
|
সিসেস্তার মাউন্ট বারবারো: ইতিহাসের সাক্ষী প্রাচীন মসজিদ
প্রকাশ:
০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:৫৬ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
সিসিলির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি পাহাড়ি জনপদ মাউন্ট বারবারো। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন নগরী সিসেস্তার ধ্বংসাবশেষ। গ্রিক স্থাপত্যের ডোরিক মন্দির, বিশাল নাট্যমঞ্চ আর প্রাচীন সমাধিক্ষেত্র দেখতে প্রতিদিনই সেখানে ভিড় করেন পর্যটকরা। তবে এই প্রাচীন নগরীর ইতিহাসে এমন একটি অধ্যায় রয়েছে, যা দীর্ঘদিন প্রায় বিস্মৃত ছিল। সেটি হলো মুসলিম সিসিলির ইতিহাস এবং পাহাড়ের ওপর নির্মিত একটি প্রাচীন মসজিদের গল্প। ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে ডক্টরেট সম্পন্ন করার পর প্রত্নতত্ত্ববিদ আলেসান্দ্রা মোলিনারি সিসেস্তার দিকে মনোযোগ দেন। তখন অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদের ধারণা ছিল, সিসেস্তার প্রাচীন ইতিহাস প্রায় উন্মোচিত হয়ে গেছে। মধ্যযুগের নতুন কোনো নিদর্শন সেখানে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু মোলিনারির চোখ আটকে যায় একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত দেয়ালের অদ্ভুত অংশে। দেয়ালের বাইরে থেকে দেখতে আয়তাকার হলেও ভেতরে ছিল একটি কুলুঙ্গি। এটি দীর্ঘ ও নিচু একটি স্থাপনার দক্ষিণ পাশে বেরিয়ে ছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদদের বিস্মিত করে সেই কুলুঙ্গিটি ছিল একটি মিহরাব—মসজিদে কিবলার দিক নির্দেশকারী স্থান। আজ পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে শনাক্ত হওয়া ইসলামী সিসিলির একমাত্র মসজিদ এটিই। মাউন্ট বারবারোর মসজিদের ধ্বংসাবশেষ মোলিনারির এই অনুসন্ধান ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া একটি বৃহৎ প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার অংশ ছিল। ত্রাপানি অঞ্চলের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এবং কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় এই খননকাজ পরিচালিত হয়। এর আগে বিভিন্ন জরিপে মসজিদের ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়লেও দীর্ঘদিন সেটিকে খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকের প্রাচীন নাট্যমঞ্চের কাছে একটি অস্বাভাবিক আয়তাকার স্থাপনা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছিল। মোলিনারির দল স্থাপনাটির ভেতরের অংশ খনন করে পাথুরে ভিত্তি পর্যন্ত পৌঁছায়। সেখানে তিনটি স্তম্ভের ভিত্তি পাওয়া যায়। স্তম্ভগুলো একসময় মসজিদের অভ্যন্তরকে দুটি দীর্ঘ সারিতে বিভক্ত করেছিল।
[ আলেসান্দ্রা মোলিনারি, সিসেস্তা : দুর্গ ও মসজিদ (১৯৮৯–১৯৯৫ সালের খনন) (পালেরমো: ফ্লাক্কোভিও, ১৯৯৭), চিত্র ১৪২ ]
মসজিদটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২০ মিটার এবং প্রস্থ ১১ মিটার। এর দেয়াল নির্মিত হয়েছিল চুনাপাথরের খণ্ড দিয়ে। স্থাপনাটি সরাসরি পাহাড়ের পাথুরে ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা, পাহাড়ের উন্মুক্ত পাথুরে অংশ হয়তো নামাজের স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। প্রাপ্ত নিদর্শন থেকে ধারণা করা হয়, মসজিদটির ছাদ ছিল টালির তৈরি। তবে সেখানে কোনো মিনার কিংবা অজুর জন্য নির্মিত ফোয়ারার সন্ধান পাওয়া যায়নি। মসজিদটি কারা নির্মাণ করেছিলেন, তা জানার মতো কোনো শিলালিপিও অবশিষ্ট নেই।
[ ২০২৬ সালে হেরা হাশমিন তোলা মাউন্ট বারবারোর ছবি ] সিসেস্তার মুসলিম অধিবাসীরা মাউন্ট বারবারোর এই স্থাপনাটি কি কেবল সামরিক কোনো চৌকি ছিল? প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান বলছে, সেখানে আরও সুসংগঠিত জনবসতি ছিল। প্রাচীন নগরীর আগোরার আশপাশে খনন করে এমন কিছু বসতঘরের সন্ধান পাওয়া যায়, যেগুলোর কক্ষ ছোট উঠান কিংবা সরু গলির দিকে উন্মুক্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে জীবাশ্ম ও মানবদেহের অবশেষ নিয়ে গবেষণাকারী প্যালিওপ্যাথলজিস্ট পিয়ের ফ্রান্সেস্কো ফাব্রিও কাছাকাছি একটি মুসলিম সমাধিক্ষেত্রের তথ্য জানান। এসব নিদর্শন ইঙ্গিত দেয়, পাহাড়ের ওপর মুসলিম পরিবারগুলো স্থায়ীভাবে বসবাস করত। মসজিদটির নির্মাণকাল নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে খননে পাওয়া মৃৎপাত্রের টুকরো। সিসিলির অন্যান্য ইসলামী যুগের মৃৎপাত্রের সঙ্গে সেগুলোর ধরন ও নির্মাণশৈলী তুলনা করে গবেষকেরা মসজিদটির নির্মাণকাল দ্বাদশ শতকে নির্ধারণ করেন। এখানেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। তখন সিসিলি নরম্যানদের শাসনাধীন। রাজনৈতিক ক্ষমতা পুরোপুরি খ্রিষ্টান শাসকদের হাতে। এমন পরিস্থিতিতে মুসলিমরা কীভাবে একটি মসজিদ নির্মাণ করলেন? সিসেস্তার এই মসজিদটি আসলে কারা নির্মাণ করেছিলেন? ইতিহাসের পাতায় মুসলিম সিসিলি সিসেস্তা সম্পর্কে লিখিত ঐতিহাসিক তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। জানা যায়, শহরটি মাউন্ট বারবারোর ওপর অবস্থিত ছিল। এর কাছেই ছিল কালাতামেত—আরবি নাম ‘কালআ আল-হাম্মাহ’—একটি সুদৃঢ় দুর্গনগরী। রাজা দ্বিতীয় রজারের দরবারে কর্মরত বিখ্যাত মানচিত্রবিদ মুহাম্মদ আল-ইদরিসি কালাতামেতকে অত্যন্ত শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ১১৮৪ ও ১১৮৫ সালে সিসিলি ভ্রমণ করেন মুসলিম পর্যটক ইবনে জুবাইর। তিনি আলকামা (বর্তমান আলকামো) শহরে এক রাত কাটিয়ে আতরাবানিশ (বর্তমান ত্রাপানি) যাওয়ার পথে ওই অঞ্চলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন। তাঁর বর্ণনায় দেখা যায়, সেখানকার জনপদগুলোতে তখন মুসলিমদের বসবাস ছিল ব্যাপকভাবে। ইবনে জুবাইর লিখেছেন, ‘আমরা পথে আলকামা নামে একটি শহরে এক রাত কাটালাম। শহরটি বড় ও প্রশস্ত। সেখানে বাজার ও মসজিদ রয়েছে। শহরটির অধিবাসী এবং এই পথের আশপাশের সব জনপদের মানুষ মুসলিম।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘ভোর হওয়ার আগে শনিবার, এই বরকতময় মাসের ২৩ তারিখ এবং ২৯ ডিসেম্বর আমরা সেখান থেকে যাত্রা শুরু করি। এর কাছেই আমরা আল-হাম্মাহ দুর্গ অতিক্রম করি। এটি একটি বড় শহর, যেখানে অনেক গোসলখানা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা ভূগর্ভ থেকে ঝরনার মতো পানি প্রবাহিত করেছেন। সেই পানির উত্তাপ এত বেশি যে শরীর তা সহ্য করতে পারে না। পথে আমরা এমন একটি গোসলখানার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন বাহন থেকে নেমে আমরা গোসল করে শরীরকে সতেজ করলাম।’ ফ্রান্সের École française de Rome-এর প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় ইবনে জুবাইর ও আল-ইদরিসির উল্লেখ করা স্থান দুটিকে মধ্যযুগীয় কালাতামেতের সঙ্গে শনাক্ত করা হয়েছে। সিসেস্তার আশপাশের পাহাড়ি দুর্গ, পানির উৎস ও জনবসতির একই ভূদৃশ্যের অংশ ছিল এই অঞ্চল। আধুনিক ভ্রমণলেখক ও সাংবাদিক তারিক হুসাইন তাঁর Muslim Europe: A Journey in Search of a Fourteen Hundred Year History বইয়ে লিখেছেন, মাউন্ট বারবারোর চূড়া থেকে দাঁড়িয়ে তিনি সেই উষ্ণ প্রস্রবণ অঞ্চল দেখতে পেয়েছিলেন, যেখানে ইবনে জুবাইর গোসল করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। সিসেস্তা এবং সামগ্রিকভাবে মুসলিম সিসিলির ইতিহাস এতটা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে লিখিত ইতিহাসের ক্ষয় ও নির্বাচিত সংরক্ষণ। গির্জা ও মঠগুলো সাধারণত নিজেদের সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দলিল সংরক্ষণ করত। ফলে মুসলিম অধিবাসীরা ইতিহাসে অনেক সময় জমির ভাড়াটে কিংবা করদাতা হিসেবে উঠে এসেছেন; নিজেদের জীবন, সমাজ ও অভিজ্ঞতার বর্ণনাকারী হিসেবে নয়। আধুনিক গবেষণার কিছু ধারাও সিসিলির ইতিহাসকে প্রধানত খ্রিষ্টান রাজবংশগুলোর শাসনকেন্দ্রিক করে তুলেছে। তবে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে দ্বীপটির ইসলামী অতীত নিয়ে গবেষণায় নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আলেসান্দ্রা মোলিনারিও এই পরিবর্তনকে স্বীকার করেছেন। মাউন্ট বারবারোতে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের সহাবস্থান সিসেস্তার মুসলিম ইতিহাস অনুসন্ধানে জীবপ্রত্নতত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৪ সালে অরোর মনেররো এবং আলেসান্দ্রা মোলিনারিসহ কয়েকজন গবেষক সিসেস্তার দুটি সমাধিক্ষেত্র থেকে উদ্ধার করা ২৭টি মানবদেহের অবশেষ নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁদের মধ্যে ১৮ জন ছিলেন খ্রিষ্টান এবং ৯ জন মুসলিম। মৃতদেহের অবস্থান ও দাফনপদ্ধতি, বিশেষ করে মক্কার দিকে মুখ করে শায়িত থাকার বিষয়টি মুসলিম পরিচয় শনাক্ত করতে সহায়তা করে। রেডিওকার্বন বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকেরা দেখেছেন, মসজিদ নির্মাণের অনেক আগেই সিসেস্তায় মুসলিমদের দাফন শুরু হয়েছিল। একই গবেষণায় ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশ সম্ভাবনায় দেখা গেছে, মুসলিমদের দাফন শেষ হওয়ার আগেই খ্রিষ্টানদের দাফন শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ, সিসেস্তায় মুসলিম ও খ্রিষ্টানরা একই সময়ে বসবাস করতেন। একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নরম্যানদের শাসন সুসংহত হওয়ার সময় নিম্নভূমি থেকে বিতাড়িত মুসলিমরা মাউন্ট বারবারোর মতো নিরাপদ পাহাড়ি অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে আগে থেকেই দুর্গ ও প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা ছিল। মোলিনারি লক্ষ করেছেন, মাউন্ট বারবারোতে মুসলিমদের পুনর্বসতি গড়ে ওঠার সময় কাছাকাছি কালাতামেতে নরম্যান প্রভুর উপস্থিতিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সম্ভবত পাহাড়টি মুসলিমদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সেই আশ্রয়স্থলে এমন একটি সম্প্রদায় গড়ে ওঠে, যাদের স্থায়ীভাবে নামাজ আদায়ের জন্য একটি মসজিদের প্রয়োজন দেখা দেয়। তবে মুসলিম সিসেস্তার ইতিহাসের সূচনা আরও আগে, সিসিলিতে আগলাবি বিজয়ের সময় থেকে হয়েছিল—এমন ব্যাখ্যাও রয়েছে। আগলাবিরা নবম শতকে সিসিলি বিজয় করে সেখানে মুসলিম শাসনের সূচনা করেছিল। সমাধিক্ষেত্র থেকে উদ্ধার করা মুসলিমদের দেহাবশেষে উত্তর আফ্রিকা ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত বংশগত বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে। তবে জিনগত গবেষণা দিয়ে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়, তাঁদের কেউ সরাসরি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে সিসিলিতে এসেছিলেন, নাকি তাঁদের পূর্বপুরুষ কয়েক প্রজন্ম আগে সেখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন।
[স্টিফেন অ্যালবাম রেয়ার কয়েনস] এ ছাড়া ১১৯৪ থেকে ১২৬৬ সাল পর্যন্ত সোয়াবিয়ান বা হোহেনস্টাউফেন শাসনামলে মাউন্ট বারবারোর জনবসতি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছিল বলে মোলিনারি জানিয়েছেন। এ সময় উন্নত মানের মৃৎপাত্র, প্রচুর মুদ্রা এবং বিভিন্ন মানের বসতঘর পাওয়া যায়। এসব নিদর্শন মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতির ইঙ্গিত দেয়। আশ্রয়, বিদ্রোহ ও পতন মাউন্ট বারবারোর এই সমৃদ্ধি অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া তীরের ফলক এবং অগ্নিকাণ্ডের চিহ্ন থেকে ধারণা করা হয়, ত্রয়োদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে জনবসতিটি পরিত্যক্ত হয়েছিল। মোলিনারি এই পতনের সঙ্গে দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের মুসলিম বিদ্রোহী ও অবাধ্য সামন্তপ্রভুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানকে যুক্ত করেছেন। এসব অভিযানের ফলে মুসলিমরা ক্রমেই দুর্গবেষ্টিত এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। সিসেস্তাও সম্ভবত এমন একটি আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল। সিসেস্তার খননে বিদ্রোহী নেতা মুহাম্মদ ইবনে আব্বাদের মুদ্রাও উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি ‘আমিরুল মুমিনিন’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন এবং পশ্চিম সিসিলিতে মুসলিম প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের নির্দেশে তাঁকে বন্দি করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরও মুসলিম প্রতিরোধ থেমে থাকেনি। তাঁর মেয়ে এন্তেলা দুর্গের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তাঁরও মৃত্যু হয়। সামরিক অভিযান ও মুসলিমদের জোরপূর্বক মূল ভূখণ্ডে স্থানান্তরের মাধ্যমে দ্বিতীয় ফ্রেডরিক বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হন। বহু মুসলিমকে সিসিলি থেকে সরিয়ে ইতালির মূল ভূখণ্ডে লুচেরা শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। ত্রয়োদশ শতকের দিকে মাউন্ট বারবারোতে একজন খ্রিষ্টান প্রভুর উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সেখানে নির্মিত হয় দুর্গের প্রধান টাওয়ার, একটি গির্জা এবং দুর্গসংলগ্ন সমাধিক্ষেত্র। মোলিনারি মনে করেন, এই সময়ের কাছাকাছি মসজিদটি সম্ভবত ধ্বংস করা হয়েছিল। অন্য কিছু বিবরণে বলা হয়েছে, মসজিদের পাথর পরবর্তী স্থাপনাগুলো নির্মাণে পুনর্ব্যবহার করা হয়েছিল। ঐতিহাসিক দলিলে মসজিদটির উল্লেখ পাওয়া যায় ‘কালাতাবারবারো’ নামে। নামটি সম্ভবত আরবি ‘কালআত বারবারি’—অর্থাৎ ‘বারবারদের দুর্গ’—থেকে লাতিন রূপান্তরের মাধ্যমে এসেছে। এরপর এক শতাব্দীরও বেশি সময় ইতিহাসের নথিতে অঞ্চলটির উল্লেখ প্রায় হারিয়ে যায়। ১৪৪২ সালে কাছাকাছি কালাতাফিমি শহরের অধিবাসীরা মাউন্ট বারবারোতে একটি গির্জা নির্মাণের উদ্যোগ নেন। এটিই পরবর্তী সময়ের উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্যগুলোর একটি। অষ্টাদশ শতকে প্রত্নতত্ত্ব ও প্রাচীন নিদর্শনের প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়ার আগে পাহাড়টি ছিল প্রায় জনশূন্য, অথচ ইতিহাসে সমৃদ্ধ এক নীরব ভূদৃশ্য। আজকের সিসেস্তা: মসজিদের ধ্বংসাবশেষে ফিরে আসা আজান আজ সিসেস্তায় পর্যটকদের আগমন ঘটে মূলত অন্য এক প্রাচীন ইতিহাসের টানে। ডোরিক মন্দিরের অসাধারণ স্তম্ভগুলো দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। পাহাড়ের আরও ওপরে মাউন্ট বারবারোতে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন মসজিদের চুনাপাথরের ধ্বংসাবশেষ অনেকের চোখেই পড়ে না। কিন্তু মুসলিম সিসিলির গল্প এখানেই শেষ নয়। ২০২২ সালে শায়খ হামজা ওয়ালদ মাকবুল পার্ক কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে একদল পর্যটককে সঙ্গে করে সেখানে আসরের জামাত আদায় করেন। তারিক হুসাইনও তাঁর ভ্রমণবিষয়ক বইয়ে সিসেস্তা যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। ইবনে জুবাইর যে উষ্ণ প্রস্রবণে গোসল করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়, সেখানকার পানিতে ডুব দেওয়ার পর তিনি মাউন্ট বারবারোতে পৌঁছান। আমার নিজের সিসেস্তা সফরের সময় আমার স্বামী প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে আজান দিয়েছিলেন। প্রায় এক হাজার বছর পর সেখানে আজানের ধ্বনি ফিরে আসার সেই মুহূর্ত ছিল গভীর আবেগের। হয়তো তিনিই ছিলেন সেখানে আজান দেওয়া প্রথম কয়েকজনের একজন। [মূল: হেরা হাশমি, অনুবাদ: শরিফ হাসানাত] এসএইচ/ |