
|
মাদরাসায় ‘আকাবির সপ্তাহ’ চালু করুন!
প্রকাশ:
১৯ জানুয়ারী, ২০২৬, ১২:০৪ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|
||শায়খ মাহফুয আহমদ|| হজরত মাওলানা আনযার শাহ কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন বিগত শতাব্দীর জগদ্বিখ্যাত হাদিস বিশারদ হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহ এর সুযোগ্য পুত্র। নিকট অতীতের আকাবির সম্বন্ধে তাঁর জানাশোনার পরিধি ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। নিজ শাগরেদদেরকে জোর তাগিদ দিয়ে তিনি বলতেন, আমাদের মনীষীদের জীবনবৃত্তান্ত নিয়মিত পাঠ করো। তাঁদের জীবনী পাঠ করলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের জীবন গঠনের দিকনির্দেশনা গ্রহণ করবে, সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পাবে এবং চিত্তাকর্ষক নিত্যনতুন ভ্রান্ত মতবাদের প্রভাব থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখার শিক্ষা অর্জন করবে। হজরত মাওলানা আনযার শাহ কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহ আরও বলতেন, দেখো, কেবল বই-পুস্তক পড়ে কিছু তথ্যগত জ্ঞান অর্জন করা গেলেও সেই জ্ঞানের (ইলমের) আলোকে জীবন সাজানোর ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী পুণ্যবান মনীষীগণ (সালাফে সালিহীন) এর জীবনেতিহাস পাঠের কোনো বিকল্প নেই। এজন্যই ‘কিতাবুল্লাহ’ এবং ‘রিজালুল্লাহ’— উভয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। এক্ষেত্রে তিনি আক্ষেপ করে বলতেন, আজকাল ছাত্রদেরকে আকাবির উলামায়ে কেরামের জীবনী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে দেখা যায়, এ বিষয়ে তাদের কিছুই জানা নেই; সম্পূর্ণ বেখবর! হজরত মাওলানা আনযার শাহ কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহ এর সুযোগ্য পুত্র, শায়খুল হাদীস মাওলানা সায়্যিদ আহমদ খিজির শাহ মাসউদী সাহেব হাফিযাহুল্লাহ বলেন, এই করুণ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আব্বাজান মাওলানা আনযার শাহ সাহেব মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে অত্যন্ত জরুরি একটি পরামর্শ দিতেন। তা হলো, প্রতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই সকল তালিবুলইলমকে সমবেত করে আমাদের বড়দের জীবনী শোনানো। পাশাপাশি নিয়মিতভাবে যেন ছাত্ররা আকাবিরের জীবনালেখ্য পাঠ করে, সে জন্য তাদের উৎসাহ প্রদান ও তদারকিও উসতাযগণের দায়িত্ব। বরং পরীক্ষায় ছাত্রদেরকে এ-বিষয়ক প্রশ্নপত্র রাখলে আরও ফলপ্রসূ হবে। আকাবিরের জীবনী জানার গুরুত্ব বোঝাতে হজরত মাওলানা আনযার শাহ কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহ প্রতিবছর শিক্ষাবর্ষের শুরুতে ‘আকাবির সপ্তাহ’ এর আয়োজন করতেন। ইলম অর্জনে আকাবিরের ত্যাগ, ইলম অনুযায়ী আমলে তাঁদের মুজাহাদা, বিনয় ও নম্রতা, তাকওয়া ও পবিত্রতা, নিষ্ঠা ও ধৈর্য, দ্বীনের ওপর ইস্তেকামত ও অবিচলতা এবং ইলমের প্রচার ও সংরক্ষণে তাঁদের নজিরবিহীন কুরবানির কথা তিনি পুরো সপ্তাহজুড়ে আলোচনা করতেন। মাদরাসার তালিবুলইলমদের বর্তমান যে দূরাবস্থা, তাতে আমার মনে হয়, বাংলাদেশের মাদরাসাগুলোতেও মাওলানা আনযার শাহ কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহ এর ‘আকাবির সপ্তাহ’ আয়োজন করা অপরিহার্য হয়ে গেছে। অন্তত প্রতি মাসে একটি বিশেষ মজলিসের আয়োজন করা দরকার, যেখানে কোনো একজন আকাবিরের জীবনী ছাত্রদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। কয়েক দিন আগে দারুল উলূম করাচীর দস্তারবন্দী উপলক্ষে হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ তাকী উসমানী সাহেব হাফিযাহুল্লাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন। তিনি বলেন, দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আজকাল আমাদের মাদরাসার তালিবুলইলমরা যাঁদের উসিলায় দ্বীন ও ইলম অর্জনের সুযোগ পেয়েছে, যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এসব মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে— সেই আকাবিরে দেওবন্দ সম্পর্কে কিছুই জানে না। আকাবিরের জীবন ও অবদান জানার কোনো আগ্রহও তাদের মধ্যে নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে উসতাযগণের মাঝেও আকাবিরের জীবনচর্চার কোনো দায়িত্ববোধ পরিলক্ষিত হয় না। মাওলানা মুহাম্মাদ কাসিম নানুতবী, মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী, শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী, মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি, মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী, মাওলানা আশরাফ আলী থানবী— এই মনীষীদের জীবনী আজ ক’জন পাঠ করে? হযরত বলেন, ‘তাযকিরাতুর রশীদ’, ‘মালফুযাতে হাকীমুল উম্মত’, ‘আপবীতী’ প্রভৃতি গ্রন্থ আমাদের সকলেরই পাঠ করা উচিত। তিনি আরও বলেন, আমি যদি জীবিত থাকি, তবে আগামী রমজানের পর থেকে শুরু হওয়া মাদরাসার নতুন শিক্ষাবর্ষে দারুল উলূম করাচীতে তা’লীমের পাশাপাশি ‘তাযকিয়াহ’ (আত্মশুদ্ধি) এর বিশেষ কার্যক্রম চালু করবো ইনশাআল্লাহ। আর আমি যদি মারা যাই, তবে ওসিয়ত করে যাচ্ছি— রমজানের পর থেকে এই তাযকিয়ার বিশেষ মেহনত যেন এখানে অব্যাহত থাকে। কেবল বই পড়ে ইলম অর্জন করলে তা বাস্তবিক ইলম হয় না; এই ইলম ব্যক্তি ও উম্মাহর জন্য কল্যাণকরও হয় না। আমলের জযবা সৃষ্টি করতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নিকট অতীতের আকাবিরের জীবনীপাঠ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করে যারা আলেম হচ্ছেন তাদের উদ্দেশে হযরত বলেন, কোনো একজন আল্লাহওয়ালা বুজুর্গের সঙ্গে অবশ্যই ইসলাহী সম্পর্ক গড়ে তুলবেন। ইলমের মাঝে তখনই নূর আসবে, আপনার ইলম তখনই আলো ছড়াতে পারবে যখন আপনি কোনো বুজুর্গের সঙ্গে ইসলাহী সম্পর্ক গড়বেন এবং নিজেকে পরিশুদ্ধ করে তুলতে সচেষ্ট হবেন। আমাদের আকাবির সবসময় তাঁদের মুরব্বিদের পরামর্শ নিয়ে চলতেন। সেজন্য তাদের ইলম ও আমলে ভরপুর বারাকাত ছিলো। তাঁদের মাধ্যমে দ্বীনের বহুমুখী খেদমত আঞ্জাম পেয়েছে। সেজন্য আকাবিরের 'মালফুযাত' ও 'মাওয়াইয' পড়বার অভ্যাস গড়ে তুলুন। হযরত মাওলানা আনযার শাহ কাশ্মীরি ও হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ তাকী উসমানী— এই দুই মনীষীর উপর্যুক্ত উপদেশ আমাদের সকলের জন্যই আমলযোগ্য হয়ে উঠেছে। হাদীস পড়ছে, অথচ সারা বছর হযরত আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহ এর মতো নিকট অতীতের এই জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিস সম্পর্কে কিছুই জানে না— এটা কতটা দুঃখজনক! কয়েক বছর আগের একটি ঘটনা। কানাইঘাটের বুজুর্গ আলেম ও প্রাজ্ঞ মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা কুতুবউদ্দিন সাহেব রাহিমাহুল্লাহ এর খেদমতে হাজির হয়েছিলাম; তাঁর ছেলে হযরত মাওলানা আতাউল করীম মাকসুদ সাহেবের সঙ্গে। দিনটি ছিল রমজানের। আমি তখন সবেমাত্র কাফিয়া পড়েছি। আমাদের সঙ্গে ছিলেন আরেকজন মেধাবী তরুণ আলেম, যিনি রমজানের আগেই সিলেটের একটি স্বনামধন্য মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেছেন। আলাপচারিতার একপর্যায়ে হযরত কুতুবউদ্দিন সাহেব তাঁর উসতায হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ বানুরী রাহিমাহুল্লাহ এর স্মৃতিচারণ করলেন। এক প্রসঙ্গে তিনি সদ্য শিক্ষা-সমাপনকারী ওই মাওলানাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মাআরিফুস সুনান’ সম্পর্কে কিছু জানো? পরিস্থিতি দেখে মনে হলো, সুনানে তিরমিযীর এই চমৎকার আরবী ব্যাখ্যাগ্রন্থটির নামই তিনি কখনো দরসে শোনেননি! বিষয়টি ছিল সত্যিই বিস্ময়কর। হযরত মাওলানা কুতুবউদ্দিন সাহেব রাহিমাহুল্লাহ তখন ভীষণ মর্মাহত হয়েছিলেন। হ্যাঁ, এটাই আজ আমাদের দুঃখজনক বাস্তবতা। তবে দয়া করে কেউ এটিকে সংকীর্ণতার তকমা দিতে আসবেন না। ইলমের প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর বিশেষ বান্দাদের নির্বাচন করেছেন। ফলে যে জনপদে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা কাজ করে গেছেন, তাঁদের উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। তাঁদের ভুলে যাওয়া তো রীতিমতো নিমকহারামি। আপনি আজ সৌদি আরবে গিয়ে ইলম অর্জন করতে গেলে দেখবেন, কথায় কথায় শায়খ ইবন বায, শায়খ সালিহ ইবন উসাইমীন প্রমুখ শায়খের নাম উচ্চারিত হচ্ছে, তাঁদের কিতাবের উদ্ধৃতি সর্বত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যান্য জনপদেও তেমনি নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ইলমী ধারা গড়ে উঠেছে। সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের এই অঞ্চলে দারুল উলূম দেওবন্দের আকাবিরের যে কৃতিত্ব ও অবদান রয়েছে, তা অস্বীকার করা মানেই ইলমের ইতিহাস অস্বীকার করা। ইলম আমাদের কাছে পৌঁছেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের সূত্র ধরে। এই ধারাবাহিকতাকেই আমরা ‘সনদ’ নামে অভিহিত করি। আমাদের বাংলাদেশেরও নিকট অতীতে বহু আকাবির ছিলেন— তাঁদের সম্পর্কে কি আমরা কিছু জানি, কিংবা জানার চেষ্টা করি? তথাকথিত ‘উদারতা’র মোড়কে কিছু লোক আমাদের মাদরাসার তালিবুলইলমদের নিজেদের গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়; তাদের ভ্রান্ত মতবাদের প্রচারের হীন স্বার্থে। আমাদের সম্মানিত উসতায, মানুষ গড়ার সফল কারিগর হযরত মাওলানা শায়খ যিয়া উদ্দীন সাহেব হাফিযাহুল্লাহ সবসময় বলে থাকেন, নিজেদের আত্মপরিচয় জানার চেষ্টা করো। তুমি যদি তোমার পরিচয় নিয়ে চলতে পারো, তবে কোনো বাতিল সহজে তোমাকে গ্রাস করতে পারবে না। আত্মপরিচয় ভুলতে বসা কওমী মাদরাসার তালিবুলইলম সাথীদের ইলম ও আমলের হেফাজতের জন্য মাদরাসা কর্তৃপক্ষ কি ‘আকাবির সপ্তাহ’ কিংবা অনুরূপ কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবেন না? উদারতার দোহাই দিয়ে আত্মপরিচয় ভুলে যাওয়া মানুষের দ্বারা দ্বীনের সহীহ খেদমত প্রত্যাশা করা নিঃসন্দেহে দুরূহ। তবে এর অর্থ কখনোই এই নয় যে, ভিন্ন মতাবলম্বীদের সঙ্গে সর্বদা তর্ক-বিতর্ক, বিবাদ-বিসংবাদ কিংবা যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে চলতে হবে। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করবে। কিন্তু আপনি যদি এই অঞ্চলের কোনো দ্বীনি মাদরাসার সঙ্গে ছাত্র বা শিক্ষক হিসেবে যুক্ত থাকেন, তাহলে আমাদের আকাবির সম্পর্কে জানা আপনার অবশ্য কর্তব্য। তাঁদের জীবন থেকে নিজের জীবন পরিচালনার রসদ গ্রহণ করতেই হবে। আরবীতে প্রাঞ্জল ও গভীর একটি কথা রয়েছে- تراجم الرجال مدارس الأجيال তথা বরেণ্য মনীষীদের জীবনী প্রজন্ম গড়ার শ্রেষ্ঠ পাঠশালা। বস্তুত 'আকাবিরের জীবনী' আত্মপরিচয় রক্ষার এক অনিবার্য পাঠ। সুতরাং ইলমী পরিপক্বতা, আকীদার বিশুদ্ধতা, আত্মশুদ্ধি এবং চিন্তার পরিশুদ্ধির ক্ষেত্রে বড়দের জীবনীচর্চা আমাদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে বলে আমার বিশ্বাস। فَسَتَذْكُرُونَ مَا أَقُولُ لَكُمْ ۚ وَأُفَوِّضُ أَمْرِي إِلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ লেখক: লন্ডন প্রবাসী দাঈ ও ইসলামিক স্কলার এনএইচ/ |