রাজনৈতিক দল পরিবর্তন দোষের কিছু নয়, তবে...
প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:০৮ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| মুনীরুল ইসলাম ||

একজন মানুষ যখন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, তখন তিনি কেবল একটি প্রতীকে ভোট দেন না, তিনি সমর্থন জানান একটি বিশ্বাস, আদর্শ এবং প্রত্যাশায়। সেই বিশ্বাস, আদর্শ বা প্রত্যাশা যদি সময়ের পরিক্রমায় পরিবর্তিত হয়, প্রতিশ্রুতির জায়গায় ওঠে আসে প্রতারণা, উন্নয়নের জায়গায় গড়ে ওঠে দুর্নীতি ও লুটপাটের সংস্কৃতি; তাহলে কি একজন সচেতন নাগরিকের চুপচাপ বসে থাকা উচিত? নিশ্চয়ই নয়। বরং তখন তার বিবেক তাকে নাড়া দেয় নতুন করে ভাবতে, বিশ্লেষণ করতে এবং প্রয়োজনে নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে। তাই রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করা কখনো অপরাধ নয়, এটি গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এবং নাগরিক স্বাধীনতার স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ।


কেউ কেউ রাজনীতিকে ধর্মের মতো মনে করে, যেখানে দল একবার বেছে নিলে আজীবন সেই দলের হয়েই থাকতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভুল ও বিপজ্জনক। কারণ, ধর্ম হলো চিরন্তন বিশ্বাস, আর রাজনীতি হলো সময়-সমাজ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তনশীল একটি সংগঠন মাত্র। কোনো দল এক সময় ভালো কাজ করলেও পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার লোভে, ব্যক্তিস্বার্থে বা গোষ্ঠীগত প্রভাবে নীতিহীন হয়ে পড়তে পারে। তখন একজন বিবেকবান ভোটার যদি মনে করেন, অন্য দল বর্তমানে জনগণের কল্যাণে বেশি ভূমিকা রাখছে, তাহলে সেই দলকে সমর্থন করা তার নাগরিক দায়িত্বেরই অংশ।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা প্রায়ই দেখি, একজন ভোটার কোনো দলের সমালোচনা করলে তাকে সহজেই ‘সুবিধাবাদী’, ‘স্বার্থপর’, ‘বিশ্বাসঘাতক’ ইত্যাদি তকমা দেওয়া হয়। অথচ রাজনৈতিক পরিপক্বতা মানে হলো, নিজেকে এক জায়গায় আটকে না রেখে সময়ের প্রেক্ষিতে উপযুক্ত দলকে সমর্থন দেওয়া। ভোটারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের উন্নয়ন, ন্যায়বিচার, সুশাসন ও জনগণের কল্যাণ। যেই দল এসব মূল্যবোধ রক্ষা করবে, সেই দলের পাশে দাঁড়ানোই একজন সচেতন বিবেকবান নাগরিকের পরিচয়। যেই দেশে ভোটাররা চিন্তাশীল, যুক্তিনিষ্ঠ ও নীতিনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নেয়, সেই দেশই উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে। কারণ, নির্বাচনের মানেই হলো বিকল্পের সুযোগ। যদি মানুষ চিরকাল একদলীয় আনুগত্যে অন্ধ থাকে, তাহলে সেখানে আর গণতন্ত্র থাকে না; থেকে যায় কেবল নামমাত্র ভোট। 


আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের ইতিহাসে বহু প্রার্থী দল পরিবর্তন করেছেন। কেউ আদর্শগত কারণে, কেউ নীতিগত মতবিরোধে, কেউ রাজনৈতিক বাস্তবতার চাপে। কিন্তু সবসময়ই এটি ভুল নয়। একজন প্রার্থী যদি দেখেন তার দলে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে, সৎ ও মেধাবী মানুষগুলোকে দূরে সরিয়ে কেবল চাটুকারদের মূল্য দেওয়া হচ্ছে, তখন সেই প্রার্থী যদি অন্য দলে গিয়ে জনসেবার সুযোগ খোঁজেন, তা অনৈতিক নয়। সেটি তার নৈতিক জাগরণের প্রমাণ। রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য জনগণের কল্যাণ। দল একটি মাধ্যম মাত্র। এই মাধ্যমের লক্ষ্য যদি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ না করে, তাহলে নতুন মাধ্যমের খোঁজ করা নাগরিকের অধিকার। যেভাবে একজন ছাত্র ভালো শিক্ষা পেতে শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করে, যেভাবে একজন কর্মী ভালো পরিবেশের খোঁজে কর্মস্থল পরিবর্তন করে, সেভাবেই একজন ভোটার বা রাজনীতিকও নিজের বিবেক অনুসারে দল পরিবর্তন করতে পারে। এটি ব্যক্তিস্বাধীনতা, নৈতিক বোধ এবং মানবিক যুক্তিরই ধারাবাহিকতা।


অনেকেই বলেন, দল পরিবর্তন করা মানে আদর্শ পরিবর্তন করা। কিন্তু আদর্শ তো একক কোনো দলের সম্পত্তি নয়। সত্য, ন্যায়, উন্নয়ন, জনগণের কল্যাণ এই মূল্যবোধগুলো কোনো দলের একচেটিয়া নয়। বরং যেই দল এই আদর্শগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে, সেই দলই প্রকৃতভাবে সমর্থনযোগ্য। একজন সচেতন নাগরিক যখন দেখে তার পুরোনো দল এই মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তখন সে নতুনভাবে চিন্তা করে। তাছাড়া রাজনৈতিক দল মানে নিছক একটি ব্যানার বা প্রতীক নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে নীতি, নেতৃত্ব, নৈতিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি। এক সময় যেই দল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করত, সেটি হয়তো পরে অন্যায়ের পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠতে পারে। আবার যেই দল এক সময় দুর্বল ছিল, সেটি নতুন নেতৃত্বে সৎ ও কার্যকর হতে পারে। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলগুলোর চরিত্র পরিবর্তন হয় এবং একজন নাগরিকের দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তিত হতে বাধ্য। এটি জীবন ও সমাজের স্বাভাবিক বিবর্তনের মতোই একটি প্রক্রিয়া।


যদি কেউ দল পরিবর্তন করাকে অপরাধ হিসেবে দেখেন, তাহলে গণতন্ত্রের মূল দর্শনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। কারণ গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো, ‘বিকল্প বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা’। এই স্বাধীনতা না থাকলে মানুষ শুধু ভোট দেওয়ার যন্ত্রে পরিণত হয়। একটি সুস্থ সমাজে মানুষের এই বিকল্প বেছে নেওয়ার ক্ষমতাই রাজনীতিকে দায়বদ্ধ রাখে। যখন কোনো দল জানে যে, ভোটারদের বিশ্বাস হারালে তারা অন্য দলের দিকে চলে যাবে, তখন তারা নিজেদের আচরণে সতর্ক থাকে। তাই ভোটারের দল পরিবর্তনের সম্ভাবনাই রাজনীতিতে দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করে। আজকের বিশ্বে আমরা দেখি, উন্নত দেশগুলোর নাগরিকরা কোনো দলকে চিরকালীনভাবে অনুসরণ করেন না। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া সব দেশেই মানুষ প্রার্থীর কাজ, নীতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দেখে ভোট দেয়। কেউ রিপাবলিকান থেকে ডেমোক্র্যাট হয়, কেউ কনজারভেটিভ থেকে লিবারেল। কিন্তু এতে কোনো বিতর্ক হয় না। বরং এটি গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার পরিচায়ক। কারণ তারা বুঝে, রাজনীতি হলো সেবার প্রতিযোগিতা, পূজার নয়।


আমাদের সমাজে দলান্ধতা একটি বড় সমস্যা। অনেকেই মনে করেন, যেই দলে শুরু থেকেই সমর্থন দিয়ে আসছেন, সেটাই চিরদিনের আশ্রয়স্থল। কিন্তু রাজনীতি কোনো বংশানুক্রমিক প্রতিষ্ঠান নয়। এখানে মূল্যায়ন হতে হবে কর্মের ভিত্তিতে। যদি কোনো দল তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, জনগণের টাকায় বিলাসিতা করে, জনগণের কণ্ঠরোধ করে; তাহলে সেই দলকে ত্যাগ করা ন্যায়েরই অংশ। 


মানুষ তার জীবনে বারবার পরিবর্তন আনে। কেউ পেশা পরিবর্তন করে, কেউ ধর্ম পর্যন্ত পরিবর্তন করে শুধু সত্য ও শান্তির সন্ধানে। তাহলে রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করা কেন অন্যায় হবে? মানুষ তার আত্মাকে শান্ত রাখতে চায়, তার বোধ ও বিবেকের সঙ্গে আপস করতে চায় না। রাজনীতিও সেই বিবেকেরই একটি দিক। একজন মানুষ যদি অনুভব করে, তার পূর্বের দল অন্যায়, মিথ্যা ও ভণ্ডামিতে নিমজ্জিত, তাহলে সেটি ত্যাগ করা তার নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের সমাজে দল পরিবর্তনকারীদের প্রায়ই সন্দেহের চোখে দেখা হয়। অথচ রাজনীতিতে স্থির থাকা মানেই সবসময় সঠিক থাকা নয়। বরং যিনি সময় বুঝে পরিবর্তন করেন, তিনিই বাস্তবতাকে বোঝেন। তিনি মনে করেন, রাজনীতি কোনো পাথরে খোদাই করা ওয়াদা নয়; এটি পরিবর্তনশীল জীবনের একটি চলমান ধারা।


আমরা যদি ইতিহাস দেখি, অনেক বিশ্বনেতা একাধিক দল বা মতবাদ পরিবর্তন করেছেন। নেলসন ম্যান্ডেলা, উইনস্টন চার্চিল, এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসেও আমরা দেখি অনেক নেতা সময়ের প্রয়োজনে দল পরিবর্তন করেছেন। কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধের আগে এক রাজনৈতিক দলে ছিলেন, পরে অন্য দলে গিয়ে জাতির নেতৃত্ব দিয়েছেন। ইতিহাস তাদের অপরাধী করে না, বরং সময় প্রমাণ করে তারা সেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বৃহত্তর কল্যাণের পথে হেঁটেছিলেন। সুতরাং দল পরিবর্তন মানে শুধু নিজস্ব স্বার্থ নয়; এটি হতে পারে একটি নতুন দায়বদ্ধতার শুরু। একজন মানুষ যখন নিজের চিন্তায় পরিবর্তন আনে, তখন সে নিজের চারপাশের বাস্তবতাকে নতুন চোখে দেখতে শেখে। রাজনৈতিক দল পরিবর্তনও ঠিক তেমনই একটি নতুন উপলব্ধির জন্ম দেয়।


আজকের তরুণ প্রজন্ম আগের প্রজন্মের মতো অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাস করে না। তারা দেখে, বিশ্লেষণ করে, প্রশ্ন করে। তারা যদি দেখে একদল উন্নয়নের নামে দুর্নীতি করছে, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি করছে, আরেকদল সত্যিই ধর্ম ও দেশের জন্য কাজ করছে; তাহলে তারা স্বাভাবিকভাবেই ভালো দলের দিকে যাবে। এটিই সভ্যতার অগ্রগতি। তাই যখন কোনো ভোটার দল পরিবর্তন করে সময়ের আরো ভালো দলে যোগ দেন, তখন তাকে গালি না দিয়ে শ্রদ্ধা করা উচিত। দল পরিবর্তনের এই সংস্কৃতিই দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করে। কারণ এতে প্রতিটি দল জানে, জনগণের আস্থা অর্জন করাই টিকে থাকার একমাত্র উপায়। এতে প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিতা তৈরি হয় এবং রাজনীতি পরিণত হয় সেবার মাধ্যম হিসেবে। তবে ন্যায়নীতির তোয়াক্কা না করে নিছক ব্যক্তি স্বার্থে যারা দল পরিবর্তন করে তুলনামূলক নিম্নমানের দলে যোগ দেয়, তারা ক্ষমতা লোভী ও সুবিধাবাদীই বটে। এমন চরিত্রের লোকজনই দেশের উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।


পরিশেষে আবারো বলি রাজনৈতিক দল পরিবর্তন কোনো লজ্জার বিষয় নয়; বরং এটি মুক্ত চিন্তার বিজয়। মানুষ জন্মের পর যেমন ধর্ম, পেশা, বাসস্থান বা জীবনধারা পরিবর্তন করতে পারে; তেমনি রাজনৈতিক মতও পরিবর্তন করতে পারে। এটি নাগরিক স্বাধীনতা ও মানবিক বিবেকের অংশ। একজন সচেতন নাগরিক কখনো এক দলের অন্ধ অনুসারী হতে পারে না। যখন সেই দল সত্য ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তখন দল পরিবর্তন করাই বিবেকবান নাগরিকের পরিচয়। 

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামি লেখক ফোরাম; 
পরিচালক সম্পাদনা কেন্দ্র; নির্বাহী সম্পাদক, লেখকপত্র

 এমএম/