠিত করা। যাতে সমাজের অসহায় মানুষরা বেশি লাভবান হয়। 

জরুরি মাসয়ালা
১। যার কাছে নেসাব আছে তার উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব। যার কাছে নেসাব নেই তার জন্য ওয়াজিব নয়, কিন্তু সে নিজ দায়িত্বে দিবে। 
২। ফকিরও সদকায়ে ফিতর দিবে, আরেক ফকিরকে। সে ফকির আবার দিবে আরেক ফকিরকে। কারণ,  প্রত্যেকেরই রোযা ঠিক করা বাঞ্ছনীয়।
৩। কোনো ব্যক্তি রোজা না রাখলে বা রাখতে না পারলেও ফিতরা দেওয়া তার উপর ওয়াজিব। এমন নয় যে, রোজা না রাখলে ফিতরা দিতে হয় না। 
৪। জাকাত দেওয়া যায় যাদের ফিতরাও তাদেরকেই দেওয়া যায়। এর ব্যতিক্রম করা যাবে না।
৫। একজনের ফিতরা একজনকে দেয়া বা একজনের ফিতরা কয়েকজনকে দেয়া– দুনো সুরতই জায়েজ আছে। কয়েকজনের ফিতরাও একজনকে দেয়া দূরস্ত আছে। কিন্তু তার দ্বারা যেন সে নেসাবের মালিক হয়ে না যায়। অধিকতর উত্তম হলো, একজনকে এই পরিমাণ ফিতরা দেয়া, যার দ্বারা সে ছোটখাটো প্রয়োজন পূরণ করতে পারে বা পরিবার-পরিজন নিয়ে দু'তিন বেলা খেতে পারে।  

লেখক: পরিদর্শক, বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক)

 এমএম/