যেভাবে বাঁচবেন শয়তানের ধোঁকা থেকে
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:১৪ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| শরিফ হাসানাত || 

মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু সে-ই, যে বন্ধুর বেশে কাছে আসে, অথচ সুযোগ পেলেই ক্ষতি করে। শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। কিন্তু তার প্রতারণার ধরন এত সূক্ষ্ম যে, অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারে না কখন তার প্ররোচনায় পা দিয়েছে। কখনো সে পাপকে আকর্ষণীয় করে তোলে।  কখনো নেক আমলে অলসতা সৃষ্টি করে। আবার কখনো মানুষের মনে হতাশা, অহংকার, হিংসা ও অহেতুক সন্দেহ ঢুকিয়ে দেয়। এভাবেই ধীরে ধীরে মানুষকে আল্লাহ তাআলার স্মরণ ও আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে নেয়।

শয়তানের এই কৌশল সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা আমাদের সতর্ক করেছেন, 

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُمْ بِاللَّهِ الْغَرُورُ

‘হে মানুষ! নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদের ধোঁকায় না ফেলে এবং মহাপ্রতারক (শয়তান) যেন তোমাদের আল্লাহ সম্পর্কে ধোঁকায় না ফেলে।’ (সূরা ফাতির, আয়াত: ৫)

তাই একজন মুমিনের জন্য শুধু পাপ থেকে দূরে থাকাই যথেষ্ট নয়; পাপের দিকে নিয়ে যায় এমন শয়তানি কৌশলগুলো চিনে রাখাও জরুরি।

পাপকে সুন্দর করে উপস্থাপন করে শয়তান

শয়তানের অন্যতম প্রধান কৌশল হলো, পাপকে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা। যে কাজ আল্লাহ তাআলা নিষিদ্ধ করেছেন, সেটিকেই সে মানুষের সামনে আনন্দ, স্বাধীনতা কিংবা আধুনিকতার নামে উপস্থাপন করে। ফলে মানুষ পাপকে পাপ মনে করতে চায় না। ধীরে ধীরে হারাম কাজের প্রতি তার সংকোচও কমে যায়।

আল্লাহ তাআলা শয়তানের এই কৌশল সম্পর্কে বলেন, 

وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ

‘শয়তান তাদের কাছে তাদের কাজগুলোকে সুশোভিত করে দেখিয়েছিল।’ (সূরা আনকাবুত, আয়াত: ৩৮)

আজকের জীবনেও এর বহু উদাহরণ দেখা যায়। পর্দাহীনতাকে আধুনিকতা, সুদকে উন্নতি, মিথ্যাকে কৌশল, গিবতকে সাধারণ আলোচনা আর অহংকারকে আত্মমর্যাদা মনে করানোর চেষ্টা চলে। অথচ একজন মুমিনের উচিত কোনো কাজ করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা—এ কাজটি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নাকি প্রবৃত্তি ও শয়তানের প্ররোচনায়?

ধাপে ধাপে পাপের দিকে নিয়ে যায়

শয়তান সব সময় মানুষকে একবারে বড় পাপে জড়ায় না। অনেক সময় ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে তাকে নিজের পথে নিয়ে যায়। প্রথমে একটি অন্যায়কে তুচ্ছ মনে করায়, এরপর সেটি অভ্যাসে পরিণত করে। একসময় মানুষ বড় গুনাহেও জড়িয়ে পড়ে।

এ কারণেই আল্লাহ তাআলা শুধু শয়তানের অনুসরণ করতে নিষেধ করেননি; তার পদাঙ্ক অনুসরণ করতেও নিষেধ করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, 

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ

‘হে মুমিনগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না।’ (সূরা নুর, আয়াত: ২১)

অর্থাৎ পাপের দিকে নিয়ে যায় এমন ছোট ছোট পথও বন্ধ রাখতে হবে। যে পরিবেশ, সম্পর্ক, সঙ্গ কিংবা অভ্যাস মানুষকে গুনাহের দিকে ঠেলে দেয়, তা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে হবে।
আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়
মানুষ যখন আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে যায়, তখন শয়তানের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। নামাজে অলসতা, কোরআন তিলাওয়াতে অনীহা, দোয়া-জিকিরে অবহেলা এবং দ্বীনি পরিবেশ থেকে দূরে থাকা—এসবের ফলে অন্তর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, 

وَمَنْ يَعْشُ عَنْ ذِكْرِ الرَّحْمَٰنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ

‘আর যে ব্যক্তি রহমানের স্মরণ থেকে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য একজন শয়তান নিয়োজিত করে দিই; অতঃপর সে-ই হয় তার সঙ্গী।’ (সূরা যুখরুফ, আয়াত: ৩৬)

তাই শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করা, নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করা এবং সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকিরের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ওয়াসওয়াসা ও অহেতুক সন্দেহ সৃষ্টি করে

শয়তানের আরেকটি ভয়ংকর অস্ত্র হলো ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা। কখনো সে মানুষের মনে আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে অমূলক প্রশ্ন ও সন্দেহ সৃষ্টি করে। কখনো অজু, নামাজ, পবিত্রতা কিংবা ইবাদতের শুদ্ধতা নিয়ে এমন সন্দেহ তৈরি করে যে, মানুষ অস্থির হয়ে পড়ে। আবার কখনো অতীতের গুনাহ মনে করিয়ে দিয়ে তাকে হতাশ করে তোলে।

এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, শয়তান মানুষের কাছে এসে বলতে থাকে, এটি কে সৃষ্টি করেছে, ওটি কে সৃষ্টি করেছে? এভাবে একপর্যায়ে প্রশ্ন করে, তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে? এমন অবস্থায় উপনীত হলে সে যেন আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় চায় এবং ওই চিন্তা থেকে বিরত থাকে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৪)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, শয়তানের সব কুমন্ত্রণার পেছনে ছুটতে নেই। বরং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে এবং অমূলক চিন্তাকে প্রশ্রয় না দিয়ে মনোযোগ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিতে হবে। 

রাগ, হিংসা ও অহংকারের ফাঁদে ফেলে

মানুষের অন্তরের দুর্বলতাগুলোকে কাজে লাগানো শয়তানের অন্যতম কৌশল। রাগের সময় মানুষ এমন কথা বলে ফেলে, যা স্বাভাবিক অবস্থায় কখনো বলত না। হিংসার কারণে অন্যের ভালো দেখতে পারে না। অহংকারের কারণে সত্য জানা সত্ত্বেও তা মেনে নিতে চায় না।

এসব প্রবৃত্তিকে উসকে দিয়ে শয়তান মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করে। পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করে, বন্ধুদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ায় এবং সমাজে বিভেদ তৈরি করে।

তাই রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখা, অন্যের প্রতি হিংসা না করা এবং ভুল বুঝতে পারলে ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি। মনে রাখতে হবে, শয়তান চায় মানুষের মধ্যে বিরোধ ও শত্রুতা তৈরি হোক। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো এসব ফাঁদ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার উপায়

শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনেই পথনির্দেশ দিয়েছেন। তবে শুধু মুখে আশ্রয় প্রার্থনা করলেই হবে না; জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশনা মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে।

১. আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা: শয়তানের কুমন্ত্রণা অনুভব করলে ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়তে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, 

وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ ۚ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

‘আর যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সূরা আ‘রাফ, আয়াত: ২০০)।

২. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া: নামাজ মানুষকে অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখে। নিয়মিত নামাজ আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হয়। তাই কোনো অবস্থাতেই নামাজে অবহেলা করা উচিত নয়।

৩. নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করা: কোরআন মানুষের অন্তরের প্রশান্তি ও হেদায়াতের উৎস। প্রতিদিন কিছু সময় কোরআন তিলাওয়াত, অর্থ অনুধাবন এবং সে অনুযায়ী আমলের চেষ্টা করতে হবে।

৪. সকাল-সন্ধ্যার জিকির ও দোয়া পড়া: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া ও জিকিরের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি এবং সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়ার অভ্যাসও করা উচিত।

৫. সৎ মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা: মানুষের চিন্তা ও চরিত্র গঠনে সঙ্গের প্রভাব অনেক বেশি। তাই এমন মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করতে হবে, যাঁরা আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেন, ভালো কাজে উৎসাহিত করেন এবং অন্যায় থেকে বিরত রাখেন।

৬. গুনাহ হয়ে গেলে তাওবা করা: মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কখনো শয়তানের প্ররোচনায় গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ হওয়া যাবে না। বরং দ্রুত আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং সেই গুনাহ থেকে ফিরে আসতে হবে। শয়তান চায় মানুষ গুনাহ করার পর আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে পড়ুক। অথচ আল্লাহ তাআলার রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই।

ইবাদতেও শয়তানের বাধা আসতে পারে

অনেক সময় মানুষ নামাজে দাঁড়ালে কিংবা কোরআন তিলাওয়াত করতে বসলে নানা ধরনের চিন্তা ও বিভ্রান্তির শিকার হয়। নামাজে মনোযোগ নষ্ট হয়, রাকাতের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় কিংবা কিরাত পড়তে অসুবিধা হয়।

এমন সমস্যায় এক সাহাবি উসমান ইবনে আবুল আস (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অভিযোগ করেন। তিনি জানান, শয়তান তাঁর নামাজ ও কোরআন তিলাওয়াতের মধ্যে বাধা সৃষ্টি করে এবং তাঁকে বিভ্রান্ত করে।

জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এটি খিনজাব নামের এক শয়তানের কাজ। এমন অনুভূতি হলে আল্লাহর কাছে তার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইবে এবং বাঁ দিকে তিনবার হালকা ফুঁ দেবে। সাহাবি বলেন, তিনি এভাবে আমল করার পর আল্লাহ তাআলা তাঁর সেই সমস্যা দূর করে দেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২০৩) 

এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, ইবাদতের সময়ও শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। তাই এসব কুমন্ত্রণায় বিচলিত না হয়ে সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে তার মোকাবিলা করতে হবে।

শয়তান কিয়ামত পর্যন্ত মানুষকে বিপথগামী করার চেষ্টা করবে। কিন্তু তার প্ররোচনায় সাড়া দেওয়া মানুষের জন্য অনিবার্য নয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সতর্ক করেছেন, আবার তার অনিষ্ট থেকে বাঁচার পথও দেখিয়েছেন। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, ঈমানি দৃঢ়তা ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা।

মনে রাখতে হবে, শয়তানের সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনই, যখন একজন মানুষ গুনাহকে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে এবং তাওবা করার প্রয়োজন অনুভব করে না। তাই প্রতিদিন নিজের আমল পর্যালোচনা করা, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া এবং ভালো কাজের প্রতি অবিচল থাকা জরুরি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শয়তানের প্রকাশ্য ও গোপন সব ধরনের ধোঁকা থেকে হেফাজত করুন। ঈমানের ওপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ করে দিন। আমিন।

লেখক: আলেম, শিক্ষক ও কবি 

এসএইচ/