
|
গামেদীর চিন্তাধারা: আকিদাগত বিচ্যুতি নিয়ে আলেমদের আপত্তি ও সতর্কবার্তা
প্রকাশ:
০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ০৬:০৩ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
|| ফাহিম সিদ্দিকী || আমাদের দেশে এখন জাভেদ আহমেদ গামেদীর ভ্রান্ত চিন্তাধারা প্রচার ও প্রসারের চেষ্টা চলছে। ‘বাংলাদেশ গামেদী সেন্টার’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সম্প্রতি তার জামাতাকে বাংলাদেশে দাওয়াত করে আনা হয়েছে। আলেমগণের বিশ্লেষণে গামেদীর সবচেয়ে বড় বিচ্যুতি হলো চিন্তা-ভাবনার উসূলের ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের স্বীকৃত ধারা থেকে সরে যাওয়া। এর ফলেই তার একাধিক ভ্রান্ত ও আপত্তিকর মতের জন্ম হয়েছে। কাদিয়ানি প্রসঙ্গেও তার অবস্থান গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। আলেমদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গামেদী গোলাম আহমদ কাদিয়ানিকে কাফের মনে করেন না, বরং তাকে কাফের বলাকেই অবৈধ মনে করেন। এ কারণে ড. মাওলানা ইলিয়াস ফায়সালসহ অনেকে তাকে ‘কাদিয়ানি সমর্থক মিডিয়া স্কলার’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। অথচ উম্মাহর আলেমগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, কাদিয়ানিরা কাফের। তাই সাধারণ মুসলমানদের উচিত এই ফিতনা সম্পর্কে সতর্ক থাকা, এর প্রচার-প্রসারে কোনোভাবে সহযোগী না হওয়া এবং আকিদা-বিষয়ক জিজ্ঞাসায় নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরামের শরণাপন্ন হওয়া। বহু আগে পাকিস্তান থেকে তাদের বিষয়ে ফতোয়া এসেছে। জামেয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়াহ বিন্নোরী টাউন এর ফতোয়ার সারকথা... জাভেদ আহমেদ গামিদী-এর এমন কিছু দৃষ্টিভঙ্গি যা কুরআন ও হাদিসের স্পষ্ট পাঠ্য, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইজমা এবং সর্বসম্মত আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক, তার মধ্যে কয়েকটি নিচে উল্লেখ করা হলো: * ঈসা (আ.) ইন্তেকাল করেছেন। [মীযান, আলামাতে কিয়ামত, পৃ. ১৭৮, ২০১৪ সংস্করণ] * কিয়ামতের পূর্বে কোনো মাহদী আসবেন না। [মীযান, আলামাতে কিয়ামত, পৃ. ১৭৭, মে ২০১৪ সংস্করণ] * (মির্জা গোলাম আহমেদ কাদিয়ানী) গোলাম আহমেদ পারভেজসহ কেউ কাফির নয়, কোনো উম্মতির অন্য কাউকে কাফির ঘোষণা করার অধিকার নেই। [ইশরাক, অক্টোবর ২০০৮, পৃ. ৬৭] * হাদিস দ্বারা ধর্মে কোনো নতুন আমল বা আকীদার সংযোজন হতে পারে না। [মীযান, পৃ. ১৫] * সুন্নাতের মোট সংখ্যা মাত্র ২৭টি। [মীযান, পৃ. ১৪] * দাড়ি সুন্নাত এবং ধর্মের অংশ নয়। [মাকামাত, পৃ. ১৩৮, নভেম্বর ২০০৮ সংস্করণ] * ইজমা ধর্মে বিদআতের অন্তর্ভুক্তি। [ইশরাক, অক্টোবর ২০১১, পৃ. ২] * মুরতাদের শরিয়তসম্মত শাস্তি কেবল রাসূলুল্লাহ সা.-এর যুগের সাথেই নির্দিষ্ট ছিল। [ইশরাক, আগস্ট ২০০৮, পৃ. ৯৫] * রজম (পাথর মেরে হত্যা) এবং শরাব পানের কোনো শরিয়তসম্মত শাস্তি নেই। [বুরহান, পৃ. ৩৫ থেকে ১৪৬, ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সংস্করণ] * ইসলামে "ফাসাদ ফিল আরদ" (পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি) এবং "ক্বতলুন্ নাফস" (নরম হত্যা) ছাড়া অন্য কোনো অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে না। [বুরহান, পৃ. ১৪৬, ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সংস্করণ] * পবিত্র কুরআনের পাঠ শুধু একটি, বাকি পাঠগুলো অনারবদের ফেতনা। [মীযান, পৃ. ৩২, এপ্রিল ২০০২ সংস্করণ... মুফতি আবদুল ওয়াহিদ জালেমের বরাত দিয়ে 'তুহফায়ে গামিদী'] * ফকিহগণের মতামতকে তাদের নিজস্ব জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার আলোকেই মূল্যায়ন করা হবে। [সুওয়াল ওয়া জওয়াব, এইচএস ৭২৭, ১৯ জুন ২০০৯] * ইজতিহাদ করার অধিকার প্রত্যেক মানুষের রয়েছে। ইজতিহাদের যোগ্যতার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো শর্ত নেই; যার মনে হয় যে দ্বীনের ওপর তার গভীর জ্ঞান (তাক্বাফা ফিদ দ্বীন) রয়েছে, সে ইজতিহাদ করতে পারে। [সুওয়াল ওয়া জওয়াব, এইচএস ৬১২, প্রকাশের তারিখ: ১০ মার্চ ২০০৯] * নবী করীম সা. এবং সাহাবায়ে কেরামের যুগে দ্বীনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুদ্ধ (আক্রমণাত্মক জিহাদ) চিরতরে সমাপ্ত হয়েছে। [ইশরাক, এপ্রিল ২০১১, পৃ. ২] * বিশ্বজনীন সুফিুবাদ এবং ইসলাম থেকে সমান্তরাল একটি ভিন্ন ধর্ম। [বুরহান, পৃ. ১৮১, ২০০৯ সংস্করণ] * হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) বিদ্রোহী ছিলেন এবং ইয়াযিদ ছিলেন ন্যায়পরায়ণ ও আদল প্রতিষ্ঠাকারী বাদশাহ, কারবালার ঘটনা একটি রূপকথার গল্প মাত্র। [‘গামিদী কি হ্যায়?’ গ্রন্থ থেকে মাওলানা আবদুর রহিম চারিয়ারী কর্তৃক উদ্ধৃত] * মুসলিম ও অমুসলিম এবং নারী ও পুরুষের সাক্ষ্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। [বুরহান, পৃ. ২৫ থেকে ৩৪, ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সংস্করণ] * জাকাতের নেসাব পরিবর্তন করার অধিকার রাষ্ট্রের রয়েছে। [ইশরাক, জুন ২০০৮, পৃ. ৭০] * ইহুদি ও খ্রিস্টানদের জন্য নবী করীম সা.-এর ওপর ঈমান আনা জরুরি নয়, এটি ছাড়া তাদের ক্ষমাও হয়ে যাবে। [ঐ] * সঙ্গীত নিজ সত্তার বিচারে জায়েজ। [ইশরাক, ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃ. ৬৯] * মূর্তি পূজার উদ্দেশ্যে তৈরি ছবি ছাড়া অন্য সব ধরনের ছবি জায়েজ। [ইশরাক, মার্চ ২০০৯, পৃ. ৬৯] * বিমা জায়েজ। [ইশরাক, জুন ২০১০, পৃ. ২] * এতিম নাতি দাদার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। মৃতের অসিয়ত কেবল এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ওয়ারিশদের পক্ষেও অসিয়ত বৈধ। [ইশরাক, মার্চ ২০০৮, পৃ. ৬৩... মাকামাত: ১৪০, নভেম্বর ২০০৮ সংস্করণ] * শূকরের নাপাকি কেবল গোশত পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, এর চুল, হাড়, চামড়া ইত্যাদি থেকে অন্যান্য ফায়দা বা উপকার নেওয়া জায়েজ। [ইশরাক, অক্টোবর ১৯৯৮, পৃ. ৮৯.... সূত্র: ‘গামিদী কি হ্যায়?’] * সুন্নাত হলো কেবল ইবরাহীমি দ্বীনের সেই ঐতিহ্য, যাকে নবী করীম সা. দ্বীনের ধারাবাহিকতা হিসেবে অব্যাহত রেখেছেন। এবং এটি কুরআনের চেয়েও অগ্রগামী। যদি কোথাও কুরআনের সাথে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের আচার-আচরণের সংঘাত বা অমিল দেখা দেয়, তবে কুরআনের পরিবর্তে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ধারাবাহিক আমলকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে। [মীযান, পৃ. ১৪, ২০১৪ সংস্করণ] * নারী পুরুষদের ইমামতি করতে পারে। [মাসিক ইশরাক, পৃ. ৩৫ থেকে ৪৬, মে ২০০৫] * ওড়না আমাদের মুসলিমদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, এর সম্পর্কে শরিয়তের কোনো হেকুম বা নির্দেশ নেই। ওড়নাকে শরিয়তের নির্দেশ হিসেবে পেশ করা বা মনে করা শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো যৌক্তিকতা রাখে না। [মাসিক ইশরাক, পৃ. ৪৭, সংখ্যা মে ২০০২] * মসজিদুল আকসা মুসলমানদের নয়, এর ওপর কেবল ইহুদিদের অধিকার রয়েছে। [ইশরাক জুলাই, ২০০৩ এবং মে, জুন ২০০৪] * নিয়ত ছাড়া তালাকের শব্দ উচ্চারণ করলে তালাক واقع হয় না। [ইশরাক, জুন ২০০৮, পৃ. ৬৫] লেখক: মাদরাসা শিক্ষক, চিন্তক ও অ্যাকটিভিস্ট এসএইচ/ |