মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬ ।। ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ২৩ জিলহজ ১৪৪৭


১০ সংকটে কওমি ঘরানা


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| মনযূরুর হক ||

সামাজিক পরিসরে কওমি মাদরাসার ঘরানা এখন ১০ সংকটে ভুগছে। বলা যায়, সংকটগুলো একটু একটু করে ঘোঁট পাকিয়ে খিচুড়ি হয়ে যাচ্ছে।

১. শিশু নিপীড়ন ও ছাত্রী ধর্ষণের বদনাম: এইটা গত দুই বছরে তুমুল আকার ধারণ করছে এবং প্রতি মাসে গড়ে ২০ টির মতো ঘটনা সামনে আসছে। দিন দিন বাড়ছে। মাদরাসায় আত্মহত্যা, খুনের প্ররোচনা ও দুর্ঘটনায় মৃত্যু বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে।

২. স্বীকৃতির কাঁটা: কওমি সনদের স্বীকৃতি কার্যকরের আশা একেবারে দুরাশায় পরিণত হচ্ছে এবং সরকার উল্টা নানান অপমানজনক প্রস্তাব হাজির করছে। শিক্ষার্থীরা হতাশ, কিন্তু কর্তৃপক্ষ ভাবছে, ঠিকই আছে।

৩. মিডিয়া ট্রায়াল: মিডিয়ায় কওমি পড়ুয়ারা প্রতিনিয়ত নেতিবাচক সংবাদের মুখোমুখী হয়েছে, সমাজে তাচ্ছিল্য বাড়ছে এবং মোকাবেলার কোনও উদ্যোগ নাই, উপায়ও কারও জানা নাই।

৪. সোশ্যাল মিডিয়া সংকট: লিটারেসি না থাকায় বিপুল কওমিয়ান নানান গালিগালাজ, অশালীন মন্তব্য ও তৎপরতায় জড়িয়ে পড়ছেন। গুজবে তা দিচ্ছেন এবং ধর্মীয় লেবাসের প্রতি লোকজনকে বীতশ্রদ্ধ ঘরে তুলছেন। নিজেরাও দ্বন্দ্বমুখর হয়ে উঠছেন।

৫. কর্মসংস্থান সংকট: যারা মাদরাসায় শিক্ষকতার সুযোগ পাচ্ছেন না বা করতে চান না, তারা পড়েছেন মহাসংকটে। আয়-উপার্জনের স্কিল না থাকায় চাকরি–বাকরি বাগাতে পারছেন না। পরিবারের সম্মানহানি থেকে বাঁচতে অড জবে ঢুকছেন, বিদেশে লেবারি করতে যাচ্ছেন, সরকারি-বেসরকারি ধান্দাপাতি করার দিকে ঝুঁকছেন একদল।

৬. আইনি সংকট: হুটহাট অনেকে নানান কারণে অ্যারেস্ট হয়ে যাচ্ছেন, অনেকে পুরাতন মামলা কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছেন, নেতারা সামলাতে পারলেও অল্পবয়সীরা ডুবে যাচ্ছেন তিমিরে।কেউ তাদের দেখার নাই।

৭. প্রাইভেট মাদরাসা: ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে ‘ক্যাডেট‘, ‘কিন্ডার গার্টেন‘, ‘ইন্টারন্যাশনাল‘, ‘সমন্বিত‘ মাদরাসা, মহিলা মাদরাসা ও ইফতাখানা। এগুলো কওমি না আলিয়া, স্কুল নাকি মাদরাসা, কোনও বোর্ডের নাকি বোর্ডহীন, তা কোনও দুর্ঘটনা হওয়ার আগে  কেউ জানে না। শত শত হাজার হাজার। মাদরাসা সম্পর্কিত যত নেতিবাচক সংবাদ আসে, ৯০% উৎস এই সকল মাদরাসা।

৮. আর্থিক সংকট: অভাবে পড়ে ছেলেরা নানান আগডম বাগডম ব্যবসা করছে, ধরা খাচ্ছে, চ্যারিটির নামে টাকা মেরে দিচ্ছে। আবার বাড়ি-গাড়ির উচ্চাশা নিয়ে সমিতি করছে, মারা খাচ্ছে। কেউ কেউ বাপের টাকা বা স্বজন-শুভনুধ্যায়ীদের টাকা নানান লোভনীয় অফারে বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। কয়েকজন আলেমের ঘটনা শুনলাম, চাক্ষুষ করলাম।

৯. এক্সট্রিম চিন্তার সংকট: একদল বিভিন্ন আনপড়, অ-আলেম বা এক্সট্রিম শাইখের আহ্বানে আটকে যাচ্ছেন। পুলিশি ট্র্যাকে বাকি জীবনের জন্য ঝুঁকির রসদ দিচ্ছেন। অত্যধিক উত্তেজনায় সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে বন্ধু ও পরিবারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। পাসপোর্ট করে দেশ ছাড়তে গিয়ে কেউ কেউ আটক হচ্ছেন, তবু অন্যরা শিক্ষা নিচ্ছেন না, কেউ তাদের পথ দেখাতে এগিয়ে আসছে না।

১০. রাজনৈতিক সংকট: নতুন যুগের রাজনীতিতে কওমিভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীরা উপযোগিতা হারাচ্ছেন। কওমি পড়ুয়ারা দল বেঁধে ছুটছে অকওমি লিবারেল দলের দিকে। জামায়াত তো বটেই, বহু জন বাম চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে কওমির রাজনীতির গোড়া নড়বড়ে করে ফেলছে। যদিও নেতারা আহ্লাদে ঢোক গিলছে।

সর্বোপরি ভালো আলেম তৈরির কাজটিতেও আগের মতো সফল হচ্ছে না কওমি সমাজ। মেধাবীরা নানান আকর্ষণে মাদরাসার গণ্ডি ছাড়ছে। ফলে পরিবর্তিত সমাজ ব্যবস্থায় উপযুক্ত সমাধান হাজির করতেও হিমশিম খাচ্ছে মাদরাসা।মাদরাসাগুলোর আয়ের পথও সংকুচিত হচ্ছে।

আল্লাহ রহম করুন। পথ খুলে দিন। তিনি বলেছেন, "আর যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করবেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সুরা তালাক, আয়াত: ২-৩)

লেখক: সাংবাদিক, চিন্তক ও বিশ্লেষক

জেডএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ