যুক্তরাষ্ট্রের ২৩৭ বছরে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করা কে এই আবদুল আল-সাইদ
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:০৫ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইদ।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে ৪২ বছর বয়সী মিসরীয় বংশোদ্ভূত এই রাজনীতিক যুক্তরাষ্ট্রের ২৩৭ বছরের সিনেট ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন।

অবসরে যাওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের ছেড়ে দেওয়া আসনে জয় পেয়েছেন আল-সাইদ। ১৭৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে এই প্রথম কোনো মুসলিম দেশটির উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচিত হলেন।

মিশিগানের রচেস্টার হিলসে মিসরীয় অভিবাসী মা-বাবার ঘরে জন্ম আবদুল আল-সাইদের। রাজনীতিতে আসার আগে চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি। ২০১৫ সালে ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। শহরটির আর্থিক সংকটের পর জনস্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠনের উদ্যোগ তদারকি করেন তিনি। ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলেন।

এরপর ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে প্রার্থী হন আল-সাইদ। তবে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক বাছাইয়ে গ্রেচেন হুইটমারের কাছে পরাজিত হন। পরে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানবিক ও প্রবীণ সেবাবিষয়ক বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আল-সাইদ ২০০৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর মর্যাদাপূর্ণ রোডস বৃত্তি নিয়ে ২০১১ সালে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি নেন। ২০১৪ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন।

২০২৬ সালে নির্বাচনী রাজনীতিতে ফেরেন তিনি। গত আগস্টে মিশিগানে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হেইলি স্টিভেন্সকে পরাজিত করেন। তাঁর প্রচারে সমর্থন দেন প্রগতিশীল ধারার প্রভাবশালী রাজনীতিক সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ ও রাশিদা তালিব।

নির্বাচনী প্রচারে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ, আবাসন ব্যয় কমানো, রাজনীতিতে ধনী দাতাদের প্রভাব হ্রাস এবং শ্রমজীবী পরিবারের অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেন আল-সাইদ। সবার জন্য মেডিকেয়ার কর্মসূচি চালুর পক্ষেও অবস্থান নেন তিনি।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত আল-সাইদ। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে তিনি ইসরায়েলকে নিঃশর্ত মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়া বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারেও তাঁর এ অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

তাঁর মুসলিম পরিচয়ও নির্বাচনী প্রচারে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ রিপাবলিকান দলের কয়েকজন নেতা তাঁর ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করেন। এর জবাবে আল-সাইদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে দৃষ্টি সরাতেই তাঁর নাম ও ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক বাছাইয়ে আল-সাইদের কাছে পরাজিত হেইলি স্টিভেন্স তাঁর বিরোধিতা করে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন দেন। আল-সাইদের রাজনৈতিক বক্তব্য ও সংশ্লিষ্টতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে নেওয়া তাঁর এ সিদ্ধান্তে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে জয় পেতে বাধা হয়নি আল-সাইদের।

আবদুল আল-সাইদের এ জয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর আগে মুসলিমরা কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হলেও সিনেটে তাঁদের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না।

২০০৬ সালে কিথ এলিসন প্রথম মুসলিম হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০১৮ সালে রাশিদা তালিব ও ইলহান ওমর প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হন।

এবার সিনেটে আবদুল আল-সাইদের বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বের নতুন দুয়ার খুলে দিল।

সূত্র: আনাদোলো এজেন্সি

আইও/